ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

খাবার

ব্রিটিশ আমলে ঢাকাই খাবার

রিদওয়ান আক্রাম
ব্রিটিশ আমলে ঢাকাই খাবার

৪০০ বছরের সময়কালের মধ্যে ঢাকাবাসীর খাদ্যাভ্যাসের বেশ বিবর্তন হ?য়েছে। তুর্কি, পাঠান, মুঘল, ব্রিটিশদের মতো আবহমান বাংলার খাবারও ঢাকার খাবারের তালিকায় স্বমহিমায় জায়গা করে নিয়েছে। বিভিন্ন শাসনামলে শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকার খাবারে যোগ হয়েছে নতুন নতুন পদ। শাসক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেসব খাবারের অনেক কিছুই হয় একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে কিংবা হয়েছে রূপান্তরিত। হয়তো আদি খাবারটির সঙ্গে আজকের সে খাবারটির 'নাম' ছাড়া অন্য কোনো মিলই নেই। ঢাকার খাবারের এসব পরিবর্তন ও বিলুপ্তির কারণ যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থনৈতিক দীনতা, চর্চার অভাব এবং ব্যস্ত ব?্যক্তিজীবন। ব্রিটিশ আমলের ঢাকার খাবার খুঁজতে গিয়ে আমাদের নজর দিতে হবে ঢাকার ক্ষমতা বদলের দিকে। খাবারের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলেরও। আগের শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় যেসব খাবারের বিকাশিত হ?য়েছিল, ব্রিটিশ আমলে সেসব খাবার ক্রমান্বয়ে বিলুপ্তির মুখে পড়ে।

মুঘলদের রাজধানী হিসাবে ঢাকার দিন শেষ হয়ে আসে নবাব মুর্শিদকুলি খানের সময়। যখন ১৭০২ সা?লে তিনি দিওয়ানি বিভাগ ঢাকা থেকে নিয়ে যান মুর্শিদাবাদে। এর কিছুদিন (১৭১৫-১৬ সা?লে) পরেই মুঘল সুবে বাংলার রাজধানী একেবারে চলে যায় ঢাকা ছেড়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রাজধানী হি?সে?বে ঢাকা নি?জের গুরুত্ব হারায়। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত যে বিশাল সংখ্যক মুঘল ছিলেন, তারাও ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকার অভিজাত শ্রেণির একটা বড় অংশও সে সময় শহর ছেড়ে গেছে তা ধরে নেওয়া যেতে পারে। তাই বলে ঢাকা হঠাৎ করেই নিজের জৌলুস হারিয়ে ফেলেনি। কেননা, ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে ঢাকা তখনও নিজের অবস্থান কিছুটা হলেও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এভাবে চলতে থাকলেও ঢাকার ওপর মূল আঘাত এসে লাগে ১৭৫৭ সালের ঐতিহাসিক ক্ষমতার সেই পালাবদলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ সা?লে মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজস্ব সংগ্রহের ভার পায়। বাংলার নবাবের প্রতিনিধি হিসাবে ঢাকার নায়েব-নাজিমরা পরিণত হন ক্ষমতাহীন শাসকে। নায়েব-নাজিম এবং তাদের ঘিরে থাকা ব্যক্তিরাই ছিলেন ঢাকায় মুঘল আভিজাতের শেষ প্রতিনিধি। ঢাকার অভিজাত শ্রেণির মধ্যে ছিলেন উত্তর ভারতের মুসলমান, ইরানি, মুঘল ও তুর্কিরা। এসব অভিজাত শ্রেণির নিজস্ব জীবনযাত্রার সঙ্গে খাবার-দাবারও ঢাকার খাদ্য তালিকায় যোগ হয়েছিল। ভারতবর্ষে বাস করলেও তারা নি?জেদের দেশীয় খাবারেই বেশি অভ্যস্ত ছিলেন। প্রধান খাদ্য হিসাবে ছিল মাংস ও রুটি। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ার জানাচ্ছেন— 'রুটি ভারতবর্ষের উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবিত্তদের প্রধান খাবার। বাণিজ্যিকভাবে এটি কারখানায় তৈরি হলেও তা মানসম্মত ছিল না। বিশেষ করে খোলা অবস্থায় রাখার কারণে এসবে ধুলোবালি এবং মাছি পড়ত। খোলা বাজারের রুটর প্রধান ক্রেতা নিম্নবিত্ত হলেও উচ্চবিত্ত বা অভিজাতরা নিজেদের বাড়িতে রুটি বানিয়ে নিতেন।' কবি মুকুন্দরাম তার চন্ডীকাব্যে রুটি প্রস্তুতকারীদের 'পিটারী' বলে উল্লেখ করেছেন। 'পিটারী' শব্দের অর্থ পিঠা প্রস্তুতকারী। সে হিসাবে এরা রুটির পাশাপাশি পিঠাও প্রস্তুত করত। এসব রুটি কীভাবে বানানো হতো সেটার বর্ণনাও দিয়েছেন বার্নিয়ার 'রুটি প্রস্তুতে ব্যবহার করা হতো যথেষ্ট পরিমাণ দুধ, মাখন, ঘি। রুটি হতো বেশ শক্ত।' তবে এসব রুটির স্বাদ নিয়ে বার্নিয়ার সন্তুষ্ট ছিলেন না। খেতে নাকি অনেকটা কেকের মতো লাগত। বার্নিয়ারের বর্ণনা ১০০ বছর আগে হলেও ধরে নেওয়া যায়, নায়েব-নাজিমদের সময়ে ঢাকার অভিজাত শ্রেণির খাদ্য তালিকায় রুটির উপস্থিতি ছিল। তবে নিম্নবিত্ত বা স্থানীয়রা রুটির ধার ধারতেন না। বার্নিয়ার বাংলায় ভ্রমণে (১৬ শতকের মাঝামাঝি) এসে সে কথাই বলে গেছেন— 'বাঙালিরা গমের খাদ্য পছন্দ করে না। ভাত-মাছ তাদের প্রধান খাবার।' ১৭৮৬ সা?লে গোলাম হোসেন সালিমও বার্নিয়ারের কথা সমর্থন করে তার রিয়াজ-উস-সালাতীনে লিখেছিলেন— 'এ দেশের (পূর্ববঙ্গের) উঁচু-নিচু সবাই মাছ, ভাত, সর্ষের তেল, দই, ফল আর মিঠাই খেতে পছন্দ করে। প্রচুর লাল মরিচ এবং লবণও তাদের পছন্দ। তারা আদৌ গম এবং গমের রুটি খায় না। ঘিয়ের রান্না খাসি এবং মোরগের মাংস তাদের মোটেই সহ্য হয় না।' গোলাম হোসেন এ দেশের 'উঁচু-নিচু' বলতে সম্ভবত এখানকার স্থানীয়দের কথা বলতে চেয়েছেন। মুঘল অভিজাতরা তার সে বক্তব্যের সম্পূর্ণ বাইরে থেকে গেছেন। ঢাকা যেহেতু পূর্ববঙ্গের বাইরে নয়, সেহেতু বলা যায় ঢাকার আদি বাসিন্দারা ভাত-মাছেই নিজেদের সুখ খুঁজে পেয়েছিল। আর এজন্য পূর্ববঙ্গের আবহাওয়া এবং ভৌগোলিক পরিবেশ কাজ করেছিল। পলিবাহিত উর্বর জমিতে প্রচুর ধান উৎপাদন হতো। আওরঙ্গজেবের সময় বাংলা থেকে উদ্বৃত্ত ধান দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অংশে রপ্তানি হতো। শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপেও বাংলার ধান রপ্তানি হতো। এ তো গেল ধান তথা ভাতের কথা। সঙ্গে মাছের কথা না বললে এক ধরনের অপূর্ণতা থেকেই যায়। নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে মাছ পাওয়াও যেত প্রচুর। আর তাই এখানকার অধিবাসীদের খাদ্য তালিকায় মাছকে প্রধান স্থান দখল করে নিতে তেমন সমস্যা হয়নি। হরেক রকম মাছের হরেক রকম স্বাদের কাছে বাঙালিরা ছিল কুপোকাত। এ জন্য মুঘলদের কাছ থেকে তাদের কম কটূ কথা শুনতে হয়নি। কিন্তু তাতে দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না নদীপারের মানুষগুলো। শাসক গোষ্ঠীর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যকে উপেক্ষা করে বাঙালি ভাতের সঙ্গে দিব্যি তুলে নিয়েছে মৌরলা মাছের ঝোল কিংবা ভাজা কৈ মাছ। বুড়িগঙ্গা তীরের ঢাকা শহরের মানুষেরা উনিশ শতকের প্রথমদিকে কী কী মাছ খেতেন তার একটা হদিস পাওয়া যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকুরে সিভিল সার্জন জেমস টেলরের 'টপোগ্রাফি অব ঢাকা'তে। যদিও তার বর্ণনায় মাছগুলো বৈজ্ঞানিক নামে ভারাক্রান্ত; কিন্তু তাতে আমাদের চিনতে অসুবিধা হয় না কুচিয়া, চান্দা, মাগুর, শিং, খলিশা, কৈ, বোয়াল, পাবদা, পাঙ্গাশ, টেংরা, বাতাসি, চিতল, ইলিশ এবং তোপসের মতো মাছদের। শেষোক্ত মাছটির স্বাদ সম্পর্কে তেমন একটা ভালো ধারণা দেননি টেলর সাহেব। কেন? সে এক রহস্য! তার মতে, এপ্রিল-মে মাসে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া এ মাছ স্বাদ ও আকার বিচারে নিকৃষ্টমানের। স্থানীয়দের কাছে এই তোপসের জনপ্রিয়তা কেমন ছিল তা বোঝা যায় ঈশ্বরগুপ্তের 'তপসী মাছ' কবিতায়। তোপসে মাছের স্বাদের কথা বলতে গিয়ে কবি বলেছেন, এই মাছ এতটাই সুস্বাদু যে তেলে ভাজার অপেক্ষাটুকু করা যায় না। মনে হয়। কাঁচাই খেয়ে ফেলি। তোপসে মাছ নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকলেও ইলিশের কোনো বদনাম করেননি টেলর। তিনি পরাস্ত হয়েছেন এর অতুলনীয় স্বাদের কাছে। শুধু কি টেলর? তার সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছেন অন্য সাহেবরা। কিন্তু বাদ সেধেছিল ইলিশ মাছের কাঁটা। সে সমস্যা থেকে মুক্তি দিতেই যেন— 'স্মোকড হিলসা'র আবিষ্কার। বাষ্পীয় পদ্ধতিতে রান্না করা ইলিশই ইংরেজদের ছাড়পত্র দিয়েছিল এর স্বাদটুকু নির্বিঘ্নে আস্বাদন করতে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শংকর 'স্মোকড হিলসা'কে আখ্যায়িত করেছেন ্তুবিলিতি মেমসাহেব এবং দেশি রাঁধুনিদের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন।' ঢাকার গ্রামবাসীদের প্রধান আমিষজাতীয় খাবারের মধ্যে ছিল কৈ, খলিশা, মাগুর, রুই, কাতলা, কালিবাউস, পুঁটিমাছ। মাছ সম্পর্কে নানা তথ্য দেওয়ার ফাঁকে টেলর এটাও জানিয়েছেন, শীতকালে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া পুঁটিমাছ সেদ্ধ করে তেল পাওয়া যায়। সে তেল সাধারণ গরিব মুসলমানরা ব্যবহার করে জ্বালানি হিসাবে। ১৫ সের তেলের দাম এক টাকা। অতিরিক্ত উৎপাদিত তেল কলকাতাতেও রপ্তানি হতো। এ তো গেল মাছের নাম। কিন্তু এসব মাছ কীভাবে রান্না করা হতো; এসবের রেসিপি পাওয়া যায় মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কিংবা বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলের মতো মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে। আমিষের মধ্যে মাছের কথা বলা হলো, মাংসই বা বাদ যাবে কেন? ঢাকার মুসলমানরা ধর্মীয় বিধিনিষেধের মধ্যে থেকেই মাংস ভক্ষণ করেছেন। মাংসের চাহিদার জন্য মুসলমানরা শরণাপন্ন হয়েছেন গরু, ছাগল, হরিণ, মুরগি, মোষ প্রভৃতির কাছে। পূর্ব বাংলার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া উট কিংবা দুম্বার মতো প্রাণীদের সহজলভ্য করে তোলেনি। মুঘল আমলে গরু পালন এবং ব্যবসায়ী হিসাবে কাজ করত মুসলমানদের একটি শ্রেণি। এদের মুকেরী বলা হতো। নিজেদের মাংসের চাহিদার কারণেই সম্ভবত মুসলমানরা গরু পালার দিকে উৎসাহী ছিলেন। প্রাত্যহিক খাবারের মেন্যু ছাড়াও গরু মুসলমানদের কোরবানির প্রধান পশুও ছিল। তবে ব্রিটিশ আমলে পুরো ভারতবর্ষেই গরু কোরবানি নিয়ে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় দ্বন্দ্বের সূচনা হয়েছিল। ঢাকার বাইরে জমিদাররা নি?জেদের মুসলমান প্রজাদের কোরবানি দিতে বাধা দিতেন। সুধাকর পত্রিকা (৭ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯০) সে রকমটাই জানাচ্ছে— 'বকরি ঈদেও ঊর্ধ্বতন হিন্দু কর্মচারী এবং জমিদারের আমলারা বগুড়ার নারহাট্টার মুসলমানদের কোরবানি দিতে দেয়নি। মুসলমানদের উচিত এ ব্যাপারে গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি পেশ করা।' তবে বলা যায় এসব বিতর্কের বাইরে ছিল ঢাকা। সম্ভবত ঢাকায় মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য এবং নবাবদের জন্য সেটা সম্ভব হয়েছিল। সে কথাই উল্লেখ করে সারস্বতপত্র (৩০.০৩.১৮৯০) লিখেছেন, 'এটা সত্যি যে, ঢাকার সমাজের অনেক ত্রুটি ও দুর্নাম আছে। কিন্তু এখন যখন দেশে গরু কোরবানি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন চলছে, সে সময় ঢাকা এসব থেকে মুক্ত। ঢাকার হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে নিখুঁত ভালো সম্পর্কই বিদ্যমান ছিল। উভয়ে উভয়ের ধর্মীয় উৎসবাদিতে যোগ দেয় এবং কেউ কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে চায় না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের উচিত ঢাকাকে অনুসরণ করা।' শুধু কোরবানি দিতে পারাই নয়, ঢাকায় অনেক কসাইয়ের দোকানও ছিল; যেগুলোতে প্রকাশ্যে গরুর মাংস বিক্রি হতো। কসাইরা বকরি কিংবা ছাগলের মাংসও বিক্রি করত। ছাগলের মাংস খাওয়ায় হিন্দুদের ধর্মীয় রীতিতে বাধা না থাকলেও সন্দেহ আছে— মুসলমান কসাইয়ের কাছ থেকে এরা মাংস কিনতেন কি না? উনিশ শতকের সত্তর দশকের ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস ওয়াইজের কথানুসারে ঢাকা শহরের মুসলমান কসাইরা দুই ভাগে বিভক্ত। একদল ছাগল বা বকরির কসাই এবং অন্যদল গরুর কসাই। এই দুদলের মধ্যে বকরির কসাইয়ের স্থান ছিল উচ্চে। এসব কসাইয়ের পদবি ছিল মিহতর। এদের দলপতি বা সর্দারের অধীনে থাকত একজন নায়েব বা আমিন। ঢাকার এসব কসাইয়ের দোকানে প্রতিদিন মাংস বিক্রি হতো। তবে কখনও কখনও হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রয়োজনে আবার গোমাংসের দোকান বন্ধও রাখা হতো। যেমনটা ঘটেছিল ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিক ভজহরি সাহা শঙ্খনিধির স্ত্রীর শ্রাদ্ধতে। সেসময়কার পত্রিকা জানাচ্ছে- 'গত ৮ পৌষ বাবু ভজহরি সাহা শঙ্খনিধির স্ত্রীর আদ্যশ্রাদ্ধ গিয়াছে।... বড় সুখের বিষয়, লালমোহন বাবু সেই শ্রাদ্ধ বাসরে ঢাকাতে গো হত্যা হইতে দেন নাই; সেই একদিন তাহার মতে বহু গোর প্রাণরক্ষা হইয়াছে এমনকি সেই দিনে ঢাকার সমস্ত গো-মাংসের দোকান (কসাইদের দোকান) বন্ধ ছিল।' ১১ পৌষ। ১৩০৫, ২৫ ডিসেম্বর, ১৮৯৮। ঢাকা প্রকাশের এই সংবাদের উল্লেখযোগ্য অংশটি হচ্ছে 'বহু গোর প্রাণরক্ষা হইয়াছে'। এতে বোঝা যায় সে সময়ের মুসলমান ঢাকাবাসীর কাছে গরুর মাংসের একটা ভালো চাহিদা গড়ে উঠেছিল। মাংসের এই চাহিদা পূরণের জন্য মুসলমানরা সম্ভবত হিন্দুরাও দ্বারস্থ হতেন মুরগির কাছে। উনিশ শতকের শেষের দিকে মুসলমানদের বাড়িতে মুরগি পালা হতো। হঠাৎ করে গৃহে উপস্থিত হওয়া মেহমানকে আপ্যায়ন করার জন্য এটাই ছিল উৎকৃষ্ট ও সহজ উপায়। মুরগি, হাঁস কিংবা রাজহাঁস কিনে বাণিজ্যিকভাবে মোটাতাজা করে শহরের বাজারে বিক্রির কাজটাও করতেন মুসলমানরা। এদের বলা হতো মুরগিওয়ালা বা মুর্গবান। মুসলমানদের পাশাপাশি এই কাজটা নিম্নবর্গের হিন্দুরাও করতেন। ঢাকার খাবার-দাবারের বিভিন্ন রকমের উপস্থিতি দেখা যেত ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসবে (বিশেষ করে বিয়ে, মুসলমানি, অন্নপ্রাশন)। মুসলমানদের মধ্যে ঈদ উদযাপনের বড় আকর্ষণই হচ্ছে খাবার-দাবার। উনিশ শতকের আশির দশকের শেষের দিকে ঢাকার আদি অভিজাত শ্রেণি, যারা মুঘল ঐতিহ্য নিজেদের মধ্যে বেশ করে চর্চা করতেন তাদের ঘরে পরিবেশিত হতো তোরাবন্দি খাবার। তোরাবন্দি খাবারের মধ্যে থাকত চার ধরনের রুটি, চার ধরনের ভাত, চার ধরনের কাবাব, চার রকমের মিষ্টি ছাড়াও পনির, বোরহানি এবং আচারসহ সর্বমোট ২৪ রকমের খাদ্য। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এই তোরাবন্দি খাবার কালক্রমে নিম তোরাবন্দি বা অর্ধেক তোরাবন্দিতে পরিণত হয়ে গত শতাব্দীর বিশ দশকের দিকে এসে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ব্রিটিশ আমলে ঢাকার খাদ্যজগতে ব্রিটিশদেরও অবদান ছিল। তা হয়তো ব্যাপকভাবে ঢাকাবাসীর খাদ্য মেন্যুতে পরিবর্তন আনেনি, তাই বলে সেটি একেবারে তুচ্ছ করার মতোও নয়। আর ব্রিটিশরাও এ দেশীয় খাবারে কম-বেশি মজে গিয়েছিলেন। সেটা ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধ জয়ের দিনে বিজয়ী সেনাপতি লর্ড ক্লাইভের ডিনারের মেন্যু দেখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেদিনের ডিনারের মুরগি দোপেঁয়াজা, মালাই চিংড়ি এবং বিরিয়ানিই বলে দেয় ইংরেজরা এ দেশের মানুষকে তুচ্ছ করলেও খাবারকে তুচ্ছজ্ঞান করেনি। উনিশ শতকে ঢাকায় থাকা ইংরেজরা নিজস্ব পাচকের মাধ্যমে খাবার প্রস্তুত করত। পাচক এ দেশীয় হলেও খাবার প্রস্তুত হতো মনিবের ফরমাশ অনুযায়ী। ইউরোপীয় রীতিতেই; ইউরোপীয় ধরনেই-কম ঝাল, কম মসলায়। উনিশ শতকের প্রথমদিককার ইংরেজ সিভিলিয়ানদের সকালের নাশতায় হাজির থাকত রুটি, মাখন, টোস্ট ছাড়াও ডিম, মাছ, ভাত, মুরগির মাংস, হ্যাম প্রভৃতি। দুপুর দুটোয় হতো টিফিন। এ সময় থাকত ঠান্ডা মাংস, তরকারি, সালাদ প্রভৃতি। সঙ্গে থাকত স্যুপ। মসলায় মুরগি সিদ্ধ আর হলুদ দিয়ে তৈরি হতো এই স্যুপ। এ স্যুপের একটা ভারিক্কি নামও ছিল 'মুন্নি কি তানি'। রাতের খাবারে ইউরোপীয় খানাপিনার সঙ্গে সগর্বে উপস্থিত থাকত দেশীয় পোলাও-কাবাব, সিদ্ধ করা নানা ধরনের সবজি, গরু, খাসি, মুরগির রোস্ট প্রভৃতি। ফল হিসাবে থাকত পেয়ারা, কলা, কমলা, আনারস, লিচু কিংবা বিভিন্ন মওসুমের ফল। যদিও ওপরের বর্ণনাটুকু কলকাতার, তারপরও বলা যায় সমসাময়িক সময়ে ঢাকার সিভিলিয়ানদেরও দৈনন্দিন খাবারের মেন্যুতে সেসবের উপস্থিতি থাকত সগৌরবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, নতুন শাসকগোষ্ঠী হিসাবে ইংরেজদের খাদ্যতালিকায় আভিজাত্য বজায় ছিল পূর্ণমাত্রায়। ব্রিটিশ আমলে ঢাকার খাবারের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এমন কিছু খাবার যুক্ত হয়েছে যেসবের অস্তিত্ব আগে ছিল না। পানীয় এবং শুকনো খাবারে ব্রিটিশদের অবদান অস্বীকার করার মতো নয়। তাদের ব্যক্তিগত পাচকদের হাত ধরে ব্রিটিশদের খাবার চলে এসেছে সাধারণ মানুষের ঘরে। একসময়ে তা বাণিজ্যিক রূপও লাভ করে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত