ঢাকা রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

নতুন সরকার, নতুন সময় প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ

সাদিয়া সুলতানা রিমি
নতুন সরকার, নতুন সময় প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ আজ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘ অস্থিরতা, গণআন্দোলন ও বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচনের পর দেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় এগোনোর সুযোগ পেয়েছে। এই মুহূর্ত শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক আস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলার সময়। নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), আর তাই দেশের ভবিষ্যৎ পথচলার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তাদের নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা।

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে শুধু সরকার গঠনের ওপর নয়, বরং নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে তার ওপর। এবারের নির্বাচনে সেই বিশ্বাসযোগ্যতার একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। সব প্রত্যাশা পূরণ না হলেও একটি কার্যকর জাতীয় সংসদ গঠনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি দৃঢ় হয়েছে। এই সংসদই হবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান মঞ্চ যেখানে নীতি নির্ধারণ হবে বিতর্ক, মতপার্থক্য ও আলোচনার মাধ্যমে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে তাই প্রথম কাজ হবে সংসদকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদকে নীতিনির্ধারণের প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে পারলে গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা দ্রুত ফিরবে। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্যও সুযোগ তৈরি হয়েছে গঠনমূলক সমালোচনা ও নীতিগত বিতর্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও পরিণত করার।

এই নির্বাচনের আরেকটি বড় তাৎপর্য হলো রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হওয়া। নির্বাচন একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা দলগুলোকে নিজেদের সংগঠন, নেতৃত্ব ও কর্মসূচি নতুনভাবে সাজাতে উৎসাহিত করবে। অংশগ্রহণ করতে না পারা শক্তিগুলোও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেবে এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ধারা। ফলে রাজনীতি আবার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরেই ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন এখন সময়ের অন্যতম দাবি। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাসযোগ্য স্থানীয় নির্বাচন না হওয়ায় গ্রামীণ সমাজে নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, স্থানীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নাগরিক সেবাগুলো দুর্বল হয়েছে। বিএনপি সরকার যদি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারে, তবে তা জাতীয় উন্নয়নকে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এতে সামাজিক উত্তেজনা কমবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর সংস্কারও জরুরি। একটি পেশাদার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ বাহিনী ছাড়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্ত ভিত্তি পায় না। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন জনগণের আস্থা হারায়, তখন সরকারের জনপ্রিয়তাও দ্রুত কমে যায়। তাই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পুলিশ বাহিনীকে নৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠন করে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। পেশাদারিত্ব ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হলে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বাড়ে এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা কমে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব সংস্থাকে দলীয় প্রভাবের বাইরে রেখে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

এ সময় জাতীয় পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেওয়াও অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিভাজন সমাজে যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ প্রক্রিয়া দরকার। রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় পুনর্মিলন উদ্যোগ নেওয়া গেলে সামাজিক স্থিতিশীলতা দ্রুত ফিরতে পারে। বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন এই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনও এই নতুন সময়ের কেন্দ্রীয় বিষয়। আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এসবই এখন জরুরি। প্রগতিশীল করব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হবে। বিএনপি সরকারের জন্য এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারকে তাই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষায় গুণগত মান উন্নয়ন, দক্ষতাভিত্তিক পাঠক্রম এবং গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি স্বাস্থ্যসেবাকে দরিদ্রমুখী ও সহজলভ্য করা প্রয়োজন। এই খাতগুলোর প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারলে সংস্কার কার্যকর হবে। তবে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ের সহিংসতা ও অস্থিরতা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নারী, সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন জরুরি। অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও কঠোর আইন প্রয়োগ এই তিনের সমন্বয়ই পারে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে।

পরিবর্তনের এই সময়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে রাজনৈতিক পরিপক্বতা। সরকার ও বিরোধী দল যদি সংসদকে কেন্দ্র করে নীতিগত বিতর্ক ও সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, তবে গণতন্ত্রের ভিত আরও শক্ত হবে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা যেন সংঘাত নয় বরং নীতির লড়াই হয় এই চর্চাই দেশকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা দেবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে যে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে হলে ঐক্য, অন্তর্ভুক্তি ও জবাবদিহির পথে এগোতে হবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে তারা কতটা দ্রুত আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে তার ওপর। যদি এই সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে আজকের এই নবযাত্রা শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হয়ে থাকবে না; এটি একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।

সাদিয়া সুলতানা রিমি

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত