
নেত্রকোনা সদর উপজেলার দক্ষিণ বিশিউড়া ইউনিয়নের ভাইরাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে এক ছিন্নমূল পরিবারের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া স্কুলছাত্রীকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত রোববার রাতে ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নন্দুরা বাজারে স্থানীয় বিএনপির কার্যালয়ে সালিশ বসে। সেখানে সাবেক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সালিশে রিপন মিয়াকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, উপস্থিত মানুষের সামনে সালিশে রিপন মিয়া কয়েকজনের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইছেন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি সেখানে নিজের অপরাধও স্বীকার করেছেন।
জানা গেছে, নেত্রকোনা সদর উপজেলার দক্ষিণ বিশিউড়া গ্রামের মোক্তাল হোসেনের ছেলে রিপন মিয়া। তিনি পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বেশ কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ‘ফানি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পেশায় তিনি একজন কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানের ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পান। এ কারণে বিভিন্ন সময় স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও অন্যান্য কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের তার কাছে যাতায়াত ছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তার পাশের বাড়িতে সরকারি জায়গায় বসবাসকারী ভুক্তভোগী মেয়েটির বাড়িতেও রিপনের যাতায়াত ছিল।
এলাকাবাসী সূত্র জানায়, একই গ্রামের এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে রিপনের বিরুদ্ধে। মেয়েটির পরিবারের দাবি, রিপন প্রায়ই ওই কিশোরীকে উত্যক্ত করতেন। দুই দিন আগে রাত ৮টার দিকে বাড়ির উঠানে রান্না করার সময় কিশোরীকে কৌশলে বাড়ির পেছনে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন তিনি।
পরে স্থানীয় দুই ব্যক্তি ঘটনাটি দেখে ফেললে তাদের ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ম্যানেজ করারও অভিযোগ ওঠে রিপনের বিরুদ্ধে।
পরে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে স্থানীয়রা মীমাংসার জন্য দক্ষিণ বিশিউড়া ইউনিয়নের নন্দুরা বাজারে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির কার্যালয়ে সালিশের আয়োজন করে। সালিশে রিপন মিয়া উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নেতা আবদুল হাই মুন্সি, আতাউর রহমান, স্থানীয় জামায়াত নেতা জয়নাল আবেদীন, দৌলত মিয়াসহ এলাকাবাসী রোববার রাতে সালিশে অংশ নেন।
সালিশে অভিযুক্ত রিপন মিয়া নিজের দোষ স্বীকার করেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। পরে তাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা পাঁচ দিনের মধ্যে পরিশোধের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয় বলেও জানা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুকে) ছড়িয়ে পড়া সালিশের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রিপন মিয়া সবার সামনে বলছেন, “আমার দোষ থাকলেও আছে, না থাকলেও আমি সবার সিদ্ধান্ত মেনে নেব।” বিষয়টিকে অনেকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, ধর্ষণের মতো ঘটনা গ্রাম্য সালিশে নিষ্পত্তি করা ঠিক হয়নি। এ ধরনের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।
জানতে চাইলে সালিশে উপস্থিত ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, তিনি এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনটিও বন্ধ রয়েছে।
রিপন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী গর্ভবতী অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে আছেন। ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, তার স্বামীকে ফাঁসানো হয়েছে। তার ভাষ্য, দরবারে একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত হয়েছে। রিপনের পক্ষে তিনি ছাড়া পরিবারের আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তাই সালিশ সঠিক হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগীর মা বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। স্বামী-স্ত্রী মিলে দক্ষিণ বিশিউড়া বাজারে একটি চায়ের দোকান চালাই। এ কারণে আমার কিশোরী মেয়ে বাড়িতে একা থাকে। এই সুযোগে পাশের বাড়ির রিপন মিয়া (কন্টেন্ট ক্রিয়েটর রিপন ভিডিও) ঘরে ঢুকে আমার মেয়ের ইজ্জত নষ্ট করেছে। আমরা গরিব মানুষ হওয়ায় এলাকার মাতব্বররা বিচার করেছে। তবে আমি প্রশাসনের সহযোগিতায় এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
ঘটনার পর থেকে রিপন ভিডিও গা ঢাকা দিয়েছেন। তাকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, সালিশের পর থেকে ভুক্তভোগীকেও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মতো ঘটনায় কোনো ধরনের সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার সুযোগ নেই।
এ ঘটনাটি যারা সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করতে চেয়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ ঘটনায় এখনও থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ হয়নি।