প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬
ইসলামি সমাজব্যবস্থার সৌন্দর্য শুধু তার ইবাদত-বন্দেগিতে নয়, বরং তার সামাজিক আদব এবং মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের চমৎকারিত্বের মাঝেও নিহিত। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই- এ কথা যেমন সত্য, তেমন মানুষকে তার যোগ্যতা, মর্যাদা এবং অবস্থান অনুযায়ী মূল্যায়ন করা প্রজ্ঞার দাবি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষকে তাদের মর্যাদানুযায়ী মূল্যায়ন কর।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৩৬৮)। এ ছোট্ট বাক্যটি মূলত একটি সামাজিক বিপ্লবের ইশতেহার। এটি আমাদের শেখায়- কীভাবে প্রজ্ঞার সঙ্গে প্রতিটি মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হয়। প্রজ্ঞা হলো, প্রতিটি জিনিসকে তার যথাযথ স্থানে রাখা। আল্লাহতায়ালা যেমন তাঁর সৃষ্টিতে প্রজ্ঞাময়, তাঁর দ্বীনও তেমনি ভারসাম্যপূর্ণ। শিক্ষিত ও সচেতন মুসলিম হিসেবে এ হাদিসের গভীরতা অনুধাবন করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।
অধিকারের শ্রেণিবিভাগ : হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমগণ মানুষকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। প্রথমত যাদের বিশেষ অধিকার রয়েছে। যেমন- পিতামাতা, সন্তান, নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী এবং দ্বীনি শিক্ষক বা আলেম সমাজ। তাদের মর্যাদা রক্ষা করার অর্থ হলো, শরিয়ত ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য সম্মান, ভালোবাসা এবং আনুগত্য প্রদান করা। দ্বিতীয়ত সেসব মানুষ, যাদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিশেষ পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই। তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য হলো, ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার অধিকার রক্ষা করা। অন্যের অনিষ্ট থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং নিজের জন্য যা ভালো মনে করা, অন্যের জন্য তা-ই কামনা করা।
আদর্শ সমাজের ভিত্তি : একটি শিক্ষিত সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন সেখানে জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার কদর থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বড়দের সম্মান ও ছোটদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শনকে ঈমানের অংশ বলেছেন। বিশেষ করে, আলেম সমাজের প্রতি সম্মান প্রদর্শন শুধু ব্যক্তির সম্মান নয়, বরং এটি জ্ঞানের প্রতি সম্মান। তাদের সামনে বিনয়ী হওয়া, তাদের উপকারী জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বোধ করা এবং তাদের ফতোয়া ও শিক্ষার সময় তাদের জন্য দোয়া করা আমাদের চারিত্রিক উৎকর্ষের প্রমাণ।
মুসা (আ.) ও ফেরাউনের শিক্ষা : মানুষের মর্যাদা অনুযায়ী কথা বলা প্রজ্ঞার বড় অংশ। রাষ্ট্রনেতা বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার সময় নম্রতা বজায় রাখা ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহতায়ালা যখন মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে চরম জালেম ফেরাউনের কাছে পাঠালেন, তখন নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলো। সম্ভবত সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।’ (সুরা তহা : ৪৩-৪৪)। এতে প্রমাণিত হয়, কারো পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্বোধন করা এবং শিষ্টাচার বজায় রাখা দাওয়াহ-পদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অন্তর জয় করার কৌশল : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনীতে আমরা দেখি, তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং অবস্থান অনুযায়ী আচরণ করতেন। যারা নতুন মুসলমান হয়েছে বা যাদের অন্তর জয় করা প্রয়োজন, তাদের তিনি প্রচুর পার্থিব সম্পদ দিয়ে সহযোগিতা করতেন। অথচ যারা ঈমানে অত্যন্ত মজবুত ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে তিনি এমনটা করতেন না। এটি মোটেও বৈষম্য ছিল না, বরং এটি ছিল মানুষের ‘অন্তর ও অবস্থান’ অনুযায়ী দাওয়াহ প্রদানের কৌশল। স্ত্রীর সঙ্গে আনন্দদায়ক ভাষায় কথা বলা বা শিশুদের সঙ্গে তাদের উপযোগী ভাষায় খেলাধুলা করাও এ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।
আমানত ও রাষ্ট্র পরিচালনা : এ হাদিসের প্রয়োগ শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার মূলনীতি। যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে বসানোই হলো মানুষকে তার মর্যাদা দেওয়া। আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে তোমাদের নির্দেশ দেন।’ (সুরা নিসা : ৫৮)। রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় পদগুলো হলো আমানত। মসজিদের ইমামতি থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব বা বিচারকের আসন- সবক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও সৎ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া দরকার। যে পদের জন্য যে যোগ্যতা প্রয়োজন, সেখানে তাকে বসানোই হলো ইনসাফ। এর ব্যত্যয় ঘটলে পুরো সমাজব্যবস্থায় ধস নামা স্বাভাবিক।
সংশোধন ও শাস্তির ক্ষেত্রে ভারসাম্য : মানুষকে তার মর্যাদানুযায়ী মূল্যায়নের আরেকটি দিক হলো, ভুল সংশোধন। যে ব্যক্তি প্রথমবার ভুল করেছে এবং সে সামাজিকভাবে সম্মানিত, তাকে নির্জনে বুঝিয়ে বলা বা মৃদু শাসনই যথেষ্ট হতে পারে। আবার যে ব্যক্তি পেশাদার অপরাধী, তার জন্য কঠোর শাস্তি বা ‘তাজির’ প্রয়োজন হতে পারে। প্রবাদ আছে, ‘সম্মানিত জাতি অপমানিত হলে তাদের প্রতি দয়া কর।’ কোনো এক সময় প্রভাবশালী ছিল এমন ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত হলে তাকে সাধারণ ভিক্ষুকের মতো মূল্যায়ন না করে তার আত্মসম্মান বজায় রেখে সাহায্য করা মোমিনের বৈশিষ্ট্য।
প্রজ্ঞার পথে যাত্রা : ‘মানুষকে তাদের মর্যাদানুযায়ী মূল্যায়ন কর’- এ নীতিটি আমাদের ব্যক্তিগত অহংকার দূর করে এবং অন্যের প্রতি সহনশীল হতে শেখায়। আমরা যখন জানব, কার সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়, তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ভুল বোঝাবুঝি কমে আসবে। ইসলাম আমাদের রোবট বানাতে চায় না, বরং একেকজন সংবেদনশীল ও প্রজ্ঞাবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। আজকের শিক্ষিত মুসলিম সমাজের দায়িত্ব হলো, এ হাদিসের আলোকে নিজেদের পারিবারিক ও সামাজিক লেনদেনগুলো সাজানো। আমাদের আচরণ যেন এমন হয়, যেখানে বড়রা পায় শ্রদ্ধা, ছোটরা পায় অভয় আর যোগ্যরা পায় তাদের প্রাপ্য আসন; তবেই আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারব।