
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা জমে উঠেছে। মেলা ঘিরে এলাকাবাসীর আনন্দের কমতি নেই। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে লালন করতে প্রতিবছর বাংলা বৈশাখ মাসের ৯/১০ তারিখ থেকে শুরু হয় মাসব্যাপী এই মেলা।
ফুলবাড়ী শহর থেকে ৮/৯ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং বারাইহাট থেকে ৫/৬ কিমি দক্ষিণে ২ নম্বর আলাদীপুর ইউনিয়নে শত বছর ধরে বসে এ ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন মেলা। মূল মেলা এক মাস হলেও পশুর মেলা হয় ১০ দিন।
ঘোড়া ছাড়াও মহিষ, গরু, ভেড়া ও ছাগল বেচাকেনা হয় এ মেলায়। তবে এখন গরু-মহিষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মূলত ঘোড়ার মেলা হিসেবেই বেশি প্রসিদ্ধ।
আয়োজকেরা বলছেন, দেশের অন্যতম ঘোড়া বেচাকেনার মেলা এটি। এই মেলার জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে ৮ একর জমি-মাঠ। এখানে মাদ্রাসা-স্কুলের প্রশস্ত মাঠে যেমন হাট বসে তেমনি হাসিল অফিস, ডাকঘর, সমবায় অফিস, ক্লিনিক, খেলার মাঠ, ইউপি অফিস—এসবের কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে পরিণত হয়েছে। এ কারণে সারা দেশ থেকে আনা কয়েক শ ঘোড়া জড়ো করা হয় এখানে।
দুমকি, সিডর, দুর্বার, বিজলি, কিরণমালা, রানি, সুইটি—আরও কত যে বাহারি নাম এদের! ওদের ক্ষিপ্রতা আর বুদ্ধিমত্তায়ও মেলে নামের সার্থকতা। ঘোড়াগুলোর দুলকী চলনে বিদ্যুৎগতি, চোখের পলকে যেন মাইল পার। এমন নানামুখী গুণের কারণে দেশি-বিদেশি ঘোড়াগুলোর কদরও যথেষ্ট। পছন্দের ঘোড়াকে পেতে ক্রেতাদের মধ্যেও চলে রীতিমতো কাড়াকাড়ি আর দর-কষাকষি। ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা। দরদাম ঠিকঠাকের পর একটি খেলার মাঠে ঘোড়া নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ক্রেতাকে দেখানো হয় ঘোড়ার দৌড়।
রংপুর তারাগঞ্জ থেকে মজনু মিয়া পাঁচটি ঘোড়া নিয়ে মেলায় এসেছেন। পাঁচ বছর ধরে মেলায় আসেন। তাঁর বড় ঘোড়াটির নাম ‘নিউপাওয়ার টেন’। দাম হেঁকেছেন সাত লাখ টাকা। সাড়ে পাঁচ লাখ পেলে ছেড়ে দেবেন।
বগুড়া থেকে আজাদ হোসেন ‘সম্রাট’ নামের পাঁচ বছর বয়সের লাল ঘোড়া নিয়ে এসেছেন। দাম হেঁকেছেন তিন লাখ টাকা। এটি রেসিং ঘোড়া, দ্রুত দৌড়াতে পারে। ঘোড়াটির যত্ন তিনি নিজেই নেন। ৪০ বছর ধরে এ মেলায় আসেন বলে জানান।
মেলায় ঘোড়া কিনতে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মাঝে বাহন হিসেবে মোটরসাইকেলের পরিবর্তে ঘোড়াকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে তাঁরা ভাবছেন। তাঁরা বলছেন, তেল নিয়ে এবার যে কষ্টটা পেয়েছেন, সে কারণেই ঘোড়ার প্রতি আগ্রহ। আর তাই আগেভাগেই মেলায় এসেছেন।
ঘোড়সওয়ারি কামরুজ্জামান জানান, আগেও তাঁদের বাপ-দাদারা এ মেলায় ঘোড়া কেনাবেচা করতেন। পূর্বপুরুষের সূত্রধরে তাঁরাও আগলে রেখেছেন সেই পারিবারিক ঐতিহ্য। আগে ঘোড়ার হাট ও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ঘোড়দৌড়ের বিস্তীর্ণ মাঠ থাকলেও বর্তমানে সেই স্থানটি সংকুচিত করা হয়েছে বলে ঘোড়া বেচাকেনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
মেলার ইজারাদার সফিকুল ইসলাম বলেন, ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা সুষ্ঠুভাবে হওয়ার জন্য এবং বিদ্যুৎ, পানির সুব্যবস্থা রাখতে ২০০ স্বেচ্ছাসেবী নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। মেলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে কেনাবেচার রসিদ মূল্য গতবারের মতোই সহনীয় রাখা হবে।
স্থানীয় ৭৯ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সাবেক আলাদীপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. দছিম উদ্দীন মণ্ডল জানান, এ মেলায় লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, দিনাজপুর, পাবনা, জয়পুরহাট, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘোড়ার আমদানি হয়।
ফুলবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা কমিটির সভাপতি আফতাব উদ্দিন জানান, শত বছরের পুরোনো এ মেলা শুরু থেকেই ঘোড়ার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পরও মেলায় নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে উন্নতজাতের ঘোড়া আসত। বর্তমানে সেসব এখন স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘোড়সওয়ারি ও ঘোড়া মালিকেরা এ মেলায় ঘোড়া নিয়ে আসেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছান বলেন, ফুলবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলাটি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে। মেলায় সুষ্ঠুভাবে কেনাবেচা সম্পন্ন হওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলা পরিদর্শনসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।