
ডারউইনের টেস্ট সিরিজের উত্তাপ ঠিকমতো শুরু হয়নি! অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই টেস্টের লড়াইয়ের আগে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার মঞ্চ ছিল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ। কিন্তু সেই প্রস্তুতিই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠল বড় এক সতর্কবার্তা। মেহেদী হাসান মিরাজের দুর্দান্ত অপরাজিত সেঞ্চুরিতে প্রথম ইনিংসে আশার আলো জ্বালানোর পর শেষ ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে গিয়ে ইনিংস ও ৩৮ রানে হেরে গেল নাজমুল হোসেন শান্তর দল!
বাংলাদেশের হারের ব্যবধানের চেয়েও বিস্ময়কর তাদের পতনের ধরন। প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রান করেছিল তারা। জবাবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ ৩৫৫ রান তুলে নেয়। ৯২ রানের লিড পাওয়ার পর স্বাগতিকদের সামনে ছিল ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ। বাংলাদেশের সামনে ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর বদলে দ্বিতীয় ইনিংসেই যেন ধসে পড়ল পুরো ব্যাটিং অর্ডার!
আজ মাত্র ২২ ওভারের মধ্যে ৫৪ রানে শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের ইনিংস। একটি দলের ব্যাটিং লাইনআপ যে এত অল্প সময়ে এমনভাবে ভেঙে পড়তে পারে, ডারউইনের প্রস্তুতি ম্যাচ তারই নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকল। আর এই ধসের মূল কারিগর ২২ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার ক্যাম্পবেল থম্পসন!
থম্পসনের সামনে বাংলাদেশের আট ব্যাটারই হার মেনেছেন। মাত্র ১১ ওভার বল করে ২৫ রান খরচায় ৮ উইকেট-প্রস্তুতি ম্যাচের হিসাব হলেও সংখ্যাটি বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর। আগের দিন দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই সাদমান ইসলামকে ৬ রানে ফিরিয়ে যে ধসের সূচনা করেছিলেন থম্পসন, সেটিই পরে রীতিমতো মহাবিপর্যয়ে রূপ নেয়। মুমিনুল হকও ৬ রান করে তার বলে বোল্ড হন।
আজ ব্যাটিংয়ে নেমে বিপর্যয়কে আর ঠেকানো যায়নি। নাজমুল হোসেন শান্ত কোনো রান না করেই এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন। সৌম্য সরকার করেন ৫, মুশফিকুর রহিম ২। দুজনকেই ফিরিয়েছেন সেই থম্পসন। মাত্র ৩৬ রানেই বাংলাদেশের চার উইকেট পড়ে যায়। তখনও ম্যাচ বাঁচানোর একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সেটিও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
তানজিদ হাসান তামিমের ২২ রান সাময়িকভাবে প্রতিরোধের আবহ তৈরি করেছিল। কিন্তু অমিত হাসান ৪ রান করে কোরি রকিচোলির বলে ক্যাচ দেওয়ার পর মেহেদী হাসান মিরাজও দ্রুত ফিরে গেলে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৪৫ রানে ৬ উইকেট। প্রথম ইনিংসে যার ব্যাটে বাংলাদেশ পেয়েছিল লড়াইয়ের রসদ, দ্বিতীয় ইনিংসে সেই মিরাজও দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেননি।
এরপর আর কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। হাসান মাহমুদ ২ রানে অপরাজিত থাকলেও অপর প্রান্তে থাকার মতো কাউকে আর পাওয়া যায়নি। তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনকে ফিরিয়ে থম্পসন নিজের আট উইকেট পূর্ণ করেন। রকিচোলি নেন দুটি উইকেট। ২১.৬ ওভারেই থেমে যায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য লুকিয়ে আছে মিরাজের ব্যাট ও বাংলাদেশের বাকি ব্যাটারদের পারফরম্যান্সে। প্রথম ইনিংসে মিরাজের অপরাজিত সেঞ্চুরি বাংলাদেশকে লড়াইয়ের ভিত দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যাটিংয়ের দিক থেকে অন্তত ইতিবাচক কিছু নিয়ে মূল সিরিজে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে সেই আশার জায়গাতেই নেমে এসেছে ঘন অন্ধকার।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মূল পরীক্ষার আগে তাই ডারউইন বাংলাদেশকে কেবল একটি হারই দিল না, দিয়ে গেল বেশ কিছু কঠিন প্রশ্নও। অস্ট্রেলিয়ার মূল টেস্ট দলের বিপক্ষে নতুন বলে এমন ব্যাটিং ধস হলে পরিস্থিতি যে আরও কঠিন হতে পারে, তা বুঝতে খুব বেশি ক্রিকেটীয় হিসাবের প্রয়োজন নেই। আগামী ১৩ আগস্ট ডারউইনেই শুরু হবে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার প্রথম টেস্ট। এরপর ২২ আগস্ট ম্যাকাইয়ে মাঠে গড়াবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট।
তার আগে প্রস্তুতি ম্যাচের এই হার বাংলাদেশের জন্য ফলাফলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে সতর্কসংকেত হিসেবে। কারণ মিরাজের সেঞ্চুরি হয়তো আশার গল্প লিখেছিল, কিন্তু ৫৪ রানের দ্বিতীয় ইনিংস সেই গল্পের শেষ পাতায় লিখে দিয়েছে নির্মম এক বাস্তবতাণ্ডঅস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের ব্যাটিংকে আরও অনেক শক্ত হতে হবে!