
জেলার সদরের উত্তরাঞ্চলের গাবুড়া বৃহত্তম বাজার থেকে পাইকারি দরে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই শতাধিক মেট্রিক টন টমেটো দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। দিনাজপুর জেলা শহর থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে গর্ভেশ্বরী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা সদর উপজেলার গাবুড়া উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ টমেটোর পাইকারি বাজার হিসেবে সারাদেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে।
টমেটোর পাইকারি বাজার গাবুড়ার রাস্তাঘাট এমনকি বাড়ির আঙিনায় ও অস্থায়ী আড়তে বিক্রি হয় কৃষকদের উৎপাদিত টাটকা ও তাজা মুখরোচক সুস্বাদু এই টমেটো। সরেজমিন গত রোববার বিকালে দিনাজপুর সদর উপজেলার গাবুড়া বাজারে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের উৎপাদিত টমেটো প্রতিদিন ভোর বেলায় খেত থেকে তুলে এই বাজারে নিয়ে আসা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন পাইকাররা এই বাজারে তাদের পছন্দমত টমেটো কিনতে আসেন। পাইকারদের চাহিদা মতো টমেটো কৃষকরা তাদের জমিতে চাষ করে তাদের কাছে সরবরাহ করেন। জনশ্রুতি রয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে দিনাজপুরে গাবুড়া বাজারের টমেটোর ব্যাপক সুখ্যাতি রয়েছে। এখানকার টমেটোর রাজধানী ঢাকার নামি-দামি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও রেস্তোরাঁগুলোতে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসব হোটেলে গ্রাহকদের কাছে সব ধরনের খাবারের সঙ্গে বিশেষ করে সালাদ হিসেবে ক্রেতাদের নিকট দিনাজপুরে কৃষকদের উৎপাদিত সুস্বাদু টমেটো খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। সদর উপজেলার গাবুড়া বাজারের পার্শ্ববর্তী শেখপুরা গ্রামের কৃষক রিয়াজুল হক ও আতিয়ার রহমান জানান, তাদের জমিতে উৎপাদিত টমেটো কৃষি বিভাগের মাঠ প্রদর্শনীতে বিভিন্ন জেলার প্রশিক্ষণার্থীদের সরেজমিন মাঠে নিয়ে দেখানো হয়। প্রতি বছর এই এলাকার গ্রামগুলোতে উৎপাদিত টমেটোর চাহিদা বেড়েই চলছে। টমেটো চাষিরা জানান, যখন এই এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না, সে সময় এখানে উৎপাদিত টমেটো ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে বাজারে চাহিদা না থাকার কারণে জমিতে নষ্ট হয়ে যেতো। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় মৌসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সারাবছর এখানকার উৎপাদিত টমেটোর চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। বাজারের আড়তদার মিরাজুল ইসলাম ও আমজাদ আলীর সঙ্গে বলে জানা গেছে, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে আধুনিক পদ্ধতিতে প্লাস্টিকের খাচায় টমেটো ভরে ট্রাকযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিন পাঠানো হচ্ছে। এতে করে সরবরাহকৃত টমেটোর কোনো ক্ষতি হয় না এবং মান ভালো থাকে। ফলে এখানকার টমেটো যেসব পাইকারিরা নিয়ে যায়, তারা সহজেই বাজারজাত করতে পারে। পাইকারদের ব্যবসায় মুনাফা ভালো হয়। এভাবেই এখানকার টমেটোর বাজার সারাদেশে ব্যপক সুনাম অর্জন করেছে। দিনাজপুর হটিকালচার বিভাগের সরকারী পরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল হাসান জানান, দিনাজপুর সদর উপজেলার গাবুড়া বাজার যেন এক টমেটোর রাজ্য। প্রতিদিন এই বাজারে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে লাল রঙ্গের টমেটো ছেয়ে গেছে এই পাইকারি হাট। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গাজীপুর, কুমিল্লা, চাঁদপুর, কক্সবাজারসহ সারাদেশ থেকে পাইকাররা আসেন এখানে টমেটো কিনতে। টমেটো সাধারণত শীতকালীন রবি মৌসুমের ফসল হলেও, দিনাজপুরে খরিপ-১ মৌসুমে আগাম টমেটোর চাষ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কৃষক আমন ধান কাটার পর বোরো ধান না লাগিয়ে এসব জমিতে টমেটো চাষ করছেন। তিনি জানান, এই অঞ্চলে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সুরুভি, রাণী ও পভলিন সিট জাতের টমেটোর চাষ এবং সরবরাহ বেশি হয়। পাইকাররা টমেটো কিনে আড়তে ঢালছেন। প্রতিটি আড়তে ২০-৩০ জন শ্রমিক টমেটো বাছাই করে ক্যারেটে ঝুড়ি ভরছেন। কেউ ট্রাকে মাল তুলছেন, কেউ চাষিদের কাছ থেকে মাল বুঝে নিয়ে টাকা পরিশোধ করছেন। গাবুড়া বাজারের শ্রমিক সরদার ফরিদ হোসেন জানান, প্রতিদিন এই টমেটোর পাইকারি বাজারে সব মিলিয়ে ৫০০-৭০০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। তারা জমি থেকে টমেটো উত্তোলন, আড়তে বাছাই পর্ব, প্লাস্টিকের খাঁচায় ভরা ও ট্রাকে বোঝাই করা পযন্ত এসব কাজ সুষ্ঠভাবে করছেন। বিনিময়ে প্রতিজন শ্রমিক দিনে ৫০০-৮০০ টাকা পযন্ত মজুরি পাচ্ছেন। গাবুড়া টমেটোর পাইকারি বাজার আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল জলিল জানান, প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় দেড় থেকে ২০০ মেট্রিক টন টমেটো ২৫-৩০টি ট্রাকে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকাররা নিয়ে যায়।