
কাতার বিশ্বকাপের আগে লিওনেল মেসিকে নিয়ে অনেক কথাই শোনা যেত। তারমধ্যে একটি ছিল, মেসি তার দেশের জন্য যতটুকু নিবেদিত তার চেয়ে অনেক বেশি ক্লাবের জন্য। ক্লাবের হয়ে নিজেকে উজাড় করে দিলেও দেশের জন্য গা বাঁচিয়ে খেলেন। এমন কথা প্রায়ই শোনা যেত। কিন্তু এসব বক্তাদের ধারণা পাল্টে যায় বিশ্বকাপের আগের আসরে। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা ঘুচিয়ে ফেলা এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে ঘিরে প্রশ্নও কম ছিল না! বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসির নামের পাশে নতুন করে আর কিছু যোগ করার আছে কি না, তা নিয়ে চার বছর ধরেই আলোচনা চলছিল। ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়সে এসে তিনি কতটা ক্ষুধার্ত, কতটা নিবেদিত, কিংবা আদৌ আগের মতো প্রভাব ফেলতে পারবেন কি না-এসব সংশয়কে এক ম্যাচেই উড়িয়ে দিলেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযানের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। মাঠজুড়ে রাজত্ব করেছেন লিওনেল মেসি, করেছেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক, আর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছেন।
কিন্তু ম্যাচ শেষে আলোচনার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল অন্য একটি দৃশ্য। প্রথম গোল করার পর মেসির চোখের জল।
ম্যাচের ১৭তম মিনিটে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া মেসির দুর্দান্ত শট জালে জড়িয়ে গেলে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলের আনন্দে ফেটে পড়ে গ্যালারি। কিন্তু উদ্?যাপনের সেই মুহূর্তেই দেখা যায় মেসির চোখে জল। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এটি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ যাত্রার আবেগ, কিংবা শেষ বিশ্বকাপের সম্ভাব্য উপলব্ধি থেকে জন্ম নেওয়া অনুভূতি।
কিন্তু ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক জানিয়ে দেন, কান্নার কারণ ছিল একান্তই ব্যক্তিগত। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে মেসি বলেন, ‘সত্যি বলতে, ফুটবলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কিছু ব্যক্তিগত কারণে গত কয়েকটা দিন আমার বেশ কঠিন কেটেছে। আমি দলের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। বরাবরের মতোই তারা সব সময় আমার পাশে ছিল। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য তারা আমাকে প্রচুর শক্তি জুগিয়েছে, ব্যস এটুকুই।’
আর্জেন্টিনার জন্য ম্যাচটি অবশ্য শুরু থেকেই ঘটনাবহুল ছিল। মাত্র পাঁচ মিনিটেই বল জালে পাঠিয়েছিলেন মেসি; কিন্তু অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আলজেরিয়ার একটি গোলও বাতিল হয়। এরপর ১৭ মিনিটে আর কোনো সুযোগ নষ্ট করেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। সেই গোলেই এগিয়ে যায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এবং ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
প্রতিপক্ষ সম্পর্কে মেসির মূল্যায়ন ছিল বেশ সতর্ক। তার মতে, আলজেরিয়া মোটেও সহজ প্রতিপক্ষ ছিল না। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম ম্যাচটি কঠিন হতে যাচ্ছে। ওদের দলে খুব ভালো, গতিময় এবং আক্রমণাত্মক কিছু খেলোয়াড় আছে। আমরা ওদের পায়ে বল দিলে ওরা সুযোগ তৈরি করতে পারত, তবে বল আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকার সময়ও আমরা পজিশন ধরে রেখে ভালো অবস্থায় ছিলাম। সৌভাগ্যবশত আমরা শুরুতেই লিড নিতে পেরেছিলাম এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেখেছি, যদিও বল পজিশন ধরে রাখার চেনা ছন্দে আমরা পুরো ম্যাচটি খেলিনি।’ মেসির মতে, প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হয়েছিল। তবে বিরতির পর ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। তিনি বলেন, ‘কিছুটা কঠিন ছিল (প্রথমার্ধ)। তবে দ্বিতীয়ার্ধ ছিল অন্যরকম- এটাই খুব স্বাভাবিক। যেকোনো টুর্নামেন্ট, বিশেষ করে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচগুলো সব সময়ই কঠিন হয়। গত বিশ্বকাপের (প্রথম ম্যাচের) অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল। আর এবারের বিশ্বকাপে এটা স্পষ্ট যে কেউ কাউকে সহজে ছেড়ে দেবে না।’
এই ম্যাচের মাধ্যমে বিশ্বকাপে টানা ষষ্ঠবারের মতো মাঠে নামলেন মেসি। দীর্ঘ বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে অসংখ্য স্মরণীয় গোল থাকলেও এবারই প্রথম বিশ্বমঞ্চে হ্যাটট্রিকের স্বাদ পেলেন তিনি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বকাপ শুরুর আগে চোট নিয়ে শঙ্কায় থাকলেও সময়মতো ফিট হয়ে ফিরে এসে তিনি নিজের সামর্থ্যের পূর্ণ প্রমাণ দিয়েছেন। ব্যক্তিগত কঠিন সময়ের কথা উল্লেখ করে ম্যাচ শেষে তিনি আরও বলেন, ‘দিনগুলো কঠিন ছিল এবং আবেগটা সে কারণেই ছিল।