প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
চোরেরা সুলতান মাহমুদের রাজপ্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেল। আলো আঁধারিতে একটি মাটির ঢিবি দেখে ভাবল, হয়তো এখানে গুপ্তধন আছে। গন্ধবিশারদ চোর তার নাক লাগিয়ে শুঁকে দেখল। বলল, না এখানে কোনো ধনরত্ন নেই। এক বৃদ্ধা বিধবার পতিত ভিটের ঢিবি এটি। চোরেরা তাদের অভিযান এগিয়ে নিতে অদম্য। সুলতানের রাজপ্রাসাদে গিয়ে দেখে বিরাট প্রাচীরের বেষ্টনী। তখন ফাঁদ বিশারদ চোর তার দক্ষতার স্বাক্ষর রাখে। পর্বত সমান উচ্চতায় ফাঁদ ছুঁড়ে সবাই দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। গন্ধবিশারদ চোর আরেক স্থানে নাক লাগিয়ে বলল, হ্যাঁ, এই তো আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। এখানেই সুলতানের ধনরত্ন গচ্ছিত।
সিঁধ কাটার দক্ষ চোর সুড়ঙ্গ তৈরি করে ফেলল গুপ্তধনের খাজানা বরাবর। শাহী প্রাসাদের মালামাল চুরির সে কি উৎসব। স্বর্ণ, রত্ন, রৌপ্য, তৈজসপত্র- আরও দামি জামা কাপড় সরিয়ে নেওয়ার সতর্ক তৎপরতা চলল রাতভর। পুরো ঘটনায় সুলতান তাদের সঙ্গে পেছনে আছেন। দেখলেন, কার পরিচয় কি, কোথায় আড্ডা আখড়া, চুরির মাল জমাচ্ছে কোথায়। এক ফাঁকে সুলতান কেটে পড়লেন চোরদের মাঝ থেকে।
রাজপ্রাসাদে এসে সুলতান বিলম্ব করলেন না একটুও। দক্ষ ঝানু নিরাপত্তা রক্ষীদের পাঠিয়ে দিলেন চোরদের পাকড়াও করতে। চোরেরা তখনও আখড়ায় বিশ্রামে যায়নি; রাজকীয় পাইক পেয়াদা গিয়ে হাতেনাতে পাকড়াও করে নিয়ে আসে কয়েদ করে চুরির অপরাধে। চোরদের দেহমনে তখন ভয়ে আতঙ্কে তরতরে কম্পন। কারণ, তারা জানে, অপরাধীর প্রতি কত কঠোর সুলতানের শাসন। সর্বোচ্চ শাস্তি করুণ পরিণতি অপেক্ষমাণ তাদের কপালে।
হাতকড়া পরা চোরেরা সুলতানের দরবারে। স্বয়ং সুলতান এখন বিচারের এজলাসে। এই সেই সুলতান, যিনি গেল রাতে আকাশের চাঁদনির মতো তাদের মাঝে ছিলেন দেদিপ্যমান। এই জগতের আসল সুলতান তো সেই মহামহিম, দুনিয়ার রাতে তিনি আছেন তোমাদের সবার সঙ্গে। নৈতিক চরিত্র আর শরীয়তের প্রাচীর টপকে যারা দুনিয়ায় লুটপাট চালায়, তিনি তাদের সঙ্গেও থাকেন, তার নজরদারি এড়ানোর কারও সাধ্য নাই। সময় মতো তাদের কাছ থেকে পৃথক হয়ে যান। কাল ভোরে যখন তাদের পাকড়াও করে হাজির করা হবে পরকালের আদালতে তখন দেখবে রাতের সেই চাঁদনি আকাশের সূর্যরূপে তাদের সামনে দেদিপ্যমান। তিনিই হবেন বিচারদিনের একচ্ছত্র মালিক।
যে চোরের কৃতিত্ব ছিল রাতে যাকে দেখে দিনের বেলা হুবহু তাকে চিনে ফেলে সে দেখল আজ রাজ সিংহাসনে সমাসীন স্বয়ং সুলতান, তিনিই গেল রাতে তাদের মাঝে ছিলেন বিরাজমান।
শাহ রা বর তখত দিদ ও গোফত ইন
বূদ বা মা দুশ শাবগার্দ ও করিন
বাদশাহকে সিংহাসনে আসীন দেখে বলল চোর
ইনিই আমাদের সঙ্গে টহল দিয়েছেন গেল রাতভর।
অংকে চান্দিন খাসিয়ত দর রিশে উস্ত
ইন গেরেফতে মা হাম আজ তফতিশে উস্ত
ইনিই যার দাড়িতে লুকানো হাজারো কারিশমা
আমাদেরও পাকড়াও করেছে তার সন্ধানী চশমা।
যে চোর কুকুরের আওয়াজের মর্ম বুঝত সে বলেছিল, কুকুর বলছে, বাদশাহ স্বয়ং আমাদের সাথে আছেন।
গোফত ওয়াহুয়া মাআকুম ইন শাহ বুদ
ফে লে মা মি দিদ ও সেরমান মি শানুদ
বলল, তোমাদের সাথে যে আছেন তিনি তো বাদশাহ
আমাদের কাজ দেখছেন, শুনছেন অকথিত রহস্য যা যা।
আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের সাথেই আছেন যেখানেই তোমরা থাকো না কেন।, আর তোমরা যাকিছু কর, আল্লাহ সবকিছুর দ্রষ্টা।’ (সুরা হাদিদ : ৪)।
তত্ত্বজ্ঞানী চোর বলল, রাতেই আমার চোখ ধন্য ছিল বাদশাহর পরিচয় পেয়ে। সারারাত তার চেহারার প্রেমে মগ্ন ছিলাম আমি একাগ্র হৃদয়ে। তত্ত্বজ্ঞানী আরেফ বিল্লাহ কেয়ামতের দিন বলবেন, দুনিয়ার জীবন যে রজনীর মাঝে কাটিয়েছি, তাতে আমি আল্লাহর পরিচয় পেয়ে মজেছিলাম তার প্রেমে। বুঝেছিলাম তিনি সারাক্ষণ আমাদের সঙ্গেই আছেন। তাই তার চেহারার রূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কেটেছে আমার সমগ্র জীবন। আজ সেই বাদশাহর কাছে জানাব আমার লোকদের গোনাহমাফির আবেদন। আমার বিশ্বাস তিনি এই অভাগার আকুতি ফিরিয়ে দেবেন না। যে চোখ আল্লাহর প্রেমে আত্মহারা থাকে, তার আবদার আলাদা আল্লাহর সমীপে।
জান মুহাম্মদ শাফেয়ে হার দাগ বুদ
কে যে জুজ হক চশমে উ মা জাগ বুদ
মুহাম্মদ (সা.) যে গোনাহগার দাগির শাফায়াতকারী
কারণ তার দুনয়ন বিচ্যুৎ হয়নি আল্লাহর দর্শন ছাড়ি।
কেয়ামতের দিন নবীজি অগণিত গোনাহগারের শাফায়াত করবেন। হজরতের এই শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে মওলানা বলেন, আল্লাহর দর্শন লাভে নবীজির দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। (সুরা নাজম : ১৭)। এই দুনিয়া, যা রাতের আঁধারের মতো, এখানে হাকিকতের সূর্য ঢাকা আছে মানুষের দৃষ্টি থেকে। কিন্তু নবীজির দৃষ্টি সদা প্রখর। পূর্ণিমা শশীর মতো মহামহিমের রূপমাধুরি দর্শনে নবীজি ছিলেন বিভোর। এই প্রখর দৃষ্টিশক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে মওলানা আরও বলেন,
আজ আলম নাশরাহ দো চশমশ সুর্মা য়াফত
ডদদ অনচে জিবরাইল অন বর নাতাফত
আলম নাশরাহ’র সুরমা মাখা নবীজির দুই চোখে
তিনি দেখেছেন জিবরাইলের সাধ্য ছিল না যা দেখবে।
তার চোখে ছিল আলম নাশরাহ’র সুরমা মাখা। ফলে তিনি এমন কিছু দেখেছেন যা দেখার শক্তি ছিল না স্বয়ং অহিবাহক ফেরেশতা জিবরাইলের। এ বয়েতে ইঙ্গিত রয়েছে নবীজির আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচায়ক সুরা আলম নাশরাহ লাকার দিকে। ‘আলম নাশরাহ লাকা’ মানে আমি কি আপনার অন্তরকে প্রসারিত করে দিইনি? যে এতিমের চোখে আল্লাহ নিজে সুরমা মেখে দেন সে তো হাকিকতের দুনিয়া অনায়াসে দেখবে, তাতে আপত্তি কিসে। নবীজির এই দৃষ্টিশক্তির কারণে কোরআনে তার অন্যতম উপাধি শাহেদ, সাক্ষী। সাক্ষী হওয়ার জন্য দুটি উপাদান অনিবার্য প্রয়োজন। একটি প্রখর দৃষ্টিশক্তি, দ্বিতীয়টি নিজের দেখা বিষয় ব্যক্ত করার বাচনিক শক্তি। দুনিয়ার আদালতে বাদী বিবাদী হাজারো যুক্তিতর্ক করে; কিন্তু হাকিমের মনযোগ থাকে সাক্ষীর দিকে। আদালতে হাকিম সাক্ষীকে দেখেন দুটি চোখ রূপে। সাক্ষীর এই গুরুত্বের কারণ কী? ঘটনা তো বাদীও জানে, বিবাদীরও জানা থাকে। কিন্তু তাদের এই জানা স্বার্থদুষ্ট কলুষিত পক্ষপাতিত্বে, মতলববাজিতে। কিন্তু শাহেদ সাক্ষীর দৃষ্টি থাকে স্বার্থমুক্ত, মতলববর্জিত পক্ষপাতহীন। তার দুচোখ আচ্ছন্ন করতে পারে না মতলববাজি স্বার্থচিন্তার পর্দা এসে।
হক হামি খাহাদ কে তো জাহেদ শাওয়ি
তা গরজ বুগজারি ও শাহেদ শাওয়ি
আল্লাহ তো চান তুমিও হও স্বার্থমুক্ত পবিত্রমন
স্বার্থ, মতলববাজি ছেড়ে কর সাক্ষীর যোগ্যতা অর্জন।
আল্লাহর ইচ্ছা হল, তুমিও নিজেকে নিঃস্বার্থ, আল্লাহর জন্য নিবেদিত, কুধারণা কুভাবনা-মুক্ত পবিত্রমনের অধিকারী কর। কারণ, স্বার্থচিন্তা, নফসের কামনা বাসনা চোখের সামনে পর্দা টেনে দেয়। এই পর্দায় ন্যায় ও সত্যকে দেখার মনের সৌন্দর্য লুকিয়ে যায়। ভালোমন্দ ফারাক করতে পারে না তখন। এর কারণ, ‘কোনো কিছুই প্রতি অন্ধ ভালোবাসা স্বার্থচিন্তা মানুষকে অন্ধ বানায়।’ তবে যার অন্তরে আল্লাহর নুরের তাজাল্লি পতিত হয় তার হৃদয় আলোয় উদ্ভাসিত। তার মনের আকাশে গ্রহতারার আলোর প্রয়োজন হয় না। যেমন দিনের বেলা সূর্য উদিত হলে আকাশের তারারা লুকিয়ে যায়।
ইনসানে কামিলের মর্যাদায় এই মর্তবার অধিকারী ছিলেন প্রিয় নবীজি। তাই তিনি মোমিন ও কাফেরের দিলের গতিবিধি ভালোভাবে জানতেন। মানব রুহের এই গতিবিধি চেনা ইনসানে কামিল ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহর দুনিয়ায় মানব রুহের চেয়ে রহস্যময় আর কিছু নেই। দেখ দুনিয়ায় ভালো মন্দ সমস্ত কিছুর পরিচয় ব্যক্ত করেছেন আল্লাহতায়ালা। অথচ রুহের বেলায় বলেছেন, ‘আপনার কাছে তারা রুহের স্বরূপ সম্পর্কে জানতে চায়। আপনি বলুন, রুহ হলো আমার প্রতিপালকের আদেশ বিশেষ। এবং তোমাদের অতি সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা ইসরা : ৮৫)।
এই রুহের স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে পারেনি দুনিয়ার কোনো তত্ত্বজ্ঞানী বা বিজ্ঞানী। অথচ ইনসানে কামিল প্রিয়নবী (সা.) জানতেন রুহের আসল পরিচয়। তাই তার উপাধি ছিল তিনি শাহেদ, সাক্ষী। আল্লাহর অন্যতম নাম ‘ন্যায়বিচারক’। ন্যায়বিচারের সঙ্গে সত্যের সাক্ষীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই অর্থেই নবীজি ছিলেন সাক্ষী। তাঁর পবিত্র রুহের ওপর প্রতিফলিত ছিল আল্লাহর ন্যায়বিচারক গুণবাচক নামের উদ্ভাস। জেনে রেখ,
মানজারে হক দিল বুয়াদ দর দো সরা
কে নজর দর শাহেদ আয়দ শাহ রা
উভয় জাহানে তার নজরে থাকে মানুষের অন্তর
কারণ, বাদশাহ দেখেন কার অন্তর প্রেমে কাতর।
আল্লাহ মানুষের বাইরের সৌন্দর্য বেশভূষা দেখেন না। তিনি দেখেন তোমাদের অন্তরের সৌন্দর্য। আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহর কাছে আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।’ (সুরা শোয়ারা : ৮৮- ৮৯)।
আই য়ারানা লা নারাহু রুজ ও শব
চশমে বন্দে মা শুদে দিদে সবব
যিনি রাতদিন আমাদের দেখেন আমরা দেখি না তাকে
কারণ ও সামগ্রির মোহ পর্দা ঢেকেছে আমাদের চোখে।
স্বার্থচিন্তা জাগতিক বিষয়-আশয় আমাদের চোখে পর্দা টানিয়ে রেখেছে। ফলে আমরা তাকে দেখি না। অথচ রাতদিন তিনি আমাদের দেখেন, আমাদের সঙ্গেই আছেন। তাই তার কাছে প্রার্থনা-
য়া রব্বি আতমিম নুরানা ফিস সাহেরা
ওয়ানজেনা মিন মুফযিহাতিন কাহেরা
প্রভুহে হাশরের দিন দাও আমাদের পূর্ণ মাত্রায় নুর
মুক্তি দাও অপমান হতে, যত লজ্জা-গ্লানি কর হে দূর।
রাতে বাদশাহর পরিচয় পেয়ে যে চোরের দৃষ্টি প্রখর, সুলতানের সামনে দাঁড়িয়ে অদম্য সাহসে সে আজ মুখর। বলল, জাহাপনা, গেল রাতে পরিচয় গোপন করে আমাদের মাঝে ছিলেন। বলেছিলেন, আমার কৃতিত্ব দাড়িতে। আমার দাড়ি হেলানে ফাঁসির আসামি খালাস পায়। আমরা প্রত্যেকে নিজের কৃতিত্ব জাহির করেছি সত্য। কিন্তু সব কৃতিত্ব দুর্গতি বয়ে এনেছে আমাদের জন্য। আমাদের যোগ্যতা কৃতিত্বের বহর আমাদের গলার ফাঁস হয়েছে। আপনার কৃতিত্বের দাড়ি দুলিয়ে দয়া করে গোনাহগারদের খালাস দিন। সুলতান তাকালেন সেই চোখের দিকে গেল রাতে যা বিভোর ছিল বাদশাহর চেহারার সাথে মিতালিতে। তার সম্মানে বিচার আদালতে সুলতান তার দাড়ি নাড়লেন। কী আশ্চর্য, সেই ইশারায় রহমতের পরশে অপরাধীরা বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন। (মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, খণ্ড : ৬, বয়েত : ২৮৪৩-২৯২১)।
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন CHAYAPATH PROKASHONI)