প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬
মানুষকে ক্ষমা করা প্রিয় নবী (সা.)-এর অন্যতম গুণ ছিল। তায়েফের ময়দানের ঘটনা এর বড় প্রমাণ। মক্কা ছিল তখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো। খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর কোরাইশের নিপীড়ন আরও বেড়ে যায়। তারা প্রিয় নবীকে এবং মোমিন মুসলমানদের এতটাই জুলুম করত, মক্কার বিশালতা মনে হতো হাতের মুঠোর মতো সংকীর্ণ। ফলে ইসলাম প্রচারের সব পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে প্রিয় নবী (সা.) নবুওয়তের দশম বর্ষে তায়েফ যাত্রা করেন। তার সঙ্গী হিসেবে ছিলেন জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)। তায়েফে পৌঁছে তিনি দশদিন অবস্থান করেন। সাকিফের সর্দারদের কাছে যান। তাওহিদের দাওয়াত দেন। মূর্তিপূজা ত্যাগের আহ্বান জানান। আশা ছিল, এ শক্তিশালী গোত্র ইসলামকে আশ্রয় দেবে। মক্কার নির্যাতন থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু যা ঘটল, তা ছিল হতাশার চূড়ান্ত রূপ। (সিরাতে ইবনে হিশাম : ১/২৩৪-২৩)।
সর্দারদের উপহাস ও প্রত্যাখ্যান : সাকিফের তিন সর্দার কিনানা ইবনে আবদ ইয়ালিল, মাসউদ সাকাফি এবং হাবিব ইবনে উমাইর-এর কাছে নবীজি যান। তারা ছিল গোত্রপ্রধান। নবীজি তাদের বলেন, ‘আল¬াহর একত্ব স্বীকার কর, আমাকে সাহায্য কর; যাতে আমি আমার কওমকে দাওয়াত দিতে পারি।’ কিন্তু তাদের উত্তর ছিল অকৃত্রিম উপহাসের। একজন বলল, ‘যদি আল্লাহ তোমাকে পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে কাবার পর্দা ছিঁড়ে ফেল!’ আরেকজন বলল, ‘আল্লাহ কি তোমাকে ছাড়া কাউকে পাঠাতে পারেননি?’ তৃতীয় ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান বলে মনে হয়েছিল, সে বলল, ‘যদি তুমি সত্যিকারের রাসুল হও, তাহলে তোমার সঙ্গে কথা বলা বিপজ্জনক। আর যদি মিথ্যাবাদী হও, তাহলে আমাদের সঙ্গে কথা বলার যোগ্য তুমি নও।’ এ প্রত্যাখ্যান নবীজির হৃদয়ে গভীরভাবে আঘাত হানল। তিনি শুধু একটি অনুরোধ করলেন, ‘যদি আমাকে সাহায্য করতে না চাও, তাহলে অন্তত এ খবর কোরাইশকে দিও না।’ কিন্তু তারা তাও নাকচ করল। সর্দাররা সাধারণ লোকদের উস্কানি দিল, যারা নবীজি ও জায়েদ ইবনে হারেসাকে গালমন্দ করতে লাগল। পাথর ছুড়তে শুরু করল। নবীজির পায়ের গোড়ালি কেটে রক্তাক্ত হলো। জুতা রক্তে ভিজে গেল। জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) তাকে রক্ষা করতে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৩/১২৮-১৩০)। কষ্টের চূড়ান্ত হলো যখন তিনি একটি বাগানে প্রবেশ করে একটি আঙুর গাছের ছায়ায় বসলেন। ক্লান্তি, ব্যথা, হতাশা, সবমিলিয়ে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত। এরপরও তিনি মাথা তুলে আল্লাহর দিকে চাইলেন। তার ঠোঁট থেকে বেরুল এমন এক দোয়া, যা আজও মুসলমানদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহ! তোমার কাছেই আমি আমার দুর্বলতা, অসহায়ত্ব এবং মানুষের কাছে আমার হীনতার অভিযোগ করছি। হে মেহেরবান! তুমি দুর্বলদের প্রতিপালক। আমার রক্ষক তুমি। আমাকে কার হাতে ছেড়ে দিলে? কোনো আজনবির কাছে, যে আমার প্রতি কঠোর? নাকি আমার শত্রুর হাতে আমাকে সমর্পণ করেছ? যদি আমার প্রতি তোমার কোনো অসন্তোষ না থাকে, তাহলে আমি বিন্দুমাত্র চিন্তা করি না। কিন্তু তোমার নিরাপত্তা আমার জন্য আরও বিস্তৃত কর। আমি আশ্রয় চাচ্ছি তোমার চেহারার নুরের, যার আলোয় অন্ধকার উজ্জ্বল হয়েছে; দুনিয়া-আখেরাতের সব সঠিক হয়েছে; যাতে তোমার ক্রোধ আমার ওপর নাজিল না হয় বা তোমার অসন্তোষ আমার ওপর না আসে। তোমারই ক্ষমা চাই যতক্ষণ না তুমি সন্তুষ্ট হও। আর কোনো শক্তি বা সাহায্য নেই তুমি ছাড়া।’ (সিরাতে ইবনে ইসহাক : ১৯২)।
আদ্দাসের কাহিনী : বাগানের মালিক উতবা ও শাইবা ইবনে রাবিয়া ছিলেন মক্কার শত্রু। কিন্তু তারা নবীজির অবস্থা দেখে করুণা অনুভব করল। তারা তাদের খ্রিষ্টান কর্মচারী আদ্দাসকে বলল, ‘আঙুর নিয়ে যাও।’ আদ্দাস ইরাক থেকে এসেছিলেন। নবীজি আঙুর খেয়ে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ।’ আদ্দাস অবাক হয়ে বললেন, ‘এ কথা এখানকার লোক বলে না!’ নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোত্থেকে? তোমার ধর্ম কী?’ আদ্দাস বললেন, ‘খ্রিষ্টান, ইরাক থেকে এসেছি।’ নবীজি বললেন, ‘ইউনুসের শহর?’ আদ্দাস চমকে উঠলেন। নবীজি বললেন, ‘তিনি আমার ভাই, নবী ছিলেন, আমিও নবী।’ আদ্দাস আর ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি নবীজির মাথা, হাত-পা চুম্বন করলেন এবং ঈমান আনলেন। এ ছিল সংকটের মধ্যে প্রথম আলোর রশ্মি। (বোখারি : ৩২৩১)।
মক্কায় প্রত্যাবর্তন : তায়েফ ছেড়ে ফিরতে গিয়ে নবীজির হৃদয় ছিল ভারী। কিন্তু আল্লাহ তাকে একা রাখেননি। পথে, আকাবা পাহাড়ে, জিবরাইল (আ.) এলেন। বললেন, ‘আল্লাহ আপনার জন্য পাহাড়ের ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। আপনি আদেশ করুন, তিনি দুই পাহাড় মক্কার ওপর চাপিয়ে দেবেন।’ কিন্তু নবীজি বললেন, ‘না, আমি আশা করি, তাদের বংশ থেকে এমন লোক বেরুবে, যারা আল্লাহর একত্ব স্বীকার করবে।’ (বোখারি : ৩২৩১; মুসলিম : ১৭৯৫)। তায়েফের যাত্রা ছিল কষ্টের, কিন্তু তার ফল ছিল অমূল্য। এটি নবুওয়তের মর্যাদা প্রকাশ করল। রাসুলের ধৈর্যের পরীক্ষা নিল। ইসলামের বিজয়ের পথ প্রশস্ত করল।
ক্ষমার অনুপম গল্প : ইউসুফ (আ.) ভাইদের ওপর কোনোরূপ প্রতিশোধ নিতে চাননি; বরং তিনি চেয়েছিলেন, তাদের তওবা ও অনুতাপ। সেটা তিনি যথাযথভাবেই পেয়েছিলেন। কেননা, তার দশ ভাইও নবীপুত্র এবং তাদেরই একজন লাবির বংশের অধঃস্তন চতুর্থ পুরুষ হয়ে জন্ম নেন মুসা (আ.)। বস্তুত ইয়াকুব (আ.)-এর উক্ত বারোজন পুত্রের বংশধারা হিসেবে বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্র সৃষ্টি হয়। তাদের থেকেই যুগে যুগে জন্মগ্রহণ করেন লক্ষাধিক নবী ও রাসুল, যাদের মধ্যে ছিলেন দাউদ ও সুলাইমানের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রনায়ক, রাসুল ও নবী। বনি ইসরাইলের সর্বশেষ রাসুল ঈসা (আ.)। অতএব, বৈমাত্রেয় হিংসায় পদস্খলিত হলেও নবী রক্তের অন্যান্য গুণাবলি তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। ইউসুফ (আ.) তাই তাদের ক্ষমা করে নিঃসন্দেহে বিরাট মহত্ত্ব ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বনি ইসমাইলের একমাত্র ও সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দিন তার জানের দুশমন মক্কার কাফেরদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তিনিও সেদিন ইউসুফের ন্যায় একই ভাষায় বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রতি আজ কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত।’ শুধু তা-ই নয়, কাফের নেতা আবু সুফিয়ানের ঘরে যে ব্যক্তি আশ্রয় নেবে, তাকেও তিনি ক্ষমা ঘোষণা করেন। ফলে যারা এতদিন তার রক্তপিয়াসী ছিল, তারাই হলো তার দেহরক্ষী।