ঢাকা রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বাংলাদেশে খাদ্য ও ঔষধে ভেজালের মহোৎসব

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
বাংলাদেশে খাদ্য ও ঔষধে ভেজালের মহোৎসব

একটি জাতির টিকে থাকার জন্য মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য ও ঔষধ অন্যতম। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে এই দুটি জীবন রক্ষাকারী উপাদানে ভেজালের অনুপ্রবেশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং সুপরিকল্পিত গণহত্যার শামিল। জনস্বাস্থ্যের এই চরম সংকটে শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্য আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এক মুমূর্ষু মানবতার আর্তনাদ। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের ওপর যে বিষাক্ত থাবা বিস্তার করেছে, তা হলো খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ঔষধে ভেজাল। জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য মৌলিক উপাদানগুলো যখন মৃত্যুর পরোয়ানায় পরিণত হয়, তখন তা শুধু অপরাধ নয়, বরং মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক চরম নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য হয়। গুঁড়ো দুধ থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল এবং অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ- সবকিছুই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এই নিবন্ধে আমরা বাংলাদেশের এই স্পর্শকাতর ভেজাল পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং এর বহুমুখী প্রভাব নিয়ে একটি গভীর গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছি।

শিশুরা একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ, অথচ বাংলাদেশে গুঁড়ো দুধ ও বেবি সিরিয়ালের মতো খাদ্যে ভেজাল মেশানো হচ্ছে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে। গুঁড়ো দুধে মেলামাইন, ডিটারজেন্ট কিংবা হোয়াইটনার ব্যবহারের ফলে শিশুদের কিডনি বিকল হওয়া থেকে শুরু করে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। যখন একটি শিশু তার জীবনের শুরুতেই পুষ্টির বদলে বিষ গ্রহণ করে, তখন সেই জাতির মেধাবী ও সুস্থ ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এটি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং একটি মানবিক বিপর্যয়।

তরল দুধকে দীর্ঘক্ষণ তাজা রাখতে এবং ঘন দেখাতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, ফরমালিন এবং সোডার মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি দুধে পানি মিশিয়ে তার ঘনত্ব বাড়াতে স্টার্চ বা আটা ব্যবহারের প্রমাণও মিলছে। এই দুধ থেকে তৈরি মিষ্টি ও মিষ্টান্নগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ের বিষাক্ত রং ও কৃত্রিম সুগন্ধি। যখন ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবে পরিবেশিত মিষ্টিতে এই বিষ থাকে, তখন তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত এটিই সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম অধ্যায় যখন জীবন রক্ষাকারী ওষুধেই ভেজাল দেওয়া হয়। অ্যান্টিবায়োটিক থেকে শুরু করে আজ বাংলাদেশে সাধারণ প্যারাসিটামল- সবই আজ নকল ও নিম্নমানের উপাদানে সয়লাব। এই ভেজাল ওষুধের কারণে রোগীর রোগ তো সারে-ই না, বরং হার্ট, কিডনি ও লিভার অকেজো হয়ে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। এটি একটি চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি করে, যেখানে মানুষ ডাক্তার বা হাসপাতালের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের সঙ্গে এমন প্রতারণা কোনোভাবেই মার্জনাযোগ্য নয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে রান্নার স্বাদ ও রং বাড়াতে ব্যবহৃত হলুদ ও মরিচের গুঁড়োয় ইটের গুঁড়ো, কাঠের ধুলো এবং বিষাক্ত টেক্সটাইল ডাই মেশানো হচ্ছে। মশলার মতো প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যে এই ভেজাল আমাদের ঘরোয়া খাদ্যাভ্যাসকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বাস্থ্যের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে।

ফল পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং তাজা রাখার জন্য ফরমালিন ও অন্যান্য প্রিজারভেটিভের ব্যবহার বাংলাদেশে ওপেন সিক্রেট। এটি আমাদের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিদ্যমান নৈতিক স্খলনের এক চরম উদাহরণ, যেখানে দ্রুত মুনাফা লাভের আশায় মানুষের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করা হয়।

মাছকে উজ্জ্বল ও টাটকা দেখাতে ব্যবহৃত হচ্ছে ফরমালিন এবং ক্ষতিকর কীটনাশক। মাছের ফুলকা লাল দেখাতে রং এবং দীর্ঘক্ষণ পচন রোধে ফরমালিনের ব্যবহার সাধারণ ভোক্তাদের প্রতারিত করছে। জলজ প্রোটিনের প্রধান উৎস যখন বিষে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা একটি অপুষ্টিজনিত দুর্বল সমাজ তৈরি করছে। সয়াবিন ও সরিষার তেলের সঙ্গে সস্তা ও নিম্নমানের পাম অয়েল বা রাইস ব্র?্যান অয়েলের মিশ্রণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এমনকি পোড়া তেলকে কেমিক্যাল দিয়ে পরিষ্কার করে পুনরায় বাজারে ছাড়া হচ্ছে। ভোজ্যতেল আমাদের রান্নার অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর সেখানেই যখন ভেজাল থাকে, তখন প্রতিটি ঘরে ঘরে রোগের বাসা তৈরি হয়। এটি আমাদের খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত।

সাধারণ চালকে ছাঁটাই করে কৃত্রিমভাবে সাদা ও চকচকে (মিনিকেট বা নাজিরশাইল নামে) করার প্রক্রিয়াটি শুধু প্রতারণা নয়, বরং চালের উপরিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও মিনারেল ধ্বংস করার শামিল। চালের এই চাকচিক্য আমাদের সমাজের একটি কৃত্রিম আভিজাত্যের মানসিকতাকে প্রতিফলিত করে, যা স্বাস্থ্যের চেয়ে বাহ্যিক রূপকে প্রাধান্য দেয়।

শিশুদের প্রিয় আইসক্রিম ও বোতলজাত জুসে ফলের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও এতে থাকে উচ্চমাত্রার কৃত্রিম রং, ফ্লেভার এবং প্রিজারভেটিভ। আনন্দের ছলে বিষ গ্রহণের এই সংস্কৃতি একটি জাতিকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত