
আগের আসরে কাছাকাছি গিয়েও ছোঁয়া হয়নি শিরোপা। রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। এবার সে আক্ষেপ ঘুচিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের নারী হকির এক গৌরবোজ্জ্বল ও সোনালী অধ্যায় রচিত হলো। ওমানের মাস্কাটে অনুষ্ঠিত উইমেন্স জুনিয়র এএইচএফ কাপ হকির মেগা ফাইনালে শক্তিশালী কাজাখস্তানকে ২-০ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়নের ট্রফি নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। দেশের হকি ইতিহাসে যেকোনো পর্যায়ে এটাই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের অনন্য রেকর্ড।
শিরোপাজয়ী মেয়রা বীরের বেশে ট্রফি হাতে দেশে ফিরেছেন। বিমানবন্দরে পা রাখতেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর দেশের জন্য হকি অঙ্গনে ইতিহাস গড়া এই স্বর্ণ কন্যাদের বরণ করে নিতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের কর্মকর্তারা। পুরো দল এবং কোচিং স্টাফের প্রত্যেক সদস্যের গলায় পরিয়ে দেওয়া হয় ফুলের মালা এবং হাতে তুলে দেওয়া হয় বর্ণিল তোড়া। ওমানের তপ্ত মাঠে যে লড়াইয়ের গল্প তাঁরা লিখে এসেছেন, দেশের মাটিতে এসে তার প্রতিদান পেলেন ভালোবাসার চাদরে আবৃত হয়ে। মেয়েদের মুখে জয়ের চওড়া হাসি। দেশের পতাকা আরও উঁচুতে তুলে ধরার আত্মবিশ্বাস। দলটিকে আরো বেশি উৎসাহ দিতে টি-স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহীর ও এইস ডেভেলপারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইশতিয়াক সাদেকের পক্ষ থেকে ২৩ সদস্যের দলের প্রত্যেককে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও একটি করে সুইট বক্স দেওয়া হয়। এমন বিশেষ পুরস্কার পেয়ে খেলোয়াড়রা আপ্লুত হন।
ওমানের মাস্কাটে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে বাংলাদেশ দলের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। পাঁচ দেশের এই টুর্নামেন্টে তারা কেবল চ্যাম্পিয়নই হয়নি, পুরো আসরে ছিল সম্পূর্ণ অপরাজিত। হংকংকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু। উজবেকিস্তানকে হারায় ১-০ ব্যবধানে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ৮-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে বাংলাদেশের মেয়েরা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে কাজাখস্তানকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে রিয়া, নিনি সেন রিমনরা। ফাইনালের মহারণে কাজাখস্তানকে ২-০ গোলে হারিয়ে ট্রফি নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ নারী হকি দলের এই অবিস্মরণীয় ট্রফি জয় প্রমাণ করে যে, সঠিক দিক নির্দেশনা ও সুযোগ পেলে মেয়েরাও বিশ্বমঞ্চ কাঁপাতে পারে। বিমানবন্দরে তাদের রাজকীয় বরণ এবং টি-স্পোর্টসের সিইও ইশতিয়াক সাদেকের পক্ষ থেকে পাওয়া এই অর্থ পুরস্কার তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদারই এক বহিঃপ্রকাশ। এই চ্যাম্পিয়ন ট্রফি কেবল একটি জয় নয়, এটি বাংলাদেশের হকির এক নতুন দিনের সূচনা।
গল্পটা এখানেই শেষ নয়, এবার শুরু আসল মিশন। এএইচএফ কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তারা কোয়ালিফাই করেছে এশিয়া কাপের মূল পর্বে। এশিয়া কাপের এই মঞ্চে তাদের লড়তে হবে এশিয়ার সবচেয়ে পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে। ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো অভিজ্ঞ দলগুলোর সাথে। আর এশিয়া কাপের এ মঞ্চে যদি মেয়েরা নিজেদের সেরাটা দিয়ে ভালো করতে পারে, তবেই খুলে যাবে স্বপ্নের সেই মহাদুয়ার। সরাসরি কোয়ালিফাই করবে বিশ্বকাপে! সবার লক্ষ্য এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলা।
পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে খেলোয়াড়দের অসাধারণ নৈপুণ্য, শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য লড়াকু মানসিকতা দেশের জন্য বয়ে এনেছে অনন্য গৌরব। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান ও বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সভাপতি এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, বিবিপি, ওএসপি, জিইউপি, এনএসডব্লিউসি, পিএসসি এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ওমানে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ নারী জুনিয়র হকি দলের সাফল্যে উৎসাহ ও অভিনন্দন জানান। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে বিমান বাহিনী প্রধান সর্বদাই দেশের হকির সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির বিষয়ে নিবিড়ভাবে খোঁজখবর রেখে আসছেন এবং খেলোয়াড়দের উন্নয়নে ধারাবাহিক দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ প্রদান করে চলেছেন। তার উপস্থিতি খেলোয়াড়দের জন্য ছিল অনুপ্রেরণার উৎস এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি সশস্ত্র বাহিনীর আন্তরিক সমর্থনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ওমানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ নারী জুনিয়র হকি দলকে প্রাণবন্ত সমর্থন ও উৎসাহ প্রদান করেন। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সভাপতি তাদের এই আন্তরিক সমর্থন ও দেশপ্রেমের জন্য আনতরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।