
বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, আইনগত কাজ করতে গেলে মানুষ ভুল বোঝে। তারা মনে করে, এরা ৫ আগস্টের আগের পুলিশ, তারা কেন গ্রেফতার করবে, রাস্তা ছেড়ে দিতে বলবে। নির্বিঘ্নে আইন প্রয়োগ করাই পুলিশের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। সমাজের সম্পূর্ণ সমর্থন না পেলে আমি নির্বাচন করতে পারবো না।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে রংপুর পুলিশ লাইন্স স্কুল এন্ড কলেজ অডিটরিয়ামে রংপুর বিভাগে কর্মরত পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের অফিসার ও ফোর্সের সঙ্গে বিশেষ কল্যাণ সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা সভায় উপদেষ্টাদের বলেছি, নির্বিঘ্নে আইন প্রয়োগে আমাকে সমর্থন ও গ্রিন সিগন্যাল দিতে হবে। আমি নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে চাই। এনসিপি কিংবা বড় দলের নেতারা আসামি গ্রেফতার নিয়ে কথা বলবে—এই ভয়ে থাকলে পুলিশ সদস্যরা ঠিকমতো কাজ করতে পারবে না। আমরা যদি অন্যায় করি, তবে অবশ্যই আপনারা আমাদের ধরবেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা আমাদের দায়িত্ব। পুলিশের সঙ্গে ৬ লাখ আনসার থাকবে। এছাড়া নির্বাচন পূর্ব সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী আমাদের সঙ্গে রয়েছে। বর্ডার গার্ড, কোস্ট গার্ড অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, বিগত ১৫ বছরে পুলিশ দলীয় পুলিশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল, নানা ধরনের বিচ্যুতি ছিল। আমরা অনেক গণবিরোধী কাজ করেছি। জুলাই-আগস্টে বিপুল পরিমাণ আন্দোলনকারী শহীদ হয়েছে। লোভী, দলকানা পুলিশ সদস্যের কারণে আমাদের ওপর অনেক দায়ভার এসেছে। এগুলো থেকে বেরিয়ে এসে পুলিশকে আবার স্বমহিমায় দাঁড় করানো, মনোবল বৃদ্ধি করা এবং তাদের কাজে ফিরিয়ে আনার জন্য গত এক বছর ধরে চেষ্টা করছি।
আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, অপরাধ শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করে ফেলা যায় না। প্রতি বছর গড়ে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার হত্যা সংঘটিত হয়। আমাদের চেষ্টা থাকবে যেন একজন মানুষও মারা না যায়। শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড আমাদের সারা জাতিকে উদ্বেলিত করেছে। আমাদের ওপর দায়ভার এসেছে এটির সুষ্ঠু সমাধান ও বিচার করার। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। খুলনা অঞ্চলে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আমরা অধিকাংশ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করতে পেরেছি।
তিনি বলেন, দেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিতে-সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। তবে সুযোগসন্ধানীরা যদি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে, আমরা যতটা পারি তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করি। জুলাই-আগস্টের পর অনেক জায়গায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, মাজারে আক্রমণ ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আমরা প্রতিটি ঘটনায় মামলা করে দোষীদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের বিচারব্যবস্থা এমন যে কোনো বিচার করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
তিনি বলেন, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রংপুর বিভাগে হত্যাকাণ্ডের মামলায় তিন ভাগের এক ভাগ বিচার করা সম্ভব হয়েছে। বিচার কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। মামলা জটের কারণে খুনের বিচার ১০ বছরেও না হওয়ায় খুনিরা ও আক্রমণকারীরা উৎসাহিত হচ্ছে। এটি সিস্টেমের দুর্বলতা। বিশেষ আইন তৈরি করে এসব জায়গায় সরকারকে নজর দিতে হবে। সামনে রাজনৈতিক সরকার বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে দেখবে বলে প্রত্যাশা করছি।
তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম পুলিশকে নির্বাচনের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার পর্যন্ত দেড় লাখ পুলিশের মধ্যে ১ লাখ ৩৩ হাজার পুলিশ সদস্যকে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে বাকিদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সকল ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করবে। এর বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ ৮ হাজার ও মধ্যম ঝুঁকিতে থাকা ১৬ হাজার ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের বডি ক্যামেরা দেওয়া হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি আমিনুল ইসলাম, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মজিদ আলী, জেলা পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।