
চলছে বর্ষার ভরা মৌসুম। অথচ পাবনার ঈশ্বরদী অঞ্চলের মাঠে এখনও বর্ষার সেই চেনা রূপ নেই। বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর থাকার কথা যে জমিগুলো, সেগুলোর অনেকগুলোতেই এখন চলছে সেচ। আমনের মৌসুমে এমন দৃশ্য গত কয়েক বছর ধরেই দেখছেন এ অঞ্চলের চাষিরা।
একসময় ঈশ্বরদীর আকাশে বর্ষায় মেঘ মানেই ছিল কৃষকের স্বস্তি। কিন্তু সেই স্বস্তির মৌসুমি বৃষ্টি এখন ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে।
গত কয়েক বছর ধরেই এই অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমেছে। কৃষক ও কৃষিবিদরা বলছেন, এটি বদলে যাওয়া জলবায়ুর কঠিন বাস্তবতার ইঙ্গিত। একই সঙ্গে বাড়ছে তাপমাত্রা, গভীর হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ। এর সরাসরি আঘাত পড়ছে কৃষি, জীবিকা ও গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি স্তরে।
ভরা মৌসুমে বৃষ্টি না হওয়ায় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় আমন চাষ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। এ বছর আদৌ আমন আবাদ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই তাদের। প্রতিটি ক্ষণ বৃষ্টির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন উপজেলার কৃষকরা।
এ অঞ্চলের কৃষকদের ভাষ্যমতে, বৃষ্টিপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এর প্রভাব পড়ছে আমনের আবাদে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় আমন চাষ এখন আর শুধু আকাশের পানির ওপর নির্ভরশীল নয়।
গত কয়েক দিনে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কোথাও জমি চাষের কাজ চলছে, কোথাও সেচ দিয়ে কাদা তৈরি করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিকরা আমনের চারা রোপণ করছেন। তবে প্রায় প্রতিটি ক্ষেতেই কৃষকরা বলছেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় সেচের খরচ বেড়েছে।
জানা গেছে, বর্ষাকালে মূলত বৃষ্টির পানি দিয়েই কৃষকরা রোপা আমন চাষ করে থাকেন। চলতি বছর জুলাই শেষ হয়ে আগস্ট আসলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা নেই। এতে আমন চাষিরা পড়েছেন মহাবিপাকে। বৃষ্টির অভাবে ধান লাগানো তো দূরের কথা, অধিকাংশ কৃষক জমিই তৈরি করতে পারেননি।
জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে মৌসুমি বৃষ্টি না হওয়ায় কোথাও কোথাও উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে জমি তৈরির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিসে দেওয়া তথ্য মতে, চলতি আমন মৌসুমে উপজেলায় ৩ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে আবাদ হয়েছে ২১০ হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার শতকরা ৫ দশমিক ৭২ ভাগ।
অবশ্য কৃষি বিভাগ বলছে, উপজেলায় বেশিরভাগ জমিতেই পাটের আবাদ হয়েছে। শ্রমিকের অভাব ও পাট জাগ দেওয়ার পানি না থাকায় অনেক কৃষক এখনো পাট কাটতে পারেননি। এ অঞ্চলের একটি বড় অংশের কৃষক জমির পাট কেটে পরে আমন ধান লাগান। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পাট কেটে ধান লাগানো হলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পাট আবাদকারী কৃষকরা বলেন, শ্রমিক সংকট এবং জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেক এলাকার চাষিরা সময়মতো পাট কাটতে ও পচাতে (জাগ দিতে) চরম বিপাকে পড়ছেন।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের জুলাই মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত ঈশ্বরদীতে ৩১৮ দশমিক ০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর আগের মাস জুনে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩১৬ দশমিক ৫ মিলিমিটার।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৩৯৪ দশমিক ৭ মিলিমিটার এবং ২০২৫ সালের জুন মাসে ২০৩ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
এই তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের জুলাই মাসে আগের বছরের জুলাই মাসের তুলনায় বৃষ্টিপাত কমেছে ৭৬ দশমিক ৫ মিলিমিটার।
উপজেলার সাঁড়া ইউনিয়নের ইলশেমারি গ্রামের কৃষক সলেমান আলী বলেন, প্রতিবছর আমন মৌসুমে প্রায় এক একর জমিতে ধান চাষ করেন তিনি। কিন্তু গত দুই-তিন বছর মৌসুমি বৃষ্টি না হওয়ায় রোপা আমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চলতি মৌসুমে এখনো জমি তৈরি করতে পারেননি। তার এলাকার অধিকাংশ কৃষকই বৃষ্টি না হওয়ায় চিন্তিত। অথচ এখন রোপা আমনের ভরা মৌসুম চলছে।
উপজেলার গোপালপুর এলাকার কৃষক কায়সার প্রামাণিক বলেন, তার জমির তিল কেটে বড় গাড়ি দিয়ে একটি লাঙ্গল চালিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। ধান লাগানোর জন্য জমি কাদা (পাকানো) করতে হয়। কাদা করার জন্য পাওয়ার টিলার অথবা গরুর নাঙ্গল দিয়ে কাজ করানোর জন্য সিরিয়াল দিয়ে রেখেছেন। জমি কাদা করার ব্যবস্থা করতে না পারায় এখন তিনি ধান লাগাতে পারেননি।
শনিবার (১ আগস্ট) সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জমি চাষ, শ্রমিকের মজুরি, তেল, সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। গুটিকয়েক কৃষক মেশিনের সাহায্যে পানি সেচ দিয়ে ধান রোপণ করলেও বেশিরভাগ কৃষকই এখনো ধান রোপণ করতে পারেননি। কেউ কেউ বলেন, জমিতে পানি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার জমি শুকিয়ে যাচ্ছে।
কৃষক আবেদ আলী বলেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টি না থাকায় সময়মতো চারা রোপণ করা যাচ্ছে না। সেচ ও শ্রমিক বাবদ প্রতি বিঘায় অতিরিক্ত খরচ করতে হলেও ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
উপজেলার মো. কাশেম খান, আব্দুস সালাম, আমজাদ হোসেন, আবুল হোসেনসহ অনেকেই জানান, এ বছর কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় শ্যালো মেশিন ও বৈদ্যুতিক মোটর চালিয়ে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে তাদের ধান উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে।
শনিবার দেখা গেছে, ঈশ্বরদী-বাঘা আঞ্চলিক সড়কের পাশে সাঁকোর নিচে উপজেলার গোপালপুর এলাকায় কৃষক মজিবর রহমান খান জমিতে ধান লাগানোর জন্য সেচ দিয়ে কাদা তৈরি করছেন।
ঈশ্বরদী উপজেলার একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমন আবাদ শুরু হয়ে থাকে এবং আগস্টের শেষদিকে ধান লাগানো শেষ হয়। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় জুলাই মাস শেষ হয়ে আগস্ট শুরু হলেও লক্ষ্যমাত্রার বেশিরভাগ জমিতে আমন আবাদ করা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, আশা করছি, বৃষ্টি শুরু হলে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে আমন ধান রোপণ শেষ হয়ে যাবে। কিছু কিছু এলাকায় সেচের মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।