প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
কবি ওবায়দুল ইসলাম তার 'একাত্তুরের নদী' কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের নদীর ভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন—
বাঙালির দামাল ছেলের মতো
নদীও যুদ্ধে ছিল-একাত্তুরে।
প্রমত্ত পদ্মায়, যমুনায়-মেঘনায়
ধলেশ্বরী, মধুমতি, আড়িয়াল খাঁর বাঁকে বাঁকে
কর্ণফুলী, করতোয়া, কুমার-কাবেরী
কুশিয়ারা-সুরমা কূলে-উপকূলে
ভয়ঙ্কর যুদ্ধ এবং সশস্ত্র-বিদ্রোহ।
নদীও যুদ্ধ জানে। যুদ্ধে জন্ম যার-রণক্ষেত্র ঘুরে
সে জানে মৃত্যু কোথায়— সেই একাত্তুরে
বিকেলে হলুদ নদী যে রক্তাক্ত হতো রাতে
সারারাত লাশ বয়ে নিয়ে বীরবেশে দাঁড়াতো প্রভাতে।
(সূত্র : মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, নদী সংখ্যা
(১৯৯৯-২০০০)।
১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে সারা দেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা হাজারো নদ-নদীই পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় ত্বরান্বিত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে অসংখ্য যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল খোদ নদীতেই। নদীতে সংঘটিত ছোট-বড় এসব যুদ্ধে বীর বাঙালির কাছে পরাস্ত হয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি।
সুদীর্ঘকাল ধরে সেই নদীর সঙ্গে বাংলার মানুষের প্রাণের সম্পর্ক। এ অঞ্চলের মানুষ নদী তীরে বসতি গড়ে সখ্য করেছে নদীর সঙ্গে। নদী হয়েছে তার আপনজন। তবে, এ নদীর সঙ্গে তাদের বৈরিতাও কিন্তু কম নয়! বন্যা, হঠাৎ পাহাড়ি ঢল ও ভাঙন নদী পাড়ের মানুষের জীবনকে কখনও কখনও ছিন্নভিন্ন করে দেয়। তবুও নদী পাড়ের মানুষ এ নদীকেই ভালোবেসে সুখের বসতি গড়ে, স্বপ্ন বুনে সুন্দর আগামীর। এ দেশের কৃষি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে ওঠেছে এই নদীকে কেন্দ্র করেই।
একাত্তরে এসব নদী দিয়েই ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল লক্ষ লক্ষ বাঙালি। আগরতলায় স্থাপিত ইয়ুথ রিলিফ ক্যাম্পের নামকরণও করা হয়েছিল নদীর নামে— পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও গঙ্গা প্রমুখ। সে সময় সীমান্তের এক-একটা নদী হয়ে উঠেছিল আশ্রয়প্রার্থী অসহায় মানুষগুলোর বিশ্বস্ত বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির অন্যতম প্রিয় স্লোগান ছিল— 'তোমার আমার ঠিকানা— পদ্মা, মেঘনা, যমুনা।' শুধু পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নয়— বাংলার প্রায় সব নদনদীই হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী বাঙালির ঠিকানা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অগণিত গণহত্যা সংগঠিত করে বাংলার নদনদীর তীরেই। তারা বাঙালিদের হত্যা করে লাশ ফেলত নদীতে। অসহায়, নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর অব্যাহত নির্মম নির্যাতনে রক্তস্নাত বাংলার সব নদী ফুঁসে ওঠে হানাদারদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নদী হয়ে ওঠে সহায়ক শক্তি।
নদনদী বিধৌত বাংলায় বেড়ে ওঠা দামাল ছেলেদের কাছে সবকিছুই ছিল পরিচিত। হাতে অস্ত্র নিয়ে নদীতে সাঁতার কাটতে কাটতে কখনও বা পানিতে ডুবাতে ডুবাতে যুদ্ধ করেছে তারা। পক্ষান্তরে পাকিস্তানীদের কাছে তা একেবারেই অপরিচিত পরিবেশ। এ সুযোগটাই কাজে লাগায় রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা। নদী পথের লড়াইকে আরও জোড়ালো করার লক্ষে প্রতিষ্ঠা করা হয় নৌ-কমান্ডো দল। সারাদেশের নদীপথে গেরিলা অপারেশন চালানোর জন্য এ দল তৈরি করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নৌ-কমান্ডো, সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ দশ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। এই সেক্টরে পদস্থ কর্মকর্তা না থাকায় ছিল না কোনো অধিনায়ক।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এই নদীকে কেন্দ্র করেই সমর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। এর প্রধান কারণ বাংলার এ অঞ্চলটিই নদ-নদী প্রধান। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লে.জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার লেখায়। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ঢাকা। যেভাবেই হোক ঢাকা পৌঁছাতে হবে, ঢাকাকে দখল করে নিতে হবে। আর এ কাজটি যত দ্রুত সম্ভব হবে, পাকিস্তানিদের পরাজয় তত সহজতর হবে। আর তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব দিক থেকে শত্রুদের বহুমুখী আক্রমণ চালাতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের ভাবনার অগ্রভাগে ছিল নদী। পূর্ব বাংলাকে নদী দিয়ে বিভক্ত করে এলাকা অনুযায়ী চারটি সেক্টরে ভাগ করে সে অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করলে, লক্ষ্য পূরণ সহজ হবে, এটাই ছিল পরিকল্পনা।
একইভাবে পাকিস্তানি লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজি ১৯৭১-এর যুদ্ধে বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পর্যক্ষেণ করে সেনা মোতায়েন করেছিলেন এবং তাতে নদীই ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার অংশ। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তার লেখা 'দ্য বিট্রেয়াল অব ইষ্ট পাকিস্তান বইতে লিখেন— '.....সাবেক পূর্ব পাকিস্তান বা আজকের বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারত। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ছোট একটি অংশ বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। চতুর্থ দিকে আছে বঙ্গোপসাগর। মূলত পূর্ব পাকিস্তান একটি নিম্নভূমি, যার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে অসংখ্য নদী ও জলধারা। সেখানকার তিন প্রধান নদী হলো— পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। বর্ষার সময় এ নদীগুলো সমুদ্রের মতো হয়ে যায়। এ নদীগুলোর আবার অসংখ্য শাখা ও উপনদী আছে, যার কারণে এ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত প্রতিকূল।
পুরো পূর্ব পাকিস্তানে শুধু ভৈরব ও পাকশীতে দুটি সেতু ছিল। সড়ক ও সেতুর অভাবে নৌকা ও ফেরি এ অঞ্চলে যোগাযোগের প্রধানমাধ্যম। এটি যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি গেরিলাযুদ্ধ মোকাবিলায় অনেক ঝামেলাপূর্ণ। এতে করে গেরিলাদের হঠাৎ আক্রমণের মুখে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। দ্রুত নদীর প্রতিবন্ধকতা দূর করার একমাত্র সমাধান হলো আকাশপথ, ১৯৭১ সালে ভারতীয়রা ঠিক এটাই করেছিল, অথবা নদীর উভয় পাড়ে প্যারাট্রুপার নামানো।
সেখানকার আবহাওয়া খুবই উষ্ণ ও আর্দ্র। বর্ষাকালের স্থায়িত্ব অনেক বেশি এবং তখন খুব ভারী বৃষ্টিপাত হয়। বর্ষার সময় আর্দ্রতা এত বেড়ে যায় যে যারা এর সঙ্গে ধাতস্থ নয়, তাদের পক্ষে এটি সহ্য করা খুবই কঠিন। এ আবহাওয়া মানুষের শক্তি শুষে নেয়। এ স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া শুষ্ক অঞ্চলের মানুষের জন্য বিপজ্জনক। এই পরিবেশে নানা রকম রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। এর মধ্যে ম্যালেরিয়া সবচেয়ে বিপজ্জনক। জোঁকসহ অনেক রকম বিপজ্জনক কীটের উপদ্রব দেখা দেয়। ঠিকঠাক সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে এই আবহাওয়া ও কীটপতঙ্গ সেনাদের জন্য বুলেটের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।'
তিনি আরও লিখেন— 'আমার সেনারা ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের শুস্ক অঞ্চলের। অনেকেই জীবনে বড় নদী দেখেনি এবং তারা এও জানত না, নাভির চেয়ে বেশি উচ্চতার পানিতে কীভাবে হাঁটা যায়। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পাঁচ-ছয় মাইল অন্তর নদী বা খাল-বিল আছে। আর বড় নদীগুলো তো আমাদের কাছে সাগরের মতো। তাই তাদের অভিযানের মধ্য দিয়েই সাঁতার, নৌকা চালানো, পানির মধ্য দিয়ে হাঁটা সবকিছুই শিখতে হয়েছে। এসব কারণে আমাদের চলাচল ব্যাহত হয়েছে, বিশেষ করে বর্ষাকালে। (১৯৭১ : শত্রু ও মিত্রের কলমে, সম্পাদক-মতিউর রহমান, পৃষ্ঠা- ৭৭, ৭৯-৮১, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন)।
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ যে বাংলার নদনদী তা পাকিস্তানী লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজির এই বক্তব্যেই স্পষ্টতই বোঝা যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ভাগীরথী নদীর তীরে। নদীটি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রবাহিত। ভাগীরথী নদীর তীরে যে মাঠটিতে নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ হয়েছিল সেটিই ঐতিহাসিক পলাশীর প্রান্তর। যে মাঠে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলা-বিহার-উরিষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটে।
'নিউইয়র্ক টাইমস'-এর দিল্লি সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গ (ডেটলাইন : আগরতলা, ভারত ১৩ এপ্রিল, ১৯৭১:) তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন— '...বাঙালিরা নির্ভর করছে বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির ওপর, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যা শুরু হবে। পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামাঞ্চলের জটিল পথ-গাঙ্গেয় ব্রহ্মপুত্র জলধারা ও সহস্র নদীর আঁকিবুঁকি-পশ্চিম প্রদেশের শুষ্ক ও পার্বত্য অঞ্চল থেকে আগত পাঞ্জাবি ও পাঠানদের কাছে অপরিচিত। বর্ষায় যখন নদী ফুলে-ফেঁপে উঠবে এবং মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বন্যায় পূর্ব পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়বে, তখন এ অপরিচিতি আরও বাড়বে।
বর্ষায় মুক্তিবাহিনীর প্রস্তুতির বিষয়ে এক বাঙালি অফিসার তাকে বলেন, 'আমরা এখন বর্ষার অপেক্ষায় রয়েছি...। তারা পানিকে এতো ভয় পায়, আপনি ভাবতেই পারবে না এবং আমরা হচ্ছি জলের রাজা। তারা তখন ভারী কামান ও ট্যাংক নিয়ে চলতে পারবে না, জঙ্গি বিমান উড়াতে পারবে না। প্রকৃতি হবে আমাদের দ্বিতীয় বাহিনী। (ডেটলাইন বাংলাদেশ : নাইন্টিনসেভেন্টিওয়ান, সিডনি শনবার্গ, অনুবাদ- মফিদুল হক)।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ৩ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে ভারতের আগরতলার পত্রিকা 'দৈনিক সংবাদ' তাদের সম্পাদকীয়তে পশ্চিম পাকিস্তানিদের পরাজয়ের সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ করে। পরাজয়ের অনেকগুলো কারণের মধ্যে বর্ষায় বৃষ্টির পানি ও নদনদী, খাল-বিল যে তাদের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠবে তাও আলোচনায় আসে। পত্রিকাটি লিখেছিল— '... আসন্ন বর্ষায় ওদের অবস্থা হবে আরো শোচনীয়। বাংলাদেশের নদীনালা খালে বিলে এখন পাঞ্জাবী সৈন্যের ডুবে মরা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে গেলেই তাদের মৃত্যু অনিবার্য।' হয়েছেও তাই। বর্ষায় বৃষ্টির পানি ও বাংলার নদনদী পাকিস্তানিদের পরাজয় মানতে বাধ্য করে। শুধু পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী নদীর তীরের স্থাপিত নৌ-কমান্ডো ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা যোদ্ধারাই নয়, লাখ লাখ সাধারণ প্রশিক্ষণপ্রান্ত মুক্তিবাহিনী তাদের নিজস্ব কৌশল ব্যবহার করে নদীতে সংগঠিত যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। ৯ মাস ব্যাপী যুদ্ধে বিশেষত বর্ষাকালে নদী ব্যবহারের সুবিধা ভোগ করে মুক্তিযোদ্ধারা। এসময় নদীগুলোও তাদের সহযোদ্ধা হয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে একসাথে লড়াই করে।
আগস্ট মাসে দেশের নদী বন্দরগুলোতে নৌ-কমান্ডোদের পরিচালিত অপরারেশন 'জ্যাকপট', সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানিদের রসদবাহী জাহাজে হামলা এবং ডিসেম্বরে অপারেশন 'হটপ্যান্টস' তাদের নৌশক্তি বিধ্বস্ত করে দেয়। দেশের জমিনে ছড়িয়ে থাকা অগণিত নদীতে সংগঠিত যুদ্ধ ছাড়াও সালদা নদীর যুদ্ধ, সুন্দরবনবেষ্টিত নদীগুলোতে সংগঠিত যুদ্ধগুলোই এর বড় প্রমাণ। যার ফলস্রুতিতে বাংলাদেশের বিজয় আসে নদী পথেও। ইতিহাসের বিচারে নদীই হয়ে ওঠে অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা। যে কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিরুপণে নদীকে প্রাধান্য দিতে হবে। নদীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই তা অন্তত্য জরুরি।
লেখক : গবেষক ও সম্পাদক— রিভার বাংলা এবং বই