প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপন। সকালের সংবাদপত্র থেকে শুরু করে ফেসবুকের নিউজফিড, টেলিভিশনের পর্দা কিংবা রাস্তার ধারের বিশালাকার বিলবোর্ড- সর্বত্রই বিজ্ঞাপনের জয়জয়কার। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই শক্তিশালী মাধ্যমগুলোতে বর্তমানে বাংলা ভাষার যে রূপ প্রদর্শিত হচ্ছে, তা বিকৃতি আর অবহেলার এক চরম দৃষ্টান্ত। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত এই দেশে মাতৃভাষার এমন করুণ দশা সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিজ্ঞাপন মানেই সৃজনশীলতা, আর সৃজনশীলতার দোহাই দিয়েই ইদানীং বাংলা ভাষাকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে এফএম রেডিও এবং বিভিন্ন টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে ‘বাংলিশ’ (বাংলা ও ইংরেজির জগাখিচুড়ি) সংস্কৃতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ‘অস্থির অফার’, ‘চিল করো’, ‘জাস্ট ফাটিয়ে দাও’- এজাতীয় অপশব্দ ও অপ্রাসঙ্গিক ইংরেজি শব্দের ব্যবহার এখন নিয়মিত ঘটনা। বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর যুক্তি হলো, তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে হলে তাদের ভাষায় কথা বলতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, তরুণদের ভাষা কি সত্যিই এতটা বিকৃত? নাকি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই তাদের মধ্যে এই বিকৃত ভাষার বীজ বপন করা হচ্ছে?
গণমাধ্যম, বিশেষ করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন পোর্টালগুলোর সংবাদ উপস্থাপনা ও নাটক-সিনেমাতেও ভাষার বিকৃতি প্রকট। নাটকের সংলাপে আঞ্চলিকতার নামে এমন সব কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পরিবারের সবাই মিলে দেখার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংবাদের শিরোনামে চমক সৃষ্টি করতে গিয়ে ভুল বানান ও ব্যাকরণহীন বাক্য গঠন করা হচ্ছে। এছাড়া বিদেশি উচ্চারণের আদলে বাংলা বলার এক অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে রেডিও জকি (আরজে) ও কিছু উপস্থাপকদের মধ্যে, যা বাংলার সহজাত মাধুর্যকে নষ্ট করছে।
রাস্তার ধারের সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড এবং ডিজিটাল ব্যানারগুলো যেন বানান ভুলের প্রদর্শনী। ‘শহীদ’ বানানে হ্রস্ব-ই কারের ভুল, ‘স্মৃতি’ বানানে ভুল- এমনকি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামফলকেও অসংখ্য ভুল বানান চোখে পড়ে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞাপনে ইংরেজি শব্দের আধিক্য কমছে না।
অনেক ক্ষেত্রে বাংলা হরফে ইংরেজি শব্দ লিখে এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি করা হচ্ছে।
ভাষার এই বিকৃতি শুধু ব্যাকরণগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক সংকট। যখন একটি শিশু বড় হওয়ার পথে গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনে নিয়মিত ভুল ও বিকৃত বাংলা দেখে, তখন সে বিভ্রান্ত হয়। তার কাছে প্রমিত বাংলার চেয়ে বিকৃত বা মিশ্র ভাষা বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি হীনম্মন্যতা তৈরি করছে।
মাতৃভাষার এই অবক্ষয় রোধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিজ্ঞাপনে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। কোনো বিজ্ঞাপনে ভাষার অবমাননা বা বিকৃতি ঘটলে তার প্রচার বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য প্রমিত বাংলা উচ্চারণ ও ব্যাকরণ বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সর্বস্তরে এবং বিশেষ করে সাইনবোর্ড-বিলবোর্ডে বাংলার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। প্রতিটি পরিবারে শিশুদের শুদ্ধ বাংলার চর্চায় উৎসাহিত করতে হবে।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ছিল ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। কিন্তু আজ নিজের দেশে, নিজ ভাষায় যখন বিকৃতি দেখি, তখন মনে হয় আমরা যেন ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে বিচ্যুত হচ্ছি। ভাষা কোনো স্থির বিষয় নয়, সময়ের সঙ্গে তা পরিবর্তিত হবে- এটি স্বাভাবিক।
কিন্তু পরিবর্তনের নামে বিকৃতি বা বিদেশি ভাষার অপ্রয়োজনীয় অনুপ্রবেশ কোনোভাবেই কাম্য নয়। গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে মনে রাখতে হবে, তাদের প্রভাব বিশাল।
তাই ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তাদের দায়িত্বও সবচেয়ে বেশি। শুদ্ধ বাংলার চর্চা শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারির আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দিতে হবে বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি শব্দে।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়