
রংপুর বিভাগসহ উত্তরের আটটি জেলার ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সূর্যহীন দিন, তীব্র ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে। ফলে দুর্ভোগ বেড়েছে এই জনপদের লোকজনের। শীতে বাড়ছে রোগ, সঙ্গে আগুন পোহাতে গিয়ে ঘটছে দগ্ধ হওয়ার ঘটনাও। এ শীতের কবল থেকে পশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকাল ৬টায় নওগাঁর বদলগাছীতে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
একই সময়ে রংপুরে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি, দিনাজপুরে ৮ দশমিক ৭, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৮.৫, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৭.৫, রাজারহাটে ৮.৫, ডিমলায় ৮ ও ঠাকুরগাঁওয়ে ৭ দশমিক ৫ ও গাইবান্ধায় ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় কুয়াশা সহজে কাটছে না, ফলে শীতের অনুভূতি আরো তীব্র হচ্ছে।
এদিকে শীতের তীব্রতা বাড়তে থাকায় উত্তরের জেলাগুলোতে খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সুযোগ কমে গেছে। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুরসহ শ্রমজীবী মানুষজন প্রচণ্ড ঠান্ডায় কাজে বের হতে পারছেন না। এতে দৈনিক আয় কমে গিয়ে অনেক পরিবার পড়েছে চরম সংকটে। হাড়কাঁপানো শীতে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেকে খড়কুটো, কাঠ কিংবা পরিত্যক্ত কাগজ জ্বালিয়ে ঠান্ডা থেকে রক্ষার চেষ্টা করছেন।
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুর নগরীর শীতবস্ত্রের বাজারগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্টেশন বাজার, জামাল মার্কেট, ছালেক মার্কেট, হনুমানতলা এরশাদ হকার্স মার্কেটসহ শহরের বিভিন্ন বিপণিবিতান ও ফুটপাতে নতুন ও পুরোনো শীতবস্ত্রের জমজমাট বেচাকেনা চলছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষজন সাশ্রয়ী দামে শীতের পোশাক কিনতে পুরোনো কাপড়ের দোকান ও অস্থায়ী স্টলগুলোতে ভিড় করছেন। জাহাজ কোম্পানি মোড়, সেন্ট্রাল রোড, পায়রাচত্বর ও টার্মিনাল এলাকার ফুটপাতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কেনা-বেচা অব্যাহত রয়েছে।
রিকশাচালক মানিক মিয়া বলেন, দিনে যা আয় হয়, তাতে ঠিকমতো খাবার জোটানোই কষ্ট। নতুন শীতের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। পুরোনো একটা জ্যাকেট কিনেছি, সেটাই ভরসা।
একই কথা জানান দিনমজুর ও ভ্যানচালকরাও। তারা বলেন, শীত বাড়লেও আয় বাড়েনি, বরং কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লিটন ও দুলু মিয়া জানান, এ বছর পাইকাররা পুরোনো কাপড়ের দাম বেশি নিচ্ছেন। পুরোনো কাপড় আমদানির কোটা কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে, যার প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।
শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ১ থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শীতজনিত জটিলতায় শিশু ও বয়স্কসহ প্রায় ২০০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময় স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একজন শীতজনিত জটিলতায় মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত জ্বরে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাই বেশি।
তিনি আরও জানান, শীতে গত ১৪ দিনে রমেক হাসপাতালে শীতজনিত রোগে মারা গেছেন ১৬ জন। শীতের প্রকোপ বাড়ায় রমেক হাসপাতালসহ উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও বাড়ছে শীতে রোগাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এসব রোগীর মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, জ্বর-সর্দি ও কাশিসহ নানা রোগে আক্রান্ত শিশুসহ বয়স্ক নারী-পুরুষ রয়েছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, ডিসেম্বর মাসে এ অঞ্চলে ৮ দিন সূর্যের দেখা মেলেনি এবং জানুয়ারি মাসেও ৫ দিন সূর্যের আলো দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, জানুয়ারি মাসে আরো ২-৩টি মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে, যা জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডক্টর মো. নাজমূল হুদা জানান, রংপুর জেলার ৮ উপজেলা, তিনটি পৌরসভা এবং একটি সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২১ লাখ পশু রয়েছে। এই শীত মৌসুমে গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষগুলোতে বাড়তি যত্ন নিতে হবে।
তিনি বলেন, তাদের যে স্থানে থাকে সেখানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আগুনে তাপ দিতে হবে। ওইসব প্রাণীদের গরম কাপড় দিয়ে রাখতে হবে।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন, শীত মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা আরো বাড়ানো হবে।
অন্যদিকে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করছে। জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। উত্তরের তিস্তা, ঘাঘট, করতোয়া, যমুনেশ্বরী বিধৌত চরাঞ্চলে বসবাসকারী হাজার হাজার পরিবার শীতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। তাদের বেশিরভাগ মানুষের কাছে এখনো শীতবস্ত্র পৌঁছেনি।