ঢাকা রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সুদমুক্ত অর্থনীতির গৌরবময় রূপরেখা

সুদমুক্ত অর্থনীতির গৌরবময় রূপরেখা

দারিদ্র্য ও বৈষম্য আজ বিশ্ব অর্থনীতির স্থায়ী বাস্তবতা। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধনী আরও ধনী হচ্ছে, গরিব আরও গরিব হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, এনজিও ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার চেষ্টা করলেও বাস্তবে দেখা যায়, এ ক্ষুদ্র ঋণ অনেক সময় সুদ ও শর্তের বেড়াজালে মানুষকে আরও ঋণগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে ইসলামি অর্থনীতি একটি বিকল্প পথ দেখায়- ‘করজে হাসানা’ অর্থাৎ এমন ঋণ, যা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের কারণে কোনো সুদ, লাভ বা আর্থিক প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা ছাড়াই দেওয়া হয়।

করজে হাসানা কী : ‘করজে হাসানা’ আরবি শব্দ। করজ অর্থ ঋণ, আর হাসানা অর্থ উত্তম, কল্যাণকর, সুন্দর। অতএব, ‘করজে হাসানা’ অর্থ ‘উত্তম বা কল্যাণকর ঋণ’। অর্থাৎ এমন ঋণ, যা কাউকে সাহায্যের উদ্দেশে, নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, কোনো প্রকার সুদ বা লাভের প্রত্যাশা ছাড়াই প্রদান করা হয়। ইসলামি পরিভাষায়- যে ঋণ দেওয়া হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে, যাতে ঋণগ্রহীতা প্রয়োজন মিটিয়ে সময়মতো মূলধন ফেরৎ দেয়, কিন্তু ঋণদাতা তার বিনিময়ে কোনো পার্থিব লাভ বা সুদের প্রত্যাশা করে না, সেটিই করজে হাসানা।

কোরআন ও সুন্নাহে করজে হাসানা : কোরআন ও হাদিসে করজে হাসানা শব্দটি বহুবার এসেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কে আছে এমন, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, তাহলে আল্লাহ তা তার জন্য বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। আল্লাহই সংকুচিত করেন ও প্রশস্ত করেন। তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তন করবে।’ (সুরা বাকারা : ২৪৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে মুসলমান অন্য মুসলমানকে দু-বার ঋণ দেয়, তার প্রতিদান একবার সদকা করার সমান।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪৩০)। আয়াত ও হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, করজে হাসানা বলতে বোঝানো হয়েছে এমন অর্থনৈতিক লেনদেন, যা মানুষের কল্যাণের জন্য সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে করা হয় এবং এটি একটি ইবাদত বা সওয়াবের কাজ।

করজে হাসানার বৈশিষ্ট্য : করজে হাসানা এমন এক অর্থনৈতিক অনুশীলন, যা মানবিক সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার ও আখেরাতমুখী চেতনার সমন্বয় ঘটায়। এর মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

লাভণ্ডলোভ মুক্ত : করজে হাসানা কোনো প্রকার সুদ, মুনাফা বা ব্যবসায়িক উদ্দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে সমাজকল্যাণ নির্ভর মানবিক উদ্যোগ।

সহানুভূতি ও দানশীলতার প্রকাশ : এটি শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন নয়; বরং এক ধরনের সামাজিক ইবাদত, যেখানে দাতা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

মূলধন ফেরৎযোগ্য : করজে হাসানা দান নয়, বরং ফেরৎযোগ্য সহানুভূতিশীল ঋণ। এতে মূলধন ফেরৎ আসে, যা পুনরায় অন্য দরিদ্রের উপকারে ব্যবহার করা যায়।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম : এর প্রকৃত লক্ষ্য আখেরাতের সওয়াব ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। দাতা এখানে লাভে নয়, বরং পরকালের সফলতার বিনিয়োগ করে থাকেন।

ইসলামি অর্থনীতিতে করজে হাসানার স্থান : ইসলামি অর্থনীতির মৌলিক লক্ষ্য শুধু মুনাফা অর্জন নয়, বরং সমাজে ন্যায়, দয়া ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। করজে হাসানা সেই লক্ষ্যের বাস্তব প্রতিফলন। এটি হলো-

ইসলামি অর্থনীতির তিন ভিত্তি : ইসলামি অর্থনীতি মূলত তিনটি মৌলিক স্তম্ভে প্রতিষ্ঠিত- জাকাত, সদকা ও করজে হাসানা। এ তিনটি মাধ্যম সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন, পারস্পরিক সহায়তা ও ন্যায়ের অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলে।

অনুদান নয়, আস্থার ঘূর্ণায়মান ব্যবস্থা : জাকাত ও সদকা একমুখী অনুদানভিত্তিক; যেখানে দাতা দেয়, কিন্তু ফেরৎ আশা করে না। বিপরীতে করজে হাসানা একটি পারস্পরিক আস্থাভিত্তিক ঘূর্ণায়মান সহায়তা ব্যবস্থা, যেখানে সহৃদয় ব্যক্তি প্রয়োজনীয়কে সুদবিহীন ঋণ প্রদান করেন এবং তা ফেরৎ এলে অন্যের সহায়তায় পুনরায় ব্যবহার করা হয়।

মানবিক সংহতি ও দারিদ্র্য বিমোচন : করজে হাসানা শুধু দারিদ্র্য দূরীকরণেই নয়, বরং সমাজে সহযোগিতা, আস্থা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক সংহতি সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি একটি নৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা; যেখানে লাভ নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পারস্পরিক কল্যাণই মূল উদ্দেশ্য।

করজে হাসানা ও সামাজিক পুনর্গঠন-

আখেরাতনির্ভর অর্থনৈতিক মনোভাব : করজে হাসানা মানুষকে শেখায়- সম্পদের মালিক আল্লাহ, আমরা শুধু আমানতদার। তাই দান বা ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে সম্পদ ক্ষয় হয় না; বরং আল্লাহর পথে ব্যয় করলে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

সামাজিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি : যখন সমাজে একে অপরকে সুদবিহীন সাহায্য করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তখন তা সমাজে আস্থা, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি ফিরিয়ে আনে।

সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি : করজে হাসানা শুধু দান নয়; এটি সুদমুক্ত অর্থনীতির প্রাথমিক ধাপ। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইসলামি ব্যাংকিং ও জাকাতভিত্তিক সামাজিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনা : করজে হাসানা একটি নৈতিক অর্থনৈতিক আন্দোলন, যা সমাজে সম্পদ ও আস্থার পুনর্বণ্টন ঘটায়। এটি দারিদ্র বিমোচনের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ত্যাগ, ঈমান ও দায়িত্ববোধের চর্চা ঘটায়। যদি ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করজে হাসানাকে উৎসাহিত করা যায়, তাহলে এটি হবে ইসলামি অর্থনৈতিক জাগরণের এক নতুন সূচনা।

সমকালে করজে হাসানার প্রয়োজনীয়তা : আজকের বিশ্ব অর্থনীতি সুদ, মুদ্রাস্ফীতি, ঋণজাল ও বৈষম্যের গভীর সংকটে নিমজ্জিত। ধনীরা ক্রমে আরও ধনী হচ্ছে, গরিবেরা পড়ছে দারিদ্রের চক্রে। বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও ক্ষুদ্র ঋণের নামে চক্রবৃদ্ধি সুদের শিকলে বন্দি হয়ে পড়েছে। এ বাস্তবতায় করজে হাসানা মডেল শুধু একটি অর্থনৈতিক বিকল্প নয়, বরং মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পথনকশা।

কেন করজে হাসানা প্রয়োজন : সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা ধনীদের শোষণ থেকে গরিবদের রক্ষা করে। করজে হাসানার মাধ্যমে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত হয় এবং সমাজে ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। করজে হাসানা দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা ও মানবিক বন্ধন সৃষ্টি করে। এখানে উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি, লাভের হিসাব নয়। এ ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটে; যা একটি টেকসই ও নৈতিক অর্থনীতি গঠনে সহায়ক। করজে হাসানা ইসলামি অর্থনৈতিক মূল্যবোধের বাস্তব অনুশীলন। এটি শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিকে সমাজে কার্যকরভাবে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার মাধ্যম।

করজে হাসানার আধুনিক প্রয়োগের মডেল : বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় করজে হাসানা কার্যকর করতে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়। নিচে কয়েকটি বাস্তবায়নযোগ্য মডেল তুলে ধরা হলো-

মসজিদভিত্তিক করজে হাসানা তহবিল : প্রতিটি স্থানীয় মসজিদকে ‘কমিউনিটি ফিন্যান্স হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। নামাজের মুসল্লি ও স্থানীয় দাতাদের স্বেচ্ছা অনুদানে একটি তহবিল গঠন করে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে সুদবিহীন ঋণ প্রদান করা যায়। মসজিদকে শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং অর্থনৈতিক সহমর্মিতার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যার লক্ষ্য হবে।

ইসলামি ব্যাংকভিত্তিক করজে হাসানা ফান্ড : ইসলামি ব্যাংকগুলো তাদের ঈঝজ (Corporate Social Responsibilit) বা সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে করজে হাসানা প্রকল্প চালু করতে পারে। ব্যাংকিং খাতে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রয়োগ ও সমাজকল্যাণমূলক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি করা যার লক্ষ্য হবে।

ওয়াকফ-জাকাত সমন্বিত মডেল : জাকাত, সদকা ও ওয়াকফ সম্পদকে একত্রে ব্যবহার করে একটি স্থায়ী করজে হাসানা তহবিল গঠন করা সম্ভব। ইসলামি সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে একীভূত করে দারিদ্র বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যার উদ্দেশ্য হবে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মডেল : অনলাইনভিত্তিক দাতাদের সম্পৃক্ত করে একটি স্বচ্ছ, ট্র্যাকযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক করজে হাসানা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যেতে পারে। এটি মোবাইল ব্যাংকিং অথবা কোনো ডিজিটাল পোর্টাল, সফটওয়্যার বা অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা হবে। প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বব্যাপী অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি যার উদ্দেশ্য হবে।

কার্যকর করজে হাসানা গড়ে তোলার উপাদান : একটি কার্যকর করজে হাসানা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন চারটি মূল উপাদান-

নীতি ও আইন : সরকার ও ইসলামিক ফাইন্যান্স বোর্ডের মাধ্যমে শরিয়াসম্মত কাঠামো তৈরি।

প্রতিষ্ঠান : ইসলামি ব্যাংক, ওয়াকফ বোর্ড ও এনজিওর সমন্বয়।

প্রযুক্তি : ডিজিটাল করজে হাসানা প্ল্যাটফর্ম, স্বচ্ছ ডাটাবেজ ও মোবাইল পেমেন্ট।

সংস্কৃতি : দাওয়াত, শিক্ষা ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে ‘মানবিক অর্থনীতি’র সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

সুদমুক্ত,অর্থনীতি,রূপরেখা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত