
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার কৃষক এনতাজুল মাচায় উন্নত জাতের দেশি পটল চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। প্রথমবারেই দেশি জাতের পটল চাষে অধিক লাভবান হওয়ায় কৃষক এনতাজুলের মুখে হাসি ফুটছে। দেশি পটল চাষ করে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছেন এই কৃষি উদ্যোক্তা।
তার সফলতা দেখে উৎসাহিত হচ্ছেন অনেক কৃষক। এ ধরনের পটল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে কাজ করছেন স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
বিরল উপজেলার মোকলেছপুর গ্রামের ইব্রাহিম আলীর পুত্র এনতাজুল হক (৩২) গত বছর ২৫ শতাংশ জমিতে দেশি পটল চাষ করে প্রচুর লাভবান হয়েছেন।
চলতি বছর তিনি গত বছরের তুলনায় তিনগুণ জমিতে পটল চাষ করেন। ৭৫ শতক জমিতে দেশি জাতের পটল চাষ করে গত বছরের চেয়ে এবারের ফলন আরও ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় করতে পারবেন বলে আশা করছেন এনতাজুল।
বিরল উপজেলা কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা জানান, গত বছর ২৫ শতাংশ জমিতে এনতাজুল মাচায় দেশি জাতের পটল চাষ করেন। অনুকূল আবহাওয়ায় দেশি পটলের ফলন ভালো হয়। গত বছর তিনি পটল চাষের খরচ বাদে প্রায় ৭০ হাজার টাকা লাভ করেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে এনতাজুল এ বছর ৭৫ শতক জমিতে উচ্চ ফলনশীল দেশি জাতের পটল মাচায় চাষ করেছেন।
অন্য ফসলের চেয়ে পটলে বেশি লাভ হওয়ায় ভবিষ্যতে তিনি আরও বেশি জমিতে দেশি পটলের চাষ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পটল চাষি এনতাজুল বলেন, আমি বিরল উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় আধুনিক চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে দেশি জাতের পটল চাষ করে আশাতীত ফল পেয়েছি। এরই মধ্যে সবজি ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করা শুরু করেছি। দেশি জাতের পটল খেতে খুব সুস্বাদু। পটলের চামড়া পাতলা, আকারে মাঝারি এবং ছোট সাইজের হয়। যে সব গ্রাহক একবার দেশি পটল খেয়েছেন, পরের দিন আবার বাজারে এসে এই দেশি পটলের খোঁজ করছেন।
বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রুম্মানা আক্তার জানান, বিগত প্রায় ১০/১২ বছর জেলার হাটবাজারগুলোতে হাইব্রিড পটলের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা গেছে। হাইব্রিড পটল সাইজে বড় ও খোসা মোটা হয়, কিন্তু খেতে খুব একটা সুস্বাদু নয়। হাইব্রিড পটলে শুরু থেকেই বিচি বড় থাকে ও খাওয়ার সময় খসখসে লাগে। বিষয়টি লক্ষ্য করে কৃষি বিভাগ নতুন করে গবেষণা করে দেশি পটল চাষে আধুনিক পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেয়। ফলে গত দুই বছর ধরে উন্নত জাতের দেশি পটল চাষে কৃষি বিভাগ সফল হয়েছে। এখন এই জেলার হাটবাজারগুলোতে নতুন জাতের দেশি পটল গ্রাহকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
তিনি জানান, হাইব্রিড পটল যেখানে ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে, সেখানে দেশি পটল পাইকারি ১০০ টাকা এবং খুচরা ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গ্রাহকরা হাইব্রিড পটল কম দামে কিনতে আগ্রহী না হয়ে বেশি দামে দেশি জাতের পটল কিনছেন।
কৃষি বিভাগের উদ্ভাবন করা উন্নত জাতের দেশি পটল চাষে কৃষকরা আগ্রহী হচ্ছেন। দেশি পটল চাষ করে অধিক মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছেন। এই দেশি জাতের পটল শুধু এই জেলাতেই নয়, প্রতিদিন দিনাজপুরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাইকাররা নিয়ে যাচ্ছে। এখন সারাদেশেই কৃষি বিভাগের উদ্ভাবন করা নতুন জাতের দেশি পটল গ্রাহকদের কাছে সুস্বাদু সবজি হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
একই এলাকার তরুণ কৃষক রবিউল ইসলাম (৩০) বলেন, বাজারে দেশি পটলের চাহিদা অনেক বেশি। তাই আমি এ বছর ৩০ শতক জমিতে নতুন জাতের দেশি পটল আবাদ করেছি। গত ২০ দিনে আমার পটলের ক্ষেত থেকে ১৮ হাজার টাকার পটল পাইকারি বিক্রি করেছি। আমি আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের দেশি পটলের আবাদ করব।
স্থানীয় তরুণ কৃষক আসাদ আলী বলেন, আজ আমি এনতাজুল ভাইয়ের পটল চাষ পদ্ধতি দেখতে এসেছি। তার আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের দেশি পটল চাষ দেখে খুব ভালো লাগল। আমি আগামী বছর আমার জমিতে উন্নত জাতের দেশি পটল চাষ করব ইনশাআল্লাহ।
বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তফা হাসান ইমাম বলেন, রফতানিমুখী কৃষির কথা বিবেচনা করে সম্পূর্ণ জৈবিক উপায়ে একটি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের মাধ্যমে উন্নত জাতের দেশি পটলসহ নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি আবাদ করা হচ্ছে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল দেশের বিভিন্ন সুপারশপসহ বিদেশে রফতানি করতে পারেন।
এর মধ্যে এই জেলার উৎপাদিত উন্নত জাতের দেশি পটল রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার থাই ও চাইনিজ রেস্টুরেন্টে জনপ্রিয় সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কৃষি অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে।