ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস

অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে  বাংলাদেশের ইতিহাস

দ্বিতীয় ওয়ানডে জয়ে জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২১ বছর। এবার চল্লিশ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটল। গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে দাপুটে জয় তুলে নিয়ে ইতিহাস গড়ল মেহেদী হাসান মিরাজের দল। বৃষ্টি আইনে ৫ উইকেটের এই জয়ে শুধু ম্যাচই নয়, এক ম্যাচ হাতে রেখেই নিশ্চিত হয়ে গেল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজ জয়।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়াই করে এসেছে বাংলাদেশ। মাঝে এসেছে কিছু স্মরণীয় জয়, বড় বড় সাফল্যও। কিন্তু ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ কখনো পাওয়া হয়নি। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল মিরপুরে। বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজ হারানোর কীর্তি গড়ল টাইগাররা। ম্যাচের শুরু থেকেই দৃশ্যপট ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু শুরুতেই তাসকিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমানের আগুনঝরা বোলিংয়ে বিপর্যয়ে পড়ে সফরকারীরা। স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ হওয়ার আগেই হারিয়ে বসে তিন উইকেট। ওয়ানডে ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে ১০২৪তম ম্যাচ খেলতে নেমে প্রথমবারের মতো শূন্য রানে তিন উইকেট হারানোর লজ্জাজনক রেকর্ড গড়ল অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছিলেন তাসকিন আহমেদ। সিরিজে টানা দ্বিতীয়বারের মতো তিনি ফেরান ম্যাথু শর্টকে। এরপর মুস্তাফিজুর রহমানের এক ওভারে ফেরেন কুপার কনোলি ও ম্যাট রেনশ। মুহূর্তেই চাপে পড়ে যায় সফরকারীরা।

অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন অ্যালেক্স ক্যারি। তবে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকায় বড় জুটি গড়া সম্ভব হয়নি। ১৮তম ওভারে তানভীর ইসলামের বলে জশ ইংলিস আউট হলে ৮১ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে বসে অস্ট্রেলিয়া। সেখান থেকে সপ্তম উইকেটে জেভিয়ার বার্টলেট ও মার্নাস লাবুশেন ১০৩ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে দলকে লড়াইয়ে ফেরানোর চেষ্টা করেন। তবে শেষ দিকে আবারও আঘাত হানে বাংলাদেশ। ৪১তম ওভারে তাসকিনের জোড়া আঘাতে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস থমকে যায়। বৃষ্টি নামার আগে ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রান সংগ্রহ করে সফরকারীরা।

এরপর মিরপুরে নামে বৃষ্টি। দীর্ঘ বিরতির পর ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে ম্যাচের দৈর্ঘ্য কমিয়ে আনা হয় ৪১ ওভারে। বাংলাদেশের সামনে নতুন লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯২ রান। জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। প্রথম ওভারেই তানজিদ হাসান তামিম ফিরে যান বোলারের হাতে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে। তবে সেই ধাক্কা সামলে ইনিংস গড়ার দায়িত্ব নেন সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্ত। দুই ব্যাটারের ৮৬ রানের জুটি বাংলাদেশকে জয়ের পথে এগিয়ে দেয়। আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে এগোতে থাকা সৌম্য ৪২ রান করে আউট হন। এরপর শান্তও একই স্কোরে ফিরে গেলেও তার ইনিংস ছিল বিশেষ এক মাইলফলকের জন্য স্মরণীয়। এই ম্যাচে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দুই হাজার রান পূর্ণ করেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে এটি ছিল যৌথভাবে দ্বিতীয় দ্রুততম সময়ে দুই হাজার রানে পৌঁছানোর কীর্তি।

মধ্যভাগে কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ। লিটন দাস ভালো শুরু করেও থামেন ২১ রানে। ক্যামেরন গ্রিনের বাউন্সারে গ্লাভসে লেগে উইকেটরক্ষক জশ ইংলিসের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। মিরপুরে ওয়ানডেতে এখনও ফিফটির দেখা না পাওয়া লিটনের জন্য এটি ছিল আরেকটি হতাশার দিন। ছয়ে নেমে ইতিবাচক শুরু করেছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন। অ্যাডাম জাম্পাকে আক্রমণ করে কয়েকটি চমৎকার বাউন্ডারিও হাঁকান। কিন্তু বড় শট খেলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জাম্পার শিকার হন তিনি। ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ কিছুটা চাপে পড়ে যায়।

তবে সেখান থেকে আর কোনো বিপদ হতে দেননি অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাওহিদ হৃদয়। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন তারা। ৩৫ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। বল হাতে বাংলাদেশের জয়ের ভিত গড়ে দেন তাসকিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান। দুজনই নেন তিনটি করে উইকেট। তানভীর ইসলাম যোগ করেন দুটি উইকেট। তাদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই জয়ের মধ্য দিয়ে শুধু একটি সিরিজই নিশ্চিত করেনি বাংলাদেশ, বরং ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নতুন এক ইতিহাসও লিখেছে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী উন্মাদনা আর জাতীয় বাজেটের আলোচনার দিনে ক্রিকেটের মঞ্চে সবচেয়ে বড় খবর হয়ে উঠেছে টাইগারদের এই সাফল্য।

এখন বাংলাদেশের সামনে আরেকটি লক্ষ্য। ১৪ জুন সিরিজের শেষ ম্যাচে মাঠে নামবে মিরাজের দল। সেই ম্যাচে জয় পেলেই প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করার অনন্য কীর্তিও গড়ে ফেলবে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত