অনলাইন সংস্করণ
১৮:৫৩, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬
অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অন্তত দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির সরকারি এক কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ-প্রতিবাদে কমপক্ষে ২ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তাদের মধ্যে দেশটির বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা রয়েছেন। এই প্রাণহানির ঘটনায় সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছেন ওই কর্মকর্তা।
দুই সপ্তাহ ধরে চলা দেশব্যাপী অস্থিরতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পর এই প্রথম কর্তৃপক্ষ এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করল।
রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ওই ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা কর্মী—উভয় পক্ষের মৃত্যুর পেছনে ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন সাধারণ মানুষ আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য—সে বিষয়ে ওই কর্মকর্তা কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
ইরানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই অস্থিরতার সূত্রপাত হয়েছে। গত তিন বছরের মধ্যে এটি ইরানের কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে ইরান এমনিতেই তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ এই আন্দোলন মোকাবিলায় দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছে। তারা অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে হওয়া প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে ‘বৈধ’ বলে অভিহিত করলেও বাস্তবে অত্যন্ত কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করছে।
ইরান সরকার এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে দাবি করেছে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসীরা’ এই আন্দোলনকে দখল করে নিয়েছে।
এর আগে একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছিল, বিক্ষোভে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কয়েক দিন ধরে তেহরান সরকারের ইন্টারনেট বন্ধ রাখাসহ যোগাযোগের ওপর নানা বিধিনিষেধ থাকায় তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত এক সপ্তাহে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে রাতের বেলা সংঘর্ষের বেশ কিছু ভিডিও পাওয়া গেছে। এসব ভিডিওতে গোলাগুলি, গাড়ি ও ভবনে অগ্নিসংযোগসহ সহিংস সংঘাতের চিত্র দেখা গেছে।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারের সমর্থনে পাল্টা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদক জানান, সমাবেশকারীরা জনসমাগমস্থলে সাম্প্রতিক সহিংসতার নিন্দা জানান।
বিক্ষোভকারীরা সরকারের কাছে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের দাবি জানালেও, একই সঙ্গে তারা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ প্রত্যাখ্যান করেন। তেহরান ছাড়াও পূর্ব ইরানের কেরমান, জাহেদান ও বিরজান্দসহ বিভিন্ন শহরে একই রকম সমাবেশের খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে একই দিনে দেশের নানা প্রান্তে সরকারবিরোধী বিক্ষোভও চলতে থাকে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘সশস্ত্র দাঙ্গাকারীদের’ সমর্থন দিচ্ছে, যারা দেশজুড়ে বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে হামলা চালিয়েছে।
সোমবার ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের ভেতর দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের সময় ২৭৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে।
গত মাসে ইরানে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের ইতিহাসে সর্বনিম্ন মূল্যপতন ঘটে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর নেমে এসেছে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, দেশজুড়ে ৫৮৫টি স্থানে, ৩১টি প্রদেশের ১৮৬টি শহরে সংঘটিত বিক্ষোভে অন্তত ১০ হাজার ৬৮১ জনকে আটক করা হয়েছে।