ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ঈদের সম্পর্ক চাঁদ নাকি সৌদি আরবের সঙ্গে

রায়হান রাশেদ
ঈদের সম্পর্ক চাঁদ নাকি সৌদি আরবের সঙ্গে

বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ দেখে নাকি সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদের নামাজ আদায় করা হবে- এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে দেশের কোথাও কোথাও সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করা হচ্ছে। তবে দেশের প্রায় মানুষই ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে চাঁদ দেখার ঘোষণা এলে বা রমজানের ত্রিশ রোজা পূর্ণ হওয়ার পর দিন ঈদের নামাজ আদায় করেন।

ঈদ এলো যেভাবে : রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন মদিনায়। তিনি দেখলেন, মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিরা শরতের পূর্ণিমায় নওরোজ উৎসব এবং বসন্তের পূর্ণিমায় মেহেরজান উৎসব উদযাপন করছে। তারা এ উৎসবে নানা আয়োজন, আচার-অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন আনন্দ উৎসব করে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের এ দুটি উৎসব পালন করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ তোমাদের ওই উৎসবের বিনিময়ে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো পবিত্র দুটি দিন দান করেছেন। এতে তোমরা পবিত্রতার সঙ্গে উৎসব পালন করো। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১১৩৬)। এক মাস রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন পালন করা হয় ঈদুল ফিতর। দ্বিতীয় হিজরি মোতাবেক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ বা ৩১ মার্চ মদিনায় প্রথম ঈদুল ফিতর পালন করা হয়।

বাংলাদেশে কখন ঈদ পালন করা হয়? : বাংলাদেশের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুই ঈদ। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এই উৎসব দুটি পালন করা হয় দেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। রমজান মাস ২৯ দিনে বা ৩০ দিনে হয়। ২৯ রোজার দিন চাঁদ দেখা কমিটি বৈঠকে বসে। দেশের আকাশে কোথাও শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে পরদিন ঈদুল ফিতরের ঘোষণা দেয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন। অন্যথায় ৩০ রোজা পূর্ণ হওয়ার পর দিন ঈদ পালন করা হয়।

সাধারণত মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরবের পর দিন বাংলাদেশে ঈদ পালিত হয়। দেশের অন্তত পাঁচ জেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে ঈদ পালন করা হয় সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে। এটির শুরু হয়েছে ১৯২৮ সালে চাঁদপুরে। জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা দরবার শরিফের পীর মাওলানা ইসহাক (রহ.)-এর হাত ধরে। জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার প্রধান মুফতি মাওলানা হিফযুর রহমান বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙো।’ চাঁদ দেখে রোজা বা ঈদ পালনের বিষয়টি আদিকাল থেকে চলে আসছে। উপমহাদেশের বড় বড় আলেমরাও এ ব্যাপারে একমত। এর মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে মুষ্টিমেয় কয়েকটি গ্রাম সৌদি আরবে সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ পালন করে। যারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করেন, তাদের কাজটি হাদিসের বিপরীত। আমরা তো সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে জোহর বা আসরের নামাজ পড়ি না। আমরা আমাদের দেশে চাঁদ বা সূর্য ওঠার সঙ্গে মিল রেখে পড়ি। ঈদের ব্যাপারটিও তেমন।’

অন্যান্য দেশের মুসলিমরা কোনদিন ঈদ পালন করবেন? : ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (ওআইসি) ও বাংলাদেশের চাঁদ দেখা কমিটির সদস্য মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) চাঁদ দেখে রোজা রাখা ও ঈদ পালনের কথা বলেছেন। নবীজি (সা.) ১৫০০ বছর আগে চাঁদ দেখার সঙ্গে ঈদ পালনের বিষয়টি চূড়ান্ত করে গেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘আরবি মাস হবে ২৯ বা ৩০ দিনে।’ এটি চাঁদের মাসের কথা। এর চেয়ে কম বা বেশি হবে না। আরেক হাদিসে আছে, ‘তোমরা চাঁদ দেখতে থাক। যদি ২৯ তারিখের চাঁদ কোনো কারণে (সেটি মেঘ বা অন্য কারণে) চোখের আড়াল হয়ে যায়, তা হলে ৩০ তারিখ পূর্ণ করে ঈদ করবে।’ মোটকথা খালি চোখে কারও না কারও চাঁদ দেখতে হবে। এসব হাদিসের আলোকে প্রমাণিত হয়, বিশ্বের সব মুসলিমদের জন্য চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই ঈদ এবং রোজা করতে হবে।’

পার্শ্ববর্তী দেশকে অনুসরণ করা যাবে? : ওআইসির এ সদস্য বললেন, ‘অন্য কোনো দেশকে ফলো বা অনুসরণ করে ঈদ করা যাবে না। দেশের আকাশে চাঁদ দেখা গেলে এবং সে দেশের জনগণ সাক্ষ্য বা সরকারি সংস্থা ঘোষণা দিলেই ঈদ পালন করতে হবে। ধরুন, পাশাপাশি দুই দেশ। উভয়ের সম্পর্ক খুব ভালো। পার্শ্ববর্তী দেশের চাঁদ যদি আরেক প্রতিবশী দেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করে বা ওই দেশের চাঁদ দেখা কমিটি গ্রহণ করে, এই গ্রহণের অধিকার আছে। এতে সমস্যা নেই। কিন্তু সৌদিআরব ও বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী দেশ নয়; এর মধ্যে আছে তিন ঘণ্টার ব্যবধান। চাঁদের উদয়াস্তলেরও ভিন্নতা রয়েছে। সৌদি আরব বা মক্কা-মদিনাকে অনুসরণের নির্দেশনা কোরআন-হাদিসের কোথাও নেই।’

কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্ট্যাডিজ বিভাগের অধ্যাপক (অব.) ড. হাফেজ এবিএম হিজবুল্লাহ বলেনে, ‘আমাদের দেশে কিছু জায়গায় সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ ও রোজা পালন করা হয়। এটি সঠিক নয়। রোজা বা ঈদ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এর সব কিছুই স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কোনো নির্দিষ্ট স্থানের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। নবীজি (সা.) চাঁদ দেখে রোজা ও ঈদ পালনের কথা বলেছেন।

চাঁদ দেখার বিষয়টি সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ, এমন অনেক ইবাদত রয়েছে যেগুলো সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিয়ে করার সুযোগই নেই। যেমন আমরা নির্ধারিত সময়ে সালাত আদায় করে থাকি। প্রতিটি সালাতের নির্দিষ্ট সময় রয়েছে । সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের দেশের সময়ের মিল নেই। তাই সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে আমাদের সালাত আদায় করার সুযোগ নেই। অতএব চাঁদ দেখার ক্ষেত্রেও সৌদি আরবকে ভিত্তি মনে করা উচিত নয়।’

চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ভালো : ‘যেই দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন চাঁদ দেখার ঘোষণা আসবে, তারই ভিত্তিতে রোজা পালন শুরু হবে এবং ঈদ উদযাপিত হবে। আমাদেরকে আমাদের দেশের হিসাব অনুযায়ী চলতে হবে। রাষ্ট্র ঘোষিত সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে।’ বললেন অধ্যাপক এবিম হিজবুল্লাহ। চাঁদ দেখা কমিটির সদস্য মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদও এমনটি বলছিলেন যে, ‘দেশের চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদ পালন করতে হবে। সৌদি আরব তাদের দেশের আকাশে চাঁদ দেখে ঈদ করবে, বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের দেশের আকাশে চাঁদ দেখে ঈদ করবে।’

সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ করলে হবে? : টঙ্গী এরশাদনগর আন-নূরানী জামে মসজিদের খতিব মুফতি সফিউল্লাহ আদম বললেন, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদের নামাজ এবং ঈদ উদযাপন চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল, সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে উদযাপনের ওপর নয়। ইসলামের প্রথম যুগে এক শহরের সঙ্গে অন্য শহর ঈদ পালনের জন্য একীভূত করা হয়নি।

যেমন, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘সিরিয়ার বাসিন্দারা একদিন আগে চাঁদ দেখেছিল, কিন্তু মদিনার লোকেরা তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখার ভিত্তিতে পরের দিন ঈদ উদযাপন করেছিল।’ (সহিহ মুসলিম)। বাংলাদেশের সাধারণ মুসলমানরা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদ উদযাপন করেন, যা শরিয়তের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিছু অঞ্চল সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করে, কিন্তু এটি ইসলামি শরিয়তের মূলনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়; কারণ এটি স্থানীয় চাঁদ দেখার নিয়ম লঙ্ঘন করে।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত