ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

অর্থনীতির উন্নয়নে মহানবীর (সা.) সাত কর্মসূচি

রায়হান রাশেদ
অর্থনীতির উন্নয়নে মহানবীর (সা.) সাত কর্মসূচি

রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধির বুনিয়াদ নির্ভর করে অর্থনীতির উন্নয়নের ওপর। বিশ্ববাসীর কল্যাণ ও সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে মদিনায় গিয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.) অর্থনীতিতে দেন এক দিগন্তকারী নতুন কর্মসূচি। সে কর্মসূচির আলোকে মদিনা শহর অর্থনীতিতে বুকটান দিয়ে পৃথিবী পাড়ায় সগৌরবে উঠে দাঁড়ায়। তাঁর কর্মসূচির আদলে মদিনা যেভাবে স্বপ্ন, সভ্যতায়, সৃজনে, নির্মাণে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছিল, তা ছিল জগতের বিস্ময়। তাঁর কর্মসূচির বদৌলতে স্পেন থেকে ইন্দোনিশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল মুসলিম বিশ্বে শোষণমুক্ত ও কল্যাণধর্মী নতুন এক অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কর্মসূচি ছিল কোরআনের দেখানো পথ। তাঁর দেওয়া কর্মসূচি অনুযায়ী ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন এবং দেশ গঠন করতে পারলে অর্থনীতির চাকা সচল, সবল ও কল্যাণকর হবে। এখানে অর্থনীতিতে দেওয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাতটি কর্মসূচি উল্লেখ করা হলো-

হালাল উপার্জন ও হারাম বর্জন

ব্যবহারিক জীবনে কিছু কাজ হালাল এবং কিছু কাজ হারাম ঘোষণা করেছে ইসলাম। উৎপাদন, ভোগ, বণ্টনের ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য। ইসলাম মানুষকে উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করেছে। ব্যক্তি পছন্দমতো উৎপাদন, উপার্জন, ভোগ, বণ্টন করবে। রিজিক অন্বেষণ করবে। কিন্তু হারাম পন্থায় তিল পরিমাণ উপার্জন করা যাবে না। ইসলাম কখনও হারাম পন্থাকে সমর্থন করে না। হালাল পন্থায় উপার্জনকে ইবাদত ও হারাম পন্থাকে নিষিদ্ধ এবং গুনাহের কাজ নির্ধারণ করেছে ইসলাম। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো। যা হালাল তাই গ্রহণ করো এবং যা হারাম তা বর্জন করো।’ (ইবনে মাজাহ : ২১৪৪)।

সুদ উচ্ছেদ

রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন দেখলেন, সমাজে সুদের মহামারি এবং সুদের কবলে পড়ে গণ-মানুষের পাজড় ভেঙে পড়েছে। তিনি তখন সুদ মুক্তির স্লোগান তুললেন। সমাজ থেকে দুর্নীতির অবসান ও জুলুমতন্ত্রকে নিঃশেষ করবার প্রয়োজনে সুদ প্রথাকে উচ্ছেদ করলেন। সুদভিক্তিক লেনদেনকে হারাম ঘোষণা করলেন। পবিত্র কোরআনে আছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা : ২৭৫)।

ইসলামি অর্থনীতিতে সবচেয়ে জঘন্য কাজ সুদ। এটি সমাজ শোষণের শক্তিশালী হাতিয়ার। সুদের অভিশপ্ত কবলে পড়ে বস্তুভিটা হারায় মানুষ। দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়। ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বাড়ে। দ্রব্যমূল্য ক্রমেই বৃদ্ধি পায়।

ব্যবসায়িক অসাধুতা উচ্ছেদ

ইসলামি অর্থনীতিতে সব ধরনের ব্যবসায়িক অসাধুতা নিন্দানীয় ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ব্যবসায়িক অসাধুতার ফলে মানুষ, গোত্র, মহল্লা ও সমাজে লেগে থাকে অশান্তির দাবদাহ। বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ব্যবসায়িক অসাধুতা কোনো অশোভন ও মন্দ কাজ নয়। এতেই যেন তাদের অর্থব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে। ব্যবসায়িক অসাধুতা শুধু কালোবাজারি চোরাকারবারি নয়; মজুতদারি, ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল, নকল প্রভৃতি জঘন্য অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখলেন, মদিনার প্রায় সব মানুষের কাজ-কর্মে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যবসায়িক অসাধুতা বিরাজমান। তাই তিনি ব্যবসায়িক অসাধুতা নিষেধ করলেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মাপে ঠিক দাও এবং কারও ক্ষতি করো না, সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ঠিক মতো ওজন করো। লোকদের পরিমাপে কম বা নিকৃষ্ট কিংবা দোষযুক্ত জিনিস দিয়ো না এবং দুনিয়াতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না।’ (সুরা শুয়ারা : ৮১-৮৩)।

জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন

জাকাত ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। কোরআনে নামাজ কায়েমের পর জাকাত আদায়ের আদেশ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশে সম্পদশালী সাহাবিরা জাকাত আদায়ে প্রতিযোগিতা করতেন। জাকাতের মাধ্যমে সমাজে সাম্য-সৌহার্দ্য সৃষ্টি হয়। মানুষের মাঝে ভেদাভেদ কমে আসে। গরিবের মুখে হাসি ফুটে। মানুষের অর্থনীতিতে গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত দাও।’ (সুরা হজ : ৭৮)।

রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রতিষ্ঠা

বিভিন্ন উৎস থেকে অর্জিত এবং রাষ্ট্রের কোষাগারে জমাকৃত ধন সম্পদই বায়তুল মাল। ইসলামি রাষ্ট্রের সবার এতে সম্মিলিত মালিকানা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা করেন। বায়তুল মালে সঞ্চিত ধন সম্পদের ওপর সবার অধিকার নিশ্চিত করেন। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক যেন মৌলিক মানবিক প্রয়োজনীয় চাহিদা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য তিনি বায়তুল মাল গড়েন।

উত্তরাধিকার ব্যবস্থার যৌক্তিক রূপদান

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আবির্ভাবের আগে পৃথিবীতে ভূমির উত্তরাধিকারের আইন ছিল অস্বাভাবিক। পুরুষানুক্রমে পরিবারের জৈষ্ঠ সন্তানই সব সম্পদ পেত। অন্যরা হতো বঞ্চিত। অথবা পরিবারের সব ছেলেরা সম্পদের অধিকারী হতো, নারীরা পেত না সম্পদের কিছুই। নারীরা ছিল অবহেলিত বঞ্চিত এবং লাঞ্চিত। এ নীতিতেই চলছিল বিশ্বের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা। রাসুল (সা.) সম্পদে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অধিকার নিশ্চিত করেন। কোরআনে আছে, ‘বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদের অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশি। এ অংশ নির্ধারিত।’ (সুরা নিসা : ৭)।

রাষ্ট্রের ন্যায় সঙ্গত হস্তক্ষেপের বিধান

সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা ইসলামের বড় লক্ষ্য। সমাজের জুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি, অর্থনীতিতে শোষণ, সুদ, ঘুষ, মুনাফাখোরি, মজুতদারি বন্ধ করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ন্যায় সঙ্গত হস্তক্ষেপের বিধান আরোপ করেন। এতে রাষ্ট্র ও তার অর্থনীতির বাক পরিবর্তন হয়। সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরে আসে। তিনি সমাজের মানুষের জন্য কায়েম করেন সামাজিক নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জনকল্যাণে রাখেন সর্বাধিক জোরালো ভূমিকা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত