ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দুঃস্বপ্ন ভুলে সাফে নতুন শুরুর অপেক্ষায় বাংলাদেশ

দুঃস্বপ্ন ভুলে সাফে নতুন শুরুর অপেক্ষায় বাংলাদেশ

একজনের সামনে পুরোনো ক্ষত সারানোর চ্যালেঞ্জ, অন্যজনের সামনে স্বপ্নের দরজা খুলে যাওয়ার হাতছানি। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ৯ গোল হজমের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে বাংলাদেশকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে চান অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তপু বর্মন। আর ইংল্যান্ডের লেস্টারে বসে যার খেলা দেখে বড় হয়েছেন, সেই হামজা চৌধুরীর সঙ্গে একই ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করার অপেক্ষায় ১৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাহি খান। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতির প্রথম দিনেই তাই বাংলাদেশ শিবিরে দুই ভিন্ন গল্প। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ সামনে রেখে গতকাল সোমবার জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ দলের আনুষ্ঠানিক অনুশীলন।

প্রথম দিনের অনুশীলন শেষে আলোচনায় এসেছে আসিয়ান কাপে দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্স, রক্ষণভাগের দুর্বলতা, হামজার অনুপস্থিতি এবং নতুন মুখ মাহির সম্ভাবনা। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ৯ গোল হজমের ম্যাচটি তপুর জন্যও ছিল যন্ত্রণার। চোটের কারণে মাঠে থাকতে পারেননি তিনি। বাইরে থেকে সতীর্থদের এমন বিপর্যয় দেখতে হয়েছে অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডারকে। জাতীয় দলে ফিরে এবার তার লক্ষ্য, রক্ষণভাগকে নতুন করে সংগঠিত করা। তবে গোল হজমের দায় শুধু ডিফেন্ডার কিংবা গোলরক্ষকদের ওপর চাপাতে রাজি নন তিনি। আসিয়ান কাপে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তপু বলেন, প্রথম ম্যাচে তিনটি গোল খাওয়ার পর শেষ ম্যাচে নয় গোল হজম করাটা ভীষণ হতাশাজনক। এত দিনের ক্যারিয়ারে জাতীয় দলের হয়ে আমরা কবে এক ম্যাচে নয় গোল হজম করেছি, তা আমার জানা নেই।

তপুর মতে, আধুনিক ফুটবলে রক্ষণ সামলানোর দায়িত্ব দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের। শুধু শেষ মুহূর্তে গোল ঠেকানোর চেষ্টা নয়, প্রতিপক্ষের আক্রমণ গড়ে ওঠার শুরু থেকেই সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। এই দলগত রক্ষণই হতে পারে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান অস্ত্র। তপু বলেন, দল যখন গোল হজম করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডারদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়; সবাই তাদেরই দোষ দেখে। তবে আধুনিক বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো 'টিম ডিফেন্ডিং' বা দলগত রক্ষণ। আমরা যদি দলগতভাবে সেরাটা দিয়ে পারফর্ম করতে পারি, তবে নিশ্চিতভাবেই এত গোল হজম করতে হবে না। অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডারের নিজের ওপরও দায়িত্ব কম নয়। রক্ষণভাগের নেতৃত্ব দেওয়া, পেছনের সারিতে সমন্বয় তৈরি এবং সতীর্থদের ভুল শুধরে দেওয়ার কাজ করতে চান তিনি। বিশেষ করে আসিয়ান কাপে অভিষেক হওয়া তরুণ রিদওয়ানের সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়ানো তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ জন্য সময়টাকেও যথেষ্ট মনে করছেন তপু। ৫ নভেম্বর ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের আগে হাতে আছে নয় দিন। আগের ক্যাম্পে রিদওয়ানের সঙ্গে অনুশীলনের অভিজ্ঞতা থাকায় রক্ষণভাগে ভালো সমন্বয় গড়ে ওঠার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। তবে সাফের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশকে খেলতে হবে হামজা চৌধুরী ও ফারহান আলীকে ছাড়াই।

দুই গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারের অনুপস্থিতি যে দলের জন্য বড় ধাক্কা, সেটি স্বীকার করেছেন তপু। কিন্তু দলগত পারফরম্যান্স দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণের বিশ্বাসও তার আছে। তপু আরও বলেন, হামজা আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়। প্রথম ম্যাচে ওর অনুপস্থিতি আমরা অবশ্যই অনুভব করব। তবে আমরা যদি দলগতভাবে খেলতে পারি, তবে সেই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে এবং শুভসূচনা করতে প্রথম ম্যাচ জেতাটা ভীষণ জরুরি। ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ভালো শুরু পেলে পরে যখন হামজা দলের সঙ্গে যোগ দেবে, তখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি আমাদের জন্য অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। তপুর কথায় যখন রক্ষণ সামলানোর পরিকল্পনা, তখন জাতীয় দলের ক্যাম্পে নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে হাজির মাহি। বয়স মাত্র ১৮। অনূর্ধ্ব-২০ দলের গণ্ডি পেরিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের প্রাথমিক স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন ইংল্যান্ডপ্রবাসী এই ফরোয়ার্ড। তাঁর কাছে এই ডাক শুধু জাতীয় দলের ক্যাম্পে জায়গা পাওয়া নয়, ছোটবেলার এক স্বপ্নের আরও কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ। মাহির বেড়ে ওঠা লেস্টারে, হামজা চৌধুরীর শহরের কাছেই। ছোটবেলা থেকে হামজার খেলা দেখেছেন গ্যালারিতে বসে। এবার সেই ফুটবলারের সঙ্গেই জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদিও সাফের মাঝপথে দলের সঙ্গে যোগ দেবেন হামজা, তবু তাঁকে নিয়ে মাহির রোমাঞ্চের কমতি নেই।

নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মাহি বলেন, খুবই রোমাঞ্চিত আমি। ছোট থেকেই লেস্টারে হামজার খেলা দেখছি। কারণ, লেস্টার আমাদের বাসার কাছেই। সেই ছোটবেলা থেকে যাকে দেখে আসছি, এখন সুযোগ এসেছে তার সঙ্গে খেলার। তার মতো অভিজ্ঞ ও শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলারের সঙ্গে খেলতে পারা দারুণ সম্মানের। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারব। ১৮ বছর বয়সেই জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পাওয়া মাহির পরিবারের জন্যও বিশেষ আনন্দের। তবে এই অর্জনকে শেষ নয়, বরং নতুন যাত্রার শুরু হিসেবেই দেখছেন তিনি। নিজের পাশাপাশি পুরো দলের জন্যও বড় স্বপ্ন দেখছেন তরুণ এই ফুটবলার। মাহি বলেন, আমি ভীষণ গর্বিত। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছি। পরিবারের সবাইও খুব খুশি। এখন আমাদের কঠোর পরিশ্রম করার সময় এবং ইনশা আল্লাহ আমরা সাফ জিতব। বাংলাদেশ ফুটবলে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হলো কার্যকর প্রথাগত স্ট্রাইকার বা 'নাম্বার নাইন'-এর অভাব। সেই জায়গায় মাহিকে নিয়ে আশাবাদী কোচ টমাস ডুলি। বয়স কম হলেও আক্রমণভাগে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতে চান কোচ। তবে প্রত্যাশার চাপ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন মাহি। তার কাছে মূল বিষয় হলো- কোচের পরিকল্পনা বুঝে মাঠে নিজের কাজটা ঠিকভাবে করা।

তরুণ এই স্ট্রাইকার বলেন, 'কিছুটা চাপ তো থাকবেই। তবে মাঠে নেমে নিজের সেরাটা দেওয়াই আমার কাজ। কোচ আমার কাছে কী চান, তা আমি জানি। মাঠে কোচের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে ইনশা আল্লাহ গোল করতে পারব। এর আগে উজবেকিস্তানে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন মাহি। প্রত্যাশিত ফল না এলেও সেই প্রতিযোগিতা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে এবার কাজে লাগাতে চান তিনি। বয়সভিত্তিক দলের ভুলত্রুটি শুধরে জাতীয় দলের বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করাই এখন তার লক্ষ্য। ৫ নভেম্বর য়াকায় শুরু সাফ ফুটবল। তার আগে নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছেন তিনি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত