
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ও আগের সরকারগুলোর আমলে করা জনস্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো প্রকাশ ও প্রয়োজনে বাতিল দাবি করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, এমন একটি নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা হয়, জাতীয় সক্ষমতা বাড়ে এবং লুণ্ঠনমূলক তৎপরতার অবসান ঘটে।
‘জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ চুক্তি ও জনস্বার্থ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন আনু মুহাম্মদ। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এ আলোচনা সভা হয়। এর আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
আনু মুহাম্মদ মনে করেন, বিশ্বরাজনীতি ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলার কারণে সারা বিশ্বই একরকম অনিশ্চয়তায় পড়েছে এবং দুর্বল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটা আরও বেশি বিপদ। সেই বিপদের অনেকগুলো দিক আছে—প্রবাসী শ্রমিক কিংবা আমাদের প্রবাসী আয়, সেটা একটা বিপদ, জ্বালানি খাত হচ্ছে আরেকটা বিপদ। এর ফলে কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে অনেক কিছু—আমাদের জিনিসপত্রের দাম, অর্থনীতির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হবে।’ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, বর্তমান সংকট পুরোপুরি অনিবার্য ছিল না। তিনি বলেন, ‘গত সরকারগুলো একের পর এক এই দেশি–বিদেশি নিজেদের লুণ্ঠন, এগুলোর পক্ষে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি ও নীতি গ্রহণের কারণে আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।...বিদেশি কোম্পানি এখানে ডমিনেট করছে। এই পরিস্থিতির কারণে এখন ধরেন, যদি আমদানি ও ঋণনির্ভরতা না থাকত, তাহলে এই যুদ্ধ হলেও আমাদের জ্বালানি খাত ও বিদ্যুৎ খাতে কোনো সমস্যা হতো না।’
আলোচনা সভায় পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান এম এ মায়ীদ বলেন, স্পেশাল অ্যাক্টের (আইন) আওতায় টেন্ডার ছাড়াই যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি হয়েছে, তার মধ্যে নানা অনিয়ম রয়েছে। এই আইনের আওতায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি চুক্তি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই এমন জায়গায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রিড বা সঞ্চালন অবকাঠামোই ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে এমনভাবে চুক্তি করা হয়েছে, যাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও তা বাস্তবে গ্রিডে যুক্ত না হলেও চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়।
উদাহরণ তুলে ধরে পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, চুক্তিতে বলা আছে, ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা থাকলে, সে অনুযায়ী প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় সেই বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্তই হয়নি। তবু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রসঙ্গ তুলে এম এ মায়ীদ বলেন, প্রকল্পটি প্রযুক্তিগতভাবে ভালো হলেও চুক্তির শর্তে সমস্যা রয়েছে। আন্তর্জাতিক চর্চা অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের পরিবর্তে সরবরাহকারী পক্ষ নিজেই জ্বালানির মূল্য ও পরিবহন ব্যয় নির্ধারণের সুযোগ পেয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের চুক্তিতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত ছিল।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ‘আজ একটা পোস্টার দেখলাম, জ্বালানি তেল সাশ্রয়ে সরকার প্রাইভেট গাড়িগুলো যতটা সম্ভব বন্ধ রাখার কথা বলেছে এবং তেল সাশ্রয়ের জন্য কিছু কর্মসূচিও নিয়েছে। ব্যাপারটা আমি এখনো মনে করি না যে সমতার জায়গায় সরকার অ্যাড্রেস করতে পেরেছে।’ এম শামসুল আলম বলেন, ‘সরকারের আমলারা মেয়ের জন্য, বউয়ের জন্য, বড় বড় কর্মকর্তারা তার বাড়ির জন্য, তার নিজের জন্য একাধিক গাড়ি ব্যবহার করেন। আশা করেছিলাম, সব গাড়ি রিকুইজিশন দিয়ে গ্যারেজ করে দেবে। এই আদেশ আসবে এবং তাদের গণপরিবহনে চড়াবে। কিন্তু সেটি আমরা এখনো দেখতে পাইনি।’ জ্বালানি খাতে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে অতীতে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেন এম শামসুল আলম।