
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানোর পর বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে-এই জয় কি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের পথও খুলে দিল? অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার টেস্ট জয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে প্রত্যাশা। তবে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট কিংবা ক্রিকেট বোর্ড এখনই ফাইনালের হিসাব-নিকাশে ডুব দিতে চাইছে না। বরং সামনে থাকা প্রতিটি টেস্টকে আলাদা করে দেখেই এগোতে চায় তারা।
২০২৫-২৭ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে ডারউইন টেস্টের পরও বাংলাদেশ রয়েছে চতুর্থ স্থানে। ৬৬.৬৭ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে শান্তরা এখনো অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের পেছনে। অস্ট্রেলিয়া ৭৭.৭৮ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে শীর্ষে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের হার যথাক্রমে ৭৫ ও ৭২.২২ শতাংশ। ভারত ও শ্রীলঙ্কাও পুরোপুরি হিসাবের বাইরে নয়; তাদের সফলতার হার যথাক্রমে ৪৮.১৫ ও ৪১.৬৭ শতাংশ।
অর্থাৎ ডারউইনের জয় বাংলাদেশকে সম্ভাবনার দরজায় পৌঁছে দিয়েছে, কিন্তু ফাইনালের টিকিট এনে দেয়নি। বরং সামনে থাকা সাতটি টেস্টই এখন সমীকরণ বদলে দেওয়ার সুযোগ। ম্যাকেতে ২২ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারলে বাংলাদেশের সফলতার হার বেড়ে দাঁড়াবে ৭২.২২ শতাংশে। এরপর ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুটি করে টেস্ট এবং বিদেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ফাইনালের সমীকরণকে বড় করে না দেখে ম্যাচ জয়ের ধারাবাহিকতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন বিসিবির ক্রিকেট অপারেশনসের ইনচার্জ শাহরিয়ার নাফীস, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ একটা জটিল সমীকরণ। দুই বছরের টুর্নামেন্টে কেবল দুইটা দল ফাইনাল খেলে। বাস্তবিক ও সমীকরণগত দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক ওপরে। এখন যে সমীকরণটা আছে, যেকোনো দলের জন্য অনেকগুলো দলেরই দারুণ সম্ভাবনা আছে। আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট বা অধিনায়ক এটা খুব স্পষ্টভাবে বলেছে যে আমরা ম্যাচ বাই ম্যাচ জিততে চাই।
শান্তর কথাতেও ছিল একই ধরনের সতর্কতা। ডারউইনে জয়ের পর বাংলাদেশ অধিনায়ক জানিয়েছিলেন, বহু দূরের হিসাব না করে ধাপে ধাপে এগোতে চান তারা। নাফীসও মনে করছেন, এ মুহূর্তে সেটিই সবচেয়ে কার্যকর পথ, এরপরে আরও আমাদের সাতটা টেস্ট ম্যাচ বাকি আছে। এখন এটা নিয়ে তাই চিন্তা না করে, আমাদের সামনে যে বর্তমানে যে টেস্ট ম্যাচটা আছে, ম্যাচ ধরে যদি যদি এগোনো যায়, সমীকরণের জায়গা, গাণিতিক সমীকরণ জানি যখন মেলার, সেটা তখন মিলেই যাবে।
ডারউইনের জয় অবশ্য শুধু পয়েন্টের হিসাবই বদলায়নি, বদলেছে দলের আত্মবিশ্বাসও। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের পর মাঠে শান্ত, মুশফিক, মিরাজ, শরীফুল, তাইজুল ও তাসকিনদের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে ড্রেসিংরুমেও। সেখানে প্রধান কোচ ফিল সিমন্স, স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ ও ম্যানেজার নাফিস ইকবালকে খেলোয়াড়দের সঙ্গে ‘আমরা করব জয়’ গাইতেও দেখা গেছে। বিসিবিতেও কেক কেটে উদযাপন করা হয়েছে এই জয়।
তবে উদযাপন আর আত্মতুষ্টির মধ্যে পার্থক্যটা পরিষ্কার রাখতে চাইছে বাংলাদেশ। নাফীসের দাবি, দলের আচরণে এখনো আত্মতুষ্টির কোনো ছাপ নেই, তাদের কথা শুনে মনে হয়েছে তারা খুব বেশি আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে না। তারা পরবর্তী ম্যাচের জন্য অবশ্যই উপভোগ করেছে। কিন্তু পরবর্তী ম্যাচ নিয়ে অনেক বেশি ভাবছে। তাদের কণ্ঠে অনেক খুশি প্রকাশ পেয়েছে। তবে থাকে না যে একটা ম্যাচ জিতলাম সবকিছু শেষ হয়ে গেল-এরকম অবস্থায় নেই।
অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর বিশেষ কোনো উদযাপনের পরিকল্পনা আছে কি না, সে প্রশ্নেও নাফীস বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপরই বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দেখুন, ক্রিকেট বোর্ডের যে পরিকল্পনা, সেক্ষেত্রে বোর্ড তো আছে। সম্মানিত বোর্ড পরিচালক আছেন। তারা সিদ্ধান্ত নেবেন বা তারা চিন্তাভাবনা করবেন। তবে তাদের সঙ্গে যতটুকু কথা হয়েছে, তারা অবশ্যই উদযাপন করেছে।’ বাংলাদেশের সামনে তাই এখন অঙ্কের চেয়ে বড় পরীক্ষা ধারাবাহিকতার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে আরেকটি জয় এলে ফাইনালের স্বপ্ন আরও বাস্তব হয়ে উঠবে। এরপরের ছয় টেস্টে সেই সম্ভাবনাকে কতটা শক্ত অবস্থানে নেওয়া যায়, সেটিই হবে আসল চ্যালেঞ্জ। নাফীস অবশ্য ভবিষ্যতের সেই দীর্ঘ হিসাব এখনই করতে রাজি নন। তাঁর দর্শনটা বরং অনেক সরল-আজকের ম্যাচটা ভালো খেলতে পারলে আগামী দিনের পথও সহজ হবে, এখন এটা আপনি এক বছর বা দেড় বছর পরের একটা টুর্নামেন্টে কখন কী হবে, এটা বলে তো আর আপনি এখনই এটা নিয়ে কাজ করতে পারবেন না। কারণ, আমরা বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে বেশি এগিয়ে চিন্তা করতে চাই না। আমার মতে বর্তমান নিয়ে যদি ফোকাস করি, ইনশা আল্লাহ ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। ডারউইনের জয় বাংলাদেশের জন্য ইতিহাস, কিন্তু টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গল্পে এটি কেবল একটি অধ্যায়। সামনে আরও সাতটি টেস্ট, প্রতিটিই নতুন সমীকরণ তৈরির সুযোগ। তাই ফাইনালের অঙ্ক এখন কাগজে থাকলেও বাংলাদেশের চোখ আপাতত পরের ম্যাচেই। আর সেই ম্যাচগুলোই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে ডারউইনের ঐতিহাসিক জয় একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে, নাকি হয়ে উঠবে আরও বড় কোনো সাফল্যের শুরু। অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ পেয়েছে ১২ পয়েন্ট। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, পয়েন্ট শতাংশে এক লাফে বড় উন্নতি হয়েছে। ডারউইন টেস্টের আগে বাংলাদেশের পয়েন্ট শতাংশ ছিল ৫৮.৩৩।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর সেটি বেড়ে হয়েছে ৬৬.৬৭। পাঁচ টেস্টে তিন জয় ও এক ড্র নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চার নম্বরে।
পয়েন্ট তালিকার চিত্রটি তাই বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। ৭৭.৭৮ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে অস্ট্রেলিয়া এখনো শীর্ষে। চার টেস্টে ৭৫ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় দক্ষিণ আফ্রিকা। ছয় টেস্টে ৭২.২২ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় নিউজিল্যান্ড। আর তাদের ঠিক পরেই বাংলাদেশ-৬৬.৬৭ শতাংশ। লর্ডসের এখনো অনেক দূর। সামনে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় টেস্ট, এরপর একের পর এক কঠিন সিরিজ। পয়েন্ট তালিকায় বাংলাদেশকে টপকে যাওয়ার মতো সুযোগ ভারতেরও আছে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের অবস্থান আরও শক্তিশালী। অস্ট্রেলিয়াও একটি হারেই শীর্ষস্থান হারায়নি।