ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা

হিজরতের শিক্ষা ও উম্মাহর জাগরণ

শায়খ ড. হুসাইন বিন আবদুল আজিজ আলে শাইখ
হিজরতের শিক্ষা ও উম্মাহর জাগরণ

আমরা যখন মহান নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর হিজরতের ভিত্তিতে একটি নতুন হিজরি বছরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, তখন প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি হলো বিশ্বনবী (সা.)-এর জীবনচরিত স্মরণ রাখা, যাতে তার দুনিয়ার জীবন সুন্দর হয় এবং আখিরাত সুখময় ও প্রশংসনীয় হয়। তাঁর জীবনকে অনুসরণ করলে সফলতা অর্জিত হয়, আর তাঁর পথ অনুসরণ করলে মানুষ সৎ হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন আর তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (আলে ইমরান: ৩১)।

নবী করীম (সা.)-এর পবিত্র ও সুগন্ধিময় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো হিজরত, যার মধ্যে ছিল কষ্ট, পরিশ্রম ও পরীক্ষা। মুসলিম জাতির উচিত এই ঘটনাকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হিসেবে গ্রহণ করা। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে তারা আল্লাহর বাণী বাস্তবায়ন করতে পারবে, তার গভীর অর্থ বুঝতে পারবে ও তার ইঙ্গিত উপলব্ধি করতে পারবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রেরণ করেছিলাম স্পষ্টভাবে প্রমাণাদি ও গ্রন্থাবলিসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্ট বুঝিয়ে দেবার জন্যে যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে এরা চিন্তা করে।’ (সুরা নাহল : ৪৪)।

মুসলিম উম্মাহ কখনোই তাদের সমস্যা সমাধান, সংকট থেকে মুক্তি ও দুঃখ-কষ্ট থেকে বের হতে পারবে না; যদি না তারা সচেতনভাবে আল্লাহর কিতাব ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অধ্যয়ন করে, সঠিকভাবে বুঝে, গভীর বিশ্লেষণ করে ও তাঁর জীবনের প্রমাণিত বিষয়গুলো অনুসরণ করে। হিজরতের এই মহান ঘটনা বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে, যার মাধ্যমে উপকার লাভ করা যায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষতি কমানো যায়। এই শিক্ষাগুলো এখানে পুরোপুরি আলোচনা করা সম্ভব নয়; বরং আমরা এই মহান ঘটনার দুটি দিক নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।

প্রথম দিক: বিশ্বনবী (সা.)-এর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেরই একটি মূল লক্ষ্য ও কিছু পার্শ্বিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল প্রভুত্ব, ইবাদত, নাম ও গুণাবলিতে আল্লাহর একত্ব প্রতিষ্ঠা করা। মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো সময়ই অর্থহীন ছিল না। এমনকি হিজরতের সময়ও না, যখন তিনি তাওহীদের ঘোষণা দেননি বা শিরকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। শত্রুরা যখন তাঁকে অনুসরণ করছিল, তখনও তিনি এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। মদিনায় তাঁর শক্ত অবস্থান থাকলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলা বন্ধ করেননি। এমনকি মক্কা বিজয়ের পর বিজয়ী অবস্থায় থেকেও তিনি এ বিষয়কে অবহেলা করেননি। তাই প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক দেশে তাওহীদকে সর্বপ্রথম গুরুত্ব দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বল, আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোন শরীক নেই। আমি এরই জন্যে আদিষ্ট হয়েছি আর আমিই প্রথম মুসলিম।’ (সূরা আনআম: ১৬২-১৬৩)।

তোমরা আল্লাহকে পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদা দাও এবং এমন সব কাজ থেকে দূরে থাকো যা আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে মানার বিরুদ্ধে যায়। এমন চিন্তা থেকেও বেঁচে থাকো যা আল্লাহর প্রতি বান্দার দাসত্বে আঘাত করে। সব সৃষ্টির সঙ্গে ইবাদতের সম্পর্ক ছিন্ন করে একমাত্র মহান স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করো, যার হাতে লাভ ও ক্ষতি সবকিছু। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ আল্লাহর শরিক করলে আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত অবশ্যই নিষিদ্ধ করবেন, আর তার আবাস জাহান্নাম। জালিমদের জন্যে কোন সাহায্যকারী নেই।’ (সুরা মায়িদা : ৭২)। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সমকক্ষ ডেকে মারা যায়, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (বোখারি: ৪১৪৫)।

মুসলিমের পুরো জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত তাওহীদ। এমন তাওহীদ যা অন্তর, মন ও জিহ্বাকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রার্থনা করা থেকে পবিত্র রাখে; ইবাদতকে শুধু আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে; বিধান ও শরিয়তকে আল্লাহর আইন ও নবীর সুন্নাহ ছাড়া অন্য কোথাও থেকে গ্রহণ করা থেকে মুক্ত রাখে; এবং কেবল যুক্তি বা দর্শনের পথ নয়, বরং সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীন যেভাবে বুঝেছেন, সেই সঠিক বুঝ অনুযায়ী গ্রহণ করা হয়।

দ্বিতীয় দিক: নবী করিম (সা.)-এর জীবনচরিত একটি মহান নববী জীবন। এটিকে যত বেশি অনুসরণ করা হবে, ততই হেদায়েত পাওয়া যাবে, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও মুক্তি অর্জিত হবে। আমাদের মহান প্রতিপালক দুনিয়া ও আখিরাতের সুখকে বিশ্বনবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। আর তাঁর পথের বিরোধিতা করাকে দুনিয়া ও আখিরাতে দুর্ভাগ্য, ভয়, ভ্রষ্টতা ও বঞ্চনার কারণ বানিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে, আর রাসূলের কাজ তো কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।’ (সুরা নুর: ৫৪)।

বর্তমানে উম্মাহ বিভেদ, দ্বিধা ও দ্বন্দ্বে ভুগছে এবং নানান ফিতনায় জড়িয়ে পড়েছে। যেমন: দলাদলি, পক্ষপাতিত্ব ও নিন্দনীয় দলবাজি। এসবের মূল কারণ হলো সেই সঠিক সুন্নাহর পথ থেকে বিচ্যুতি, যে পথে ছিলেন রাসুল (সা.)-এর সাহাবিগণ ও তাঁদের অনুসারীরা। এসব ফিতনার কারণ হলো প্রবৃত্তির অনুসরণ, বিদআত, নিন্দনীয় মতামত, কালামি পদ্ধতি, কেবল যুক্তিনির্ভর পথ ও ব্যক্তিগত পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের ওপর আপতিত হবে বা আপতিত হবে তাদের ওপর মর্মন্তুদ শাস্তি।’ (সুরা নুর : ৬৩)।

হে মুসলিম উম্মাহ, হে আলেমগণ! তোমরা সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো, তাহলেই সঠিক পথ পাবে, ঐক্যবদ্ধ হবে ও একত্রিত হতে পারবে। সুন্নাহর পথে চল, তা রক্ষায় দৃঢ় থাকো। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা হুজুরাত : ০১)। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি এবং শাসকের কথা শোনা ও মানার নির্দেশ দিচ্ছি; যদিও তোমাদের ওপর কোনো দাসকে নেতা করা হয়। তোমাদের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে, সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাহ ও আমার পর সঠিক পথে পরিচালিত খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরবে। তা শক্তভাবে ধারণ করবে। আর নতুন নতুন বিষয় থেকে দূরে থাকবে। কারণ প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই পথভ্রষ্টতা।’ (আবু দাউদ: ১৬১)।

হিজরতের শিক্ষা থেকে একটি বড় শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর আনুগত্য করে, আল্লাহ তার সাথে থাকেন— সহায়তা, সমর্থন, সুরক্ষা, হেফাজত ও সঠিক পথনির্দেশ দিয়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিররা তাকে বহিষ্কার করেছিল আর সে ছিল দুইজনের দ্বিতীয় জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, ‘বিষণ্ণ হয়ো না, আল্লাহ তো আমাদের সঙ্গে আছেন।’ এরপর আল্লাহ তাঁর ওপর তাঁর প্রশান্তি বর্ষণ করেন ও তাকে শক্তিশালী করেন এমন এক সৈন্যবাহিনী দিয়ে যা তোমরা দেখ নাই; আর তিনি কাফিরদের কথা হেয় করেন। আল্লাহর কথাই সর্বোপরি। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তওবা : ৪০)।

কিছু লোক হিজরতের ঘটনা সম্পর্কে অনেক গল্প বর্ণনা করেছে, যেগুলোর সনদ দুর্বল এবং সেগুলো প্রমাণিত নয়। তাই সাধারণ মানুষের কাছে এগুলোর মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা উচিত নয়। আমাদের উচিত নির্ভরযোগ্য সুন্নাহর কিতাবগুলো অনুসরণ করা এবং হিজরতের ঘটনা বা মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো বিষয় প্রচার করার আগে তা যাচাই করা। যাচাই করা সহজ বিশেষ করে এই যুগে, যখন নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্য সহজেই পাওয়া যায়। আর আল্লাহই মুত্তাকিদের অভিভাবক। (২৬-১২-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ১২-০৬-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত