ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

২৬ দিন পর অনশন ভাঙলেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক

২৬ দিন পর অনশন ভাঙলেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক

সরকারের সঙ্গে 'দীর্ঘ আলোচনার পর এবং সহিংসতা এড়াতে' অবশেষে ২৬ দিন পর অনশন ভাঙলেন ভারতের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক।

এনডিটিভি জানিয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এমন আশ্বাস পেয়ে তবেই ওয়াংচুক গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে ২৬ দিন পর তার অনশন শেষ করেছেন।

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে বেশ কয়েক দফা দাবিতে ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে এখনো ধর্নায় আছে ককরোচ জনতা পার্টির সদস্যরা।

ওয়াংচুকের অনশনের কারণ ভারতের মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নফাঁসের ঘটনা। প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে যুব সংগঠন সিজেপির সমর্থনে গত ২৮ জুন থেকে অনশনে বসেছিলেন ৫৯ বছর ওয়াংচুক। টানা অনশনের ফলে এর মধ্যে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। অনশনের ২১ দিনের মাথায় তাকে হাসপাতালেও ভর্তি করে কর্তৃপক্ষ।

অবশেষে ২৭ দিনের মাথায় অনশন ভাঙলেন ওয়াচুক। সোশাল মিডিয়ায় আসা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিং হাসপাতালের কেবিনে ওয়াংচুকের পাশে আছেন। একটি পেয়ালা থেকে তাকে পান করতেও সহযোগিতা করছেন তারা। সেখানে এই সমাজকর্মীর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোকেও দেখা গেছে।

অনশন প্রত্যাহারের পরে ওয়াংচুককে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মান জানিয়েছেন কয়েকজন।

এরপর এক্সে একটি পোস্ট অনশন ভাঙার কারণ তুলে ধরেছেন ওয়াংচুক।

তিনি লিখেছেন, “এইমাত্র কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রী জে পি নাড্ডা, ড. জিতেন্দ্র সিংসহ ঊর্ধ্বতন নেতাদের উপস্থিতিতে আমি অবশেষে ২৬ দিনের অনশন ভঙ্গ করেছি। এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৬৫ জন সংসদ সদস্য আমাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়ে আমার সাথে দেখা করেছিলেন বা চিঠি দিয়েছিলেন।

“বিভিন্ন শর্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর এবং সম্ভাব্য সহিংসতার কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

শিগগিরই একটি ভিডিও বার্তায় শর্তগুলো বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন ওয়াংচুক।

পাশাপাশি সংযম বজায় রেখে আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের যে কোনো ধরনের সংহিসতা রুখে দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সতর্ক থাকার কথাও।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই সমাজকর্মীকে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলার অনুরোধ জানিয়ে তার সুস্বাস্থ্য কামনা করেছেন।

এক্সে এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমি সোনমজিকে অনুরোধ করছি তিনি যেন ডাক্তারদের পরামর্শ মেনে চলেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আগের ওজন ফিরে পান। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি সোনমজি যেন সুস্থ থাকেন।”

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে এবং শুক্রবার এ বিষয়ে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রশ্নফাঁস-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এদিন একটি ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা দেয় দিল্লি হাই কোর্ট।

ওয়াংচুক অনশন ভাঙায় ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ‘স্বস্তিবোধ করছেন’ করছেন বলে জানিয়েছেন; এ জন্য তিনি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

ওয়াংচুকের অটুট মনোবল ও সমর্থনে জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, "নিজের জীবন বাজি রেখে আপনি গোটা জাতির বিবেককে জাগিয়ে তুলেছেন। এই দেশের কাছে আপনার জীবন অত্যন্ত মূল্যবান।"

(নিট)-কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ২০ জুন থেকে দিল্লির যন্তরমন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি-সিজেপি।

প্রথম থেকেই তাদের এই আন্দোলনে পাশে থাকার বার্তা দেন ওয়াংচুক। পরে ঘোষণা করেন, কেন্দ্রীয় সরকার যদি ২৭ জুনের মধ্যে কোনও জবাব না-দেয় তবে অনশনে বসবেন তিনি। কেন্দ্রের কাছে প্রত্যাশিত কোনও উত্তর না-মেলায় ২৮ জুন থেকে অনশন শুরু করেছিলেন লাদাখের এই সমাজকর্মী।

হাসপাতালে ভর্তির আগে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি হাই কোর্ট সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছিল। মূলত ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষকে তাকে জোরপূর্বক খাওয়ানোর অনুরোধ জানিয়ে ওই আবেদনটি করা হয়েছিল।

গত বছর লাদাখে এক সহিংস আন্দোলনের সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ওয়াংচুককে অভিযুক্ত করেছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। প্রায় ছয় মাস কারাভোগের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে তিনি মুক্তি পান।

সরকারের তোলা সব অভিযোগ অস্বীকার করে ওয়াংচুক বলেছিলেন, ওই সহিংসতা ছিল মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি স্থানীয় মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

অনশনের তৃতীয় দিনে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াংচুক বলেছিলেন, তার এই অনশন ছয় সপ্তাহ চলবে, যদি না তার আগেই তার মৃত্যু হয়।

তিনি বলেছিলেন, “আশা করি আমাদের এত দূর যেতে হবে না। একটি সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের কষ্ট বোঝে এবং আমি আশা করি তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।”

সিজেপির আন্দোলন

সিজেপির বিক্ষোভ ৩৪তম দিনে গড়ালেও সংগঠনটির সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আলোচনা স্থবির হয়ে রয়েছে। তবে এই আন্দোলন উত্তেজনা ছড়িয়েছে গত সোমবার

সেদিন যুব সংগঠন সিজেপি ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি নিয়ে দিল্লিতে পথে নামে। সেদিন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা করে, কাঁদুনে গ্যাস ছোড়ে ও জলকামান ব্যবহার করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রণক্ষেত্রে রূপ নেয় রাজধানী দিল্লি। বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনা ঘটে মুম্বাইয়েও।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশের হামলায় বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এছাড়া সাধারণ পোশাকে থাকা কিছু মানুষও হাতে লাঠি নিয়ে তাদের উপরে চড়াও হয় বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

এর মধ্যে সরকার দাবি করেছে, তারা চারবার সিজেপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পায়নি। আন্দোলন এখনো চলছে। দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে নতুন করে সহিংসতা হয়েছে।

বুধবার রাতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। বৃহস্পতিবারও যন্তর মন্তরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থাকায় ওই এলাকার দেড় কিলোমিটারের ভেতরে মধ্যরাত পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

লাঠিচার্জের প্রতিবাদে একইদিনে বিক্ষোভে নামে কংগ্রসেও। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্নায় বসা বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটক করে টেনে হিঁচড়ে বাসে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। তবে তাদেরকে কয়েকঘন্টা আটকে রাখার পর রাত ৯ টার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।

সোনম ওয়াংচুক,সমাজকর্মী
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত