প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬
কুয়াশার চাদর মেখে আছে প্রকৃতি। এ যেন প্রশান্তির সময়, প্রকৃতির বিশ্রাম। শীতের শেষ স্পর্শ, অন্যদিকে বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে মাঘ। কুয়াশার স্নিগ্ধ আলিঙ্গন, শিশিরের ছোঁয়া এবং দিগন্তজোড়া মাঠের সজীব প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য ভর করে এ মাসেই। সোনালি রোদে কৃষকেরা মাঠে নামে, মিষ্টি উষ্ণতায় গতি পায় কাজ। বাংলার ঋতুচক্রে মাঘ মাসের আগমন শুধুই একটি মাসের পরিবর্তন নয়, এটি প্রকৃতির এক সুনির্দিষ্ট বার্তা। শীত যখন তার চরম মাত্রায় পৌঁছে ক্লান্ত, তখনই মাঘ মাস আমাদের জীবনে উষ্ণতার সুর নিয়ে আসে। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়ে সূর্যের আলোর উষ্ণতায় ভরিয়ে তোলে প্রকৃতিকে। দিনের আলোর স্থায়িত্ব বাড়ে। রাতের শীতলতা কমে আসতে শুরু করে। মাঘের আগমন তাই বসন্তের আগমনী বার্তা বহন করে। এ বার্তা প্রকৃতির মতোই আমাদের জীবনের গভীর দিকগুলোতে আলো ফেলে।
মাঘ মাসে প্রকৃতির পরিবর্তন : মাঘ মাস প্রকৃতির সেই সময়, যখন শীতলতায় জমে যাওয়া পরিবেশ ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পায়। শুকনো গাছের ডালে নতুন কুঁড়ির অঙ্কুরোদগম ঘটে। পাখিরা যেন আরেকবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাদের কণ্ঠে বসন্তের আমন্ত্রণধ্বনি শোনা যায়। খেতখামারে দেখা দেয় সবুজের আভাস। এ পরিবর্তন প্রকৃতির মৌলিক নিয়মের একটি অংশ; যা আমাদের শেখায়- সংকটের পরেই আসে নতুন সময়, নতুন জীবনের সূচনা। জীবন কখনও থেমে থাকে না; যেমন মাঘের শেষে বসন্ত আসে, তেমনই আমাদের জীবনের দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে আসে আনন্দের সময়।
মাঘ মাসের কৃষি ও গ্রামীণ জীবন : মাঘ মাস বাংলার কৃষিজীবীদের জন্য এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ সময়। আমন ধান ঘরে তোলার শেষ পর্যায় শুরু হয় এ মাসে। এ সময় কৃষকেরা তাদের সারা বছরের কষ্টের ফল ঘরে তোলে। ধান কাটার পর নবান্ন উৎসবের আনন্দ কৃষকদের জীবনে এক নতুন প্রেরণা যোগায়। বাংলার কৃষি-সমৃদ্ধ গ্রামীণ সমাজে মাঘ মাস তাই শুধুই অর্থনৈতিক সাফল্যের সময় নয়, এটি সাংস্কৃতিক এবং মানসিকভাবে শক্তি সঞ্চয়ের সময়ও। মাঘ মাসের উৎসব, পিঠাপুলি তৈরি এবং মেলাগুলো বাংলার মানুষের ঐক্যের বার্তা দেয়। এটি আমাদের শেখায়, পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ই জীবনের প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি।
শীতলতা ও উষ্ণতার মিশ্রণে মাঘ : মাঘ মাসে দিনের বেলায় সূর্যের উষ্ণতা বাড়তে শুরু করলেও ভোরের ঠান্ডা আর রাতের শীতলতা এক ভিন্ন রকম অনুভূতি নিয়ে আসে। শীতের শেষভাগে এ উষ্ণতা আমাদের শরীর ও মনকে নতুন করে প্রস্তুত করে তোলে বসন্তের জন্য। শীতের ক্লান্তি কাটিয়ে ওঠার এ সময় প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৌন্দর্যে ভরপুর। এ সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আমাদের জীবনে ধৈর্য আর ইতিবাচকতার গুরুত্ব শেখায়। মাঘের শীতল রাতের চাঁদনি আলো আমাদের মনকে প্রশান্তি দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের ছোট ছোট সৌন্দর্যগুলো আমাদের বড় দুঃখগুলো ভুলিয়ে দিতে পারে।
সামাজিক উৎসব ও ঐতিহ্য : মাঘ মাসে বাংলার গ্রামীণ সমাজে বিভিন্ন মেলা, নবান্ন উৎসব এবং পিঠাপুলি বানানোর আয়োজন হয়। খেজুরের রস আর গুড় দিয়ে তৈরি পিঠার গন্ধ যেন বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ এনে দেয়। এ সময় গ্রামবাংলার মানুষ একত্র হয়, নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে। এ উৎসবগুলো শুধু আনন্দের সময় নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের ধারক। মাঘ মাস আমাদের শেখায়, ঐক্য এবং সম্পর্কের মাধুর্য আমাদের জীবনকে আরও সুন্দর করে তোলে।
জলবায়ু পরিবর্তনে মাঘের সৌন্দর্য ম্লান : খেজুরের রস সংগ্রহ ও পিঠাণ্ডপায়েসের ঐতিহ্য মাঘের চিরচেনা অনুষঙ্গ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর রূপ ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। শহরে দূষণ আর নাগরিক ব্যস্ততায় মাঘের নৈসর্গিক সৌন্দর্য হারাচ্ছে প্রতিদিন। দূষণের ছোবল থেকে ঋতুকে বাঁচাতে পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শহরের বুকজুড়ে মাঘ তার কথা না রাখলেও কথা রাখে কৃষ্ণকলি, বোতাম, জিনিয়া, কসমস ও গাঁদা। অন্যদিকে গাছিদের বাড়ির উঠানে চলে খেজুরের রস জ্বাল দেওয়ার কাজ। কিন্তু এ মাসের তীব্র শীতের প্রভাব যেমন কমেছে, তেমন কমেছে খেজুর গাছ আর রসের আহরণ। ‘মাঘের শীতে বাঘ পালায়’ এ প্রবাদ এ মাসের শৈত্যপ্রবাহের সম্পর্কে জানান দিলেও, জলবায়ু পরিবর্তনে মাঘ মাস এখন আর আগের মতো স্বচ্ছরূপে ধরা দেয় না। এখনকার মাঘ হারিয়ে যায় দূষণে। কুয়াশা না ধূলির স্তর, এ তর্কেই ফুরোয় মাঘ। বাঙালির নানা উৎসব দূষণে এবং নাগরিক জটে উদযাপনের রং হারাচ্ছে।
বাঘ পালানো মাঘ শুধু প্রবাদেই : একসময় মাঘ মাস ঘিরে রীতিমতো আতঙ্ক দেখা দিত। আগের মাসের তুলনায় ভয়ঙ্করভাবে বেড়ে যেত শীত। এর সঙ্গে পেরে ওঠা মুশকিল হয়ে যেত। মাঘের শীত এলে কতো শীত তা বোঝাতেই বলা হতো, মাঘের শীতে বাঘ পালায়। বাস্তবে বাঘের সঙ্গে শীতের কী সম্পর্ক তা অজানা। তবে বাঙালি ‘বিপুল শক্তিধর’ বা ‘ক্ষমতাবান’ অর্থে ‘বাঘ’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। অনুমান করা হয়, একই ভাবনা থেকে মাঘের সঙ্গে বাঘের গল্পজুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এবারও মাঘ শুরু হওয়ার পর থেকে বাঘ খোঁজা হচ্ছে। রম্য করে বলা হচ্ছে, বাঘ কেন বিড়ালও এখন পালাচ্ছে না! বলার অপেক্ষা রাখে না, মানুষই বিনষ্ট করছে প্রকৃতি-পরিবেশ। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউস গ্যাস বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, ওজন স্তরের ক্ষয়, জীববৈচিত্র্য হ্রাসসহ মনুষ্য সৃষ্ট নানা কারণে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে। ভূমণ্ডলীয় উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। তার চেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশে প্রকৃতি-পরিবেশ বিনষ্ট করার প্রবণতা অনেক বেশি। ফলে শীত ক্রমে পালাচ্ছে।
মাঘ স্বরূপে ফিরবে না, পালাবে না বাঘ : শীত থেকে বাঁচার বহুবিধ উপায় আবিষ্কৃত হয়েছে। শীতবস্ত্রও আগের মতো দুর্লভ নয়। এখন তাই মাঘ মানে কখনও কখনও শীতের কামড় বা শীতের আতঙ্কে ভোগা। তবে মাঘ স্বরূপে ফিরবে না, পালাবে না বাঘও- এ কথা মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। অবশ্য মাঘের ঋতুবৈচিত্র্যের এখনও খানিকটা দেখা মেলে গ্রামীণ জীবনে। সেখানে গল্প জমে উষ্ণ চায়ের আড্ডায়। বিকাল হতেই শিশুদের উচ্ছ্বাস বাড়ে। ঝাঁক বেঁধে উড়ে যায় অচেনা অতিথি পাখি। মাঘের শীতে পানিতে ঝাঁপ দিতেও ভয় পায় না মাছরাঙার দল। এ যেন সেই জীবনানন্দ দাশকে মুগ্ধ করা বাংলার মাঘের শেষ বিকাল। সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে দিগন্ত হয়ে ওঠে নিস্তব্ধ; তবু সেখানে দেখা নেই চিরচেনা কুয়াশামাখা শীতের। কারণ, প্রকৃতি ও মানুষ এখন বসন্তের অনুরণনের জন্য কান পেতেছে।