
পবিত্র ঈদুল ফিতরের স্বস্তি কাটতে না কাটতেই রাজধানীজুড়ে আবারও বাড়তে শুরু করেছে যানবাহনের চাপ। অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হওয়ায় ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে দেখা দিয়েছে যানজট। সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি এখন নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সকালে অফিসগামী মানুষের ভিড় এবং বিকালে ফেরার সময় যানজট আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এতে করে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, বনানী, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, ফার্মগেট, শাহবাগ, আজিমপুরসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেই যানবাহনের চাপ চোখে পড়েছে। অনেক জায়গায় কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত। সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল ও সিএনজি চালিত অটোরিকশার আধিক্যও যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মিরপুর ১০ এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পরই একটা অনিশ্চয়তা কাজ করে- কখন অফিসে পৌঁছাতে পারব, তা বলা যায় না। আগে যেখানে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগত, এখন সেখানে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। যানজটের কারণে শুধু সময়ই নষ্ট হচ্ছে না, মানসিক চাপও বাড়ছে।’ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহজাবিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘ক্লাসে সময় মতো পৌঁছানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ার পরও রাস্তায় আটকে থাকতে হয়।’
যানজটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গণপরিবহনের যাত্রীরা। বাসের ভিড়, ধীরগতির চলাচল এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার কারণে যাত্রীদের কষ্ট বাড়ছে। গাবতলী থেকে মতিঝিলগামী এক যাত্রী নাজমুল হাসান বলেন, বাসে উঠে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যানজটে আটকে থাকলে গরমে ও ভিড়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। অথচ বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেকেই বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল বা রাইড শেয়ারিং সেবা নিচ্ছেন, যা আবার সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কথা হয় বাসচালকদের সঙ্গে। তারা জানিয়েছেন, রাজধানীর সড়কে বর্তমান যানজট পরিস্থিতি তাদের পেশাকে দিন দিন কঠিন করে তুলছে। সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, যত্রতত্র যাত্রী ওঠাণ্ডনামা এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলার অভাবে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বাস চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে একটি ট্রিপ শেষ করতে নির্দিষ্ট সময় লাগত, এখন সেখানে দ্বিগুণ সময় লেগে যাচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে চালকদের দৈনিক আয়ও কমে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হওয়ায় শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বাড়ছে বলেও তারা জানান।
তারা আরও জানান, ‘ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাস চলাচলের জন্য সড়কে পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। অনেক সময় হঠাৎ লেন পরিবর্তন ও সিগন্যাল অমান্যের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়। নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠাণ্ডনামা বন্ধ করা, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং আলাদা বাস লেন চালু করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। এতে গণপরিবহন দ্রুত চলাচল করতে পারবে এবং সামগ্রিকভাবে যানজটও কিছুটা কমবে।’
মিরপুর-যাত্রবাড়ী রুটের বাসচালক আব্দুল মালেক বলেন, ‘আগে যেখানে একটি ট্রিপ শেষ করতে দেড় ঘণ্টা লাগত, এখন সেখানে আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। এতে করে দিনে ট্রিপ কমে যাচ্ছে, আয়ও কমছে। তিনি বলেন, সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, যত্রতত্র যাত্রী ওঠাণ্ডনামা এবং সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে নির্ধারিত সময় ধরে গাড়ি চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হওয়ায় শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বাড়ছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।’
গাবতলী-স্টাফ কোয়ার্টার রুটের অছিম পরিবহনের বাস চালক মো. সেলিম মিয়া বলেন, ‘সকালে গাড়ি নিয়ে বের হলেই বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যেত, এখন সেখানে দ্বিগুণ সময় লাগছে। এতে করে একদিকে যেমন যাত্রীদের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ট্রিপ কমে যাওয়ায় আয়ও কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, যানজটে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে থাকতে শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয়, আবার যাত্রীদের অভিযোগও সামলাতে হয়।’
ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, যানজটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সড়কের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বেশি হওয়া। এছাড়া যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠাণ্ডনামা, ট্রাফিক আইন না মানা এবং বিভিন্ন স্থানে উন্নয়ন কাজ চলমান থাকাও যানজটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
মিরপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শরিফুল আলম বলেন, ‘সড়কে যানবাহন চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে তবে ঈদ উপলক্ষে যারা গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন, তাদের একটি অংশ এখনও ঢাকায় ফেরেননি। ধারণা করা হচ্ছে আজ শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যে তারা রাজধানীতে ফিরবেন। ফলে আগামী রোববার থেকে ঢাকা আবার তার স্বাভাবিক চেনা রূপে ফিরে আসবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অফিস-আদালতেও মূলত রোববার থেকেই পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম শুরু হবে, যার প্রভাবে নগরীর সার্বিক প্রাণচাঞ্চল্যও বাড়বে। একই সঙ্গে ঢাকার সড়কগুলোতেও আগের মতো ব্যস্ততা ও গতি ফিরে আসবে।’