ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় অতঃপর প্রকল্প বাতিল

১৪ বছরের ভোগান্তি
৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় অতঃপর প্রকল্প বাতিল

প্রকল্পটিতে ছিল সড়কের মাঝখান দিয়ে শুধু বিশেষ বাস চলাচল করবে। এতে যানজট ও সিগন্যালে আটকে থাকতে হবে না। চার বছরের প্রকল্প ১৪ বছর চলছে। বাসও নামেনি, দুর্ভোগও যায়নি। এই হলো বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের অবস্থা। গত ১৮ মে টঙ্গীর আবদুল্লাহপুর চৌরাস্তায় প্রকল্পটিতে ছিল সড়কের মাঝখান দিয়ে শুধু বিশেষ বাস চলাচল করবে। এতে যানজট ও সিগন্যালে আটকে থাকতে হবে না। চার বছরের প্রকল্প ১৪ বছর চলছে। বাসও নামেনি, দুর্ভোগও যায়নি। এই হলো বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের অবস্থা।

১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চলেছে। ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অথচ যে বিশেষ বাস চালানোর জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেই বাসই চালু হয়নি। উল্টো ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথে যানজট ও মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। এবার প্রকল্পটি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজীপুরের বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জারি করা এক পত্রে সভার আলোচনা ও সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে রূপান্তর করার কথা বলা হয়েছে।

বিআরটি প্রকল্প নিয়ে সম্ভাব্য যতগুলো বিকল্প আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে বাতিল করা। তবে ১৪ বছর গাজীপুরবাসীসহ এই পথের যাতায়াতকারীরা দুর্ভোগ সহ্য করেছেন। তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা উচিত। গাজীপুরবাসীর জন্য কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন সেবা চালু করা যেতে পারে। কারণ, এর মধ্যে রেলের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন নির্মাণ শেষ পর্যায়ে।

সংশ্লিষ্ট উন্নয়নসহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত জটিলতা নিরসন এবং প্রকল্প বন্ধের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নিতে বলা হয়েছে। বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার প্রস্তাবও গ্রহণ করেছে মন্ত্রিসভা।

সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।

ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে নির্মাণকাজের জন্য বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়ক সরু হয়ে গেছে। রাস্তাঘাটও ভাঙাচোরা। জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকমে এই সড়কে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। গতকাল টঙ্গীর আবদুল্লাহপুর ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভায় চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়—১. প্রকল্পটি বাতিল করে দেওয়া। ২. অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে বিআরটি বাস কিনে চলাচলের ব্যবস্থা করা। ৩. বিআরটি পথটি যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে বিশেষ বাস ও বিদ্যমান বেসরকারি বাস চলতে দেওয়া। ৪. বিআরটি পথটিকে টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা। শেষে সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বিদ্যমান স্টেশন, বিআরটি লেন আলাদা করার জন্য নির্মাণ করা বিভাজক ভেঙে ফেলতে হবে। উড়ালপথ ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করা হবে। অবশ্য বিআরটি প্রকল্প সম্পন্ন করে তা দিয়ে বিশেষ বাস চালানোর জন্য দাবি করে আসছে গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন নামে একটি সংগঠন। তারা প্রকল্পের পক্ষে একাধিক সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে।

সংগঠনটির সভাপতি মো. শামসুল হক গতকাল মঙ্গলবার বলেন, গত ১৪ বছর গাজীপুরবাসীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার পর বাতিল করা ঠিক হবে না। তাঁরা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি দেবেন বলে জানান।

বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই সিদ্ধান্তের আগে প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। গত বছর অক্টোরে তাঁরা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের গঠিত দুটি কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করে।

প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে 'পদ্ধতিগত ব্যর্থতার' উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যথাযথ কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহির অভাবে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মত দিয়েছে দলটি। প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নকশায় ত্রুটি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথাও বলা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর পথটি সময়মতো চালু না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ছাড়া বাংলাদেশে বিদ্যমান বাসগুলোর দরজা বাঁ দিকে। কিন্তু বিআরটি লেনে স্টেশনগুলো এমনভাবে তৈরি যে বাসের দরজা হবে ডান দিকে। অবশ্য বিশ্বব্যাপী বিআরটি লেনে দরজা ডান দিকেই থাকে। ডান দিকে দরজাওয়ালা বাস চালু করলে ওই বাসগুলো গাজীপুর-বিমানবন্দরের বাইরে চলতে পারবে না। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, বিআরটি প্রকল্প নিয়ে সম্ভাব্য যতগুলো বিকল্প আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে প্রকল্পটি বাতিল করা। তবে ১৪ বছর গাজীপুরবাসীসহ এই পথের যাতায়াতকারীরা দুর্ভোগ সহ্য করেছেন। তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা উচিত। তিনি বলেন, বিআরটি বাস চালু হলে গাজীপুরবাসী শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে পারত। তাঁদের পুনরায় বাস বদল করার দরকার হতো, যা বাস্তবসম্মত নয়।

সামছুল হক বলেন, প্রকল্পটি বাতিল করে এটিকে উচ্চগতির মহাসড়কে রূপান্তর করলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের ব্যবহারকারীদের সুবিধা হবে। পাশাপাশি গাজীপুরবাসীর জন্য কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন সেবা চালু করা যেতে পারে। কারণ, এর মধ্যে রেলের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন নির্মাণ শেষ পর্যায়ে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প নিয়েছিল। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সড়কপথ, বাকিটা উড়ালপথ।

সড়কের মাঝখানে দুটি পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালানোর পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্প চালু হলে দিনে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন বলে বলা হয়েছিল। বাসগুলো যানজট, সিগন্যাল কিংবা অন্য বাধায় আটকে থাকবে না—এমনটাই ছিল প্রত্যাশা।

মূলত বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পাশাপাশি এতে অর্থায়ন করছে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)।

প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজার বিশেষ বাস চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি। তিন দফা সংশোধনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত