
মুসলমানদের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের মহাসম্মেলন হজ। এটি যেমন ইবাদত, তেমনি সামাজিক ও বৈশ্বিক শিক্ষা-সংস্কৃতির সমাহার। এর নিয়মকানুন ও বিধিবিধান সম্পর্কে জানা ও সঠিকভাবে পালন করা জরুরি।
হজ যেভাবে এলো : আল্লাহ কাবাকে নিজের ঘর বলে ঘোষণা করেছেন। কাবার আশপাশের কিছু স্থান ও বিষয়কে নিজস্ব পরিচয়চিহ্ন নির্ধারণ করেছেন। প্রথম মানুষ আদম (আ.)-এর সৃষ্টির দু’হাজার বছর আগে পৃথিবীর প্রথম ঘর কাবা নির্মাণ করা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর কাবা; যা মানুষের জন্য নির্ধারিত। এটি মক্কায় অবস্থিত এবং বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েত ও বরকতময়।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৬)। আদম (আ.) পৃথিবীতে আসার পর আল্লাহর নির্দেশে পুনরায় কাবাঘর নির্মাণ করেন। কাবাকেন্দ্রিক বিভিন্ন ইবাদতের নির্দেশ পান। নুহ (আ.)-এর যুগে মহাপ্লাবনে এ ঘর নিশ্চিহ্ন হয়। আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) ও তার ছেলে ইসমাইল (আ.) কাবাঘর পুনর্র্নিমাণ করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে নির্দেশ দেন, যেন তিনি বিশ্ববাসীকে এ ঘর জেয়ারতের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও। তারা দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে ও সব ধরনের ক্ষীণকায় উটে চড়ে আসবে।’ (সুরা হজ, আয়াত : ২৭)। ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, হজের ঘোষণার নির্দেশ দিলে ইবরাহিম (আ.) বলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি কীভাবে এ আহ্বান পৌঁছাব? আমার কণ্ঠস্বর তো তাদের কাছে পৌঁছাবে না।’ আল্লাহ বলেন, ‘তুমি আহ্বান জানাও, পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।’ ইবরাহিম (আ.) মাকামে ইবরাহিমের পাথর, সাফাপর্বত ও আবু কায়েস পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমাদের প্রতিপালক একটি ঘর নির্ধারণ করেছেন। তোমরা এর হজ কর।’ বলা হয়, পৃথিবীর পাহাড়গুলো তখন নিচু হয়ে যায়। ফলে তার ঘোষণা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। মায়ের গর্ভাশয় ও বাবার মেরুদণ্ডে অবস্থানকারী সব মানুষ শুনতে পায়। কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ হজ করবে, তারা লাব্বাইক বলে সাড়া দেয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)।
প্রাক-ইসলাম ও নবীযুগে হজ : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের আগেও আরবরা হজ পালন করত। তারা হজের মাসগুলো তথা শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজ ও হজ-পরবর্তী শাওয়াল মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ করত না। কাবাঘরকে কেন্দ্র করে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত; হজের বিভিন্ন রীতি পালন করত; যা ইবরাহিম (আ.)-এর দেখানো হজ থেকে ভিন্ন ও বিকৃত ছিল। তারা সাফা-মারওয়া পাহাড়ে ও কাবাঘরে মূর্তি রেখে পূজা করত। উলঙ্গ হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করত। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, আল্লাহ এ উম্মতের ওপর নবম হিজরিতে হজ ফরজ করেন। হজের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু বকর (রা.)-কে দলপতি নিযুক্ত করে হজ পালনে পাঠান। সেবার ৩০০ জন সাহাবি হজ পালন করেন। এ সময় সুরা তাওবা অবতীর্ণ হয়। এতে মুশরিকদের সঙ্গে থাকা শান্তিচুক্তি ভঙ্গের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। নির্দেশ দেওয়া হয়, ‘আজকের পর থেকে মুশরিকরা হারাম শরিফের সীমানায় ঢুকতে পারবে না।’
হজের বিধান : ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম হজ। জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ইহরাম বেঁধে আরাফার মাঠে অবস্থানসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে নির্ধারিত কিছু আমল করে কাবাঘর তাওয়াফ করাকে হজ বলে। কোনো ব্যক্তি যদি কাবাঘরে যাওয়া ও ফিরে আসা পরিমাণ অর্থের মালিক হয়, এ ছাড়া তার মৌলিক খরচ ও পরিবারের ভরণ-পোষণের খরচ থাকে, তার ওপর হজ ফরজ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর জন্য হজ ও ওমরা পালন কর।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৬)। তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর জন্য ওই ঘরের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭)। হজের ফরজ তিনটি, আর ওয়াজিব ছয়টি। এ কাজগুলো ৭ থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে করতে হয়।
হজের যত প্রকার : ১. ইফরাদ : শুধু হজের নিয়তে ইহরাম ধারণ করে ওই ইহরামেই হজের সব আমল সম্পন্ন করা। ইফরাদ হজে কোরবানি করা মুস্তাহাব।
২. তামাত্তু : শুধু ওমরার নিয়তে ইহরাম ধারণ করে ওমরার কাজ শেষ করা। এরপর মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়া। তারপর ওই সফরেই হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধে হজের সব আমল সম্পাদন করা। তামাত্তু হজে কোরবানি করা ওয়াজিব।
৩. কিরান : একসঙ্গে ওমরা ও হজের নিয়তে ইহরাম ধারণ করে একই ইহরামে ওমরা ও হজ পালন করা। কিরান হজেও কোরবানি করা ওয়াজিব।
এ তিন প্রকারের মধ্যে ‘কিরান হজ’ উত্তম। কিন্তু ইহরাম দীর্ঘায়িত হওয়ায় নিষেধাজ্ঞাবলি সঠিকভাবে মেনে চলতে না পারার আশঙ্কা থাকে। তাই তামাত্তু হজ করা ভালো। (ফতোয়ায়ে শামি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৫২৯)।
ইহরাম : হজ ও ওমরার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ইহরাম। ইহরাম হলো হজ ও ওমরার জন্য নির্ধারিত একটি অবস্থা। মিকাত নামক নির্ধারিত স্থানগুলো অতিক্রম করার আগে ইহরামের অবস্থা ধারণ করতে হয়। ইহরামের নির্দিষ্ট পোশাক ও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। ইহরাম মানে কোনো জিনিসকে নিজের ওপর হারাম বা নিষিদ্ধ করে নেওয়া। হজ ও ওমরা পালনকারী ইহরাম বাঁধার মাধ্যমে নিজের ওপর স্ত্রী সহবাস, মাথার চুল, হাতের নখ, গোঁফ, বগল ও নাভির নিচের চুল ইত্যাদি কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার, সেলাইযুক্ত কাপড় পরা এবং শিকার করাসহ কিছু বিষয় হারাম করে নেন; এজন্য একে ইহরাম বলে। ইহরামের পোশাক পরা ইহরাম নয়, বরং নিয়তটাই ইহরাম। বাংলাদেশিদের মিকাত (ইহরাম বাঁধার নির্ধারিত স্থান) ইয়ালামলাম পাহাড়। এখান থেকে হজের নিয়ত করা ফরজ। ঢাকা বিমানবন্দর থেকেও করা যায়। কিন্তু কেউ যদি আগে মদিনায় যান, তাহলে সেখান থেকে মক্কা যাওয়ার পথে ইহরাম বাঁধা উত্তম। বাংলাদেশিরা সাধারণত তামাত্তু হজ করেন, তাই তারা আগে ওমরার নিয়ত করেন। নিয়ত করেই তালবিয়া পড়তে হয়। এটি তিনবার জোরে পড়া সুন্নত। ওমরা পালন শেষে ৮ জিলহজ হারাম শরিফ থেকে আবার যে ইহরাম বাঁধেন, সেটি হজের ইহরাম। আর যারা প্রথমে মক্কা যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা করেন, তারা বিমানে ওঠার আগেই ইহরাম বেঁধে নেন। কারণ, মিকাত কখন পেরোবে, অনেকেই টের পান না।
তালবিয়া : ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা, লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারিকা লাক।’ অর্থ : আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির, আমি হাজির। কোনো শরিক নেই তোমার। আমি হাজির। নিশ্চয় সব প্রশংসা ও নেয়ামত তোমারই। সব সা¤্রাজ্যও তোমার। কোনো শরিক নেই তোমার।
ওমরা : মক্কায় ঢুকে সম্ভব হলে ওমরা শেষ করে নিতে হয়। নইলে হোটেলে জিনিসপত্র রেখে অহেতুক সময় নষ্ট না করে ওমরার জন্য কাবা শরিফে চলে যেতে হয়। ওমরার গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাওয়াফ। এটি ফরজ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১৩৭)। কাবার চারপাশে সাতবার বৃত্তাকারে ঘোরাকে এক তাওয়াফ বলা হয়। প্রথম তিন ঘোরায় বীরত্ব প্রদর্শনে দ্রুত হেঁটে চলতে হয়। যাকে রমল বলে। (সহিহ বোখারি, হাদিস : ১৫০১)। এরপর ইজতিবা করা (ইহরামের কাপড় ডান হাতের নিচে দিয়ে বাঁ কাঁধের ওপর রাখা) জরুরি। পরবর্তী চার তাওয়াফ স্বাভাবিকভাবে শেষ করতে হয়। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৮৭)।
সাঈ : সাঈ মানে দ্রুত হাঁটা। সাফা থেকে শুরু করে মারওয়া পাহাড়ে তা শেষ হয়। সর্বমোট সাতবার দৌড়াতে হয়। এরপর মাথা মুণ্ডন করা ওয়াজিব। হজ শুরু হওয়ার কাছাকাছি সময় হলে চুল খাটো করে ফেলতে হয়। যাতে হজ শেষে আবার মাথা মুণ্ডন করা সম্ভব হয়। এরপর হাজিরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন। ইহরামের সময় নিষিদ্ধ কাজ থেকে অব্যাহতি পান। এ সময় বেশি বেশি ইবাদত করা জরুরি।
হজের মূল কার্যক্রম : ৮ জিলহজ : হজ পালনকারীরা ফজরের পর গোসল করেন। হজের নিয়ত করে দু’রাকাত নামাজ পড়েন। এরপর মিনার দিকে রওনা হন। মিনায় পৌঁছে বিশেষ কোনো কাজ নেই। এখানে অবস্থানের সময় বেশি বেশি ইবাদত, দোয়া-জিকির, কোরআন তেলাওয়াত ও হাদিস অধ্যয়ন করতে হয়।
৯ জিলহজ : সকালের নাশতা সেরে ধীরে-সুস্থে আরাফার দিকে রওনা হন। ইমাম সাহেবের খুতবা শোনেন। মসজিদে নামিরার আশপাশে থাকার চেষ্টা করেন। জোহর ও আসরের নামাজ এক আজানে দুই ইকামতে কসর ও দুই ওয়াক্ত একসঙ্গে আদায় করেন। এখানকার দোয়া কবুল হয়। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কদির’ পড়লে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। মাগরিবের আজানের আগে কেউ বেরোন না। এরূপ করলে দম বা কোরবানি ওয়াজিব হয়।
মুজদালিফায় অবস্থান : মাগরিবের আজানের? পর মুজদালিফার দিকে রওনা হন। পথে মাগরিবের সময় শেষ হয়ে গেলেও নামাজ না পড়ে মুজদালিফায় পৌঁছে পবিত্র হন। এরপর মাগরিব ও ইশার নামাজ কসর পড়েন। সঙ্গে বিতর পূর্ণ আদায় করেন। রাতে সুযোগ হলে অন্যান্য ইবাদত করেন। ৯ জিলহজ রাত ও ১০ জিলহজ সুবহে সাদেকের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মুজদালিফায় অবস্থান করা ওয়াজিব। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যখন তোমরা আরাফা থেকে ফিরবে, তখন মুজদালিফায় আল্লাহকে স্মরণ কর। স্মরণ কর যেভাবে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তো এর আগে পথভ্রষ্ট ছিলে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৮)। মুজদালিফা থেকে ৭০টি খেজুরের বিচি বা তার চেয়ে ছোট ধরনের পাথরখণ্ড সংগ্রহ করে নেন। মিনা থেকেও সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু কখনও কখনও তা কঠিন হয়ে পড়ে।
১০ জিলহজ মিনার কার্যক্রম : এ দিন শুধু বড় জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। এটি ওয়াজিব। কঙ্কর নিক্ষেপ শেষে জামারাকে বাঁপাশে রেখে কেবলামুখী হয়ে দোয়া করেন। এখন আর তালবিয়া পড়ার দরকার নেই। কোরবানির টাকা আগে দিয়ে থাকলে কোরবানি হয়ে গেছে ভেবে মাথা মুণ্ডন করেন। সেক্ষেত্রে হালাল অবস্থায় ফেরা হয়। অর্থাৎ সেলাই করা কাপড়সহ অন্যান্য স্বাভাবিক হালাল কাজগুলো করেন অথবা ১৩ তারিখে তাওয়াফ ও সাঈ সেরে মাথা মুণ্ডন করে হালাল হতে চাইলে তাও সম্ভব। মাথা মুণ্ডন করা ওয়াজিব। এ দিন সম্ভব হলে এখান থেকেই কাবা গিয়ে ফরজ তাওয়াফ ও সাঈ করে মিনায় ফেরেন। সম্ভব না হলে কঙ্কর নিক্ষেপ করে সরাসরি মিনার তাঁবুতে ফেরেন। রাতে মিনায় থাকতে হয়। মিনায় অবস্থানকালীন নামাজগুলো কসর (শুধু ফরজ) পড়তে হয়; কিন্তু একাধিক ওয়াক্ত একসঙ্গে পড়া যায় না।
১১ জিলহজ : এ দিন সূর্য ঢলার পর ২১টি কঙ্কর নিয়ে জামারার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে ছোট জামারাকে সাতটি, মধ্যমকে সাতটি এবং বড়কে সাতটি করে মোট ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। যদি ১০ তারিখে তাওয়াফ ও সাঈ না করে থাকেন, তাহলে এ দিন তাওয়াফ ও সাঈ করেন। নইলে মিনার তাঁবুতে ফিরে আসেন এবং রাতযাপন করেন।
১২ জিলহজ : এ দিন মক্কায় ফেরেন। আগের দিনের মতো এ দিনও ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আগে তাওয়াফ ও সাঈ না করে থাকলে আজ করতে পারেন। এরপর মিনার তাঁবুতে ফিরে আসেন এবং রাতযাপন করেন। সূর্যাস্তের আগে কঙ্কর নিক্ষেপের কাজ শেষ করতে পারলে মক্কায় ফিরে যেতে পারেন। তবে মিনায় রাতযাপন করা সুন্নত।
১৩ জিলহজ : যদি এ দিন মিনায় থাকেন, তাহলে আগের দিনের মতো আজও ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করে মক্কায় ফেরেন। যদি তাওয়াফ ও সাঈ না করে থাকেন, তাহলে আজ তা পালন করতে পারেন। যদি এ দিন মিনায় থাকেন, তাহলে ১৪ তারিখে আবারও ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করে মক্কায় ফিরে আসেন। আগে তাওয়াফ করে থাকলে এখন আর তাওয়াফ ও সাঈ করার দরকার নেই।
বিদায়ি তাওয়াফ : তাওয়াফের নিয়ত করে কাবাঘরের হাজরে আসওয়াদের কোণা থেকে শুরু করে চারপাশে সাতবার ঘোরাকে তাওয়াফ বলা হয়। হাজিরা হজে গিয়েই প্রথমে তাওয়াফ করেন। একে ‘তাওয়াফে কুদুম’ বলে। এটি সুন্নত। কিন্তু যে হাজি তামাত্তু হজ করেন, তিনি যেহেতু ৭ তারিখ দিবাগত রাতে ইহরাম বাঁধেন, তার তাওয়াফে কুদুম নেই। আর বিদায়ি তাওয়াফ মক্কা ছাড়ার আগে করতে হয়। সেক্ষেত্রে সাঈ করা জরুরি নয়। কিন্তু যদি কেউ আগের তাওয়াফ ও সাঈ না করে থাকেন, তাহলে একই নিয়তে তাওয়াফ শেষে সাঈ করে বিদায় নিতে পারেন। বিদায়ি তাওয়াফ করার পরও যদি কেউ মক্কায় একদিন থাকেন, তাহলেও তাকে আবার বিদায়ি তাওয়াফ করতে হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা জেয়ারত : হজের আগে বা পরে অবশ্যই মদিনা মোনাওয়ারা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারক জেয়ারত করতে হয়। কারণ, মক্কার মতো মদিনাও পবিত্র ভূমি। এখানে শুয়ে আছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-সহ তার অসংখ্য সাহাবি। তাই এ ভূমির পবিত্রতা রক্ষা করা দরকার। প্রতিটি পদক্ষেপে এটি স্মরণ রাখা উচিত। মসজিদে নববিতে নামাজ আদায় করা চাই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার এ মসজিদে এক রাকাত নামাজ পড়া মসজিদে হারাম ছাড়া অন্যান্য মসজিদে এক হাজার নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস : ১১৯০)। মসজিদে নববির সামনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারকের ঠিক ডানপাশের কিছু অংশে সাদা রঙের ভিন্ন কার্পেট বিছানো। এ স্থানকে রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতের অংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মিহরাব ও মুসাল্লা অবস্থিত। সাদা-কালো পাথরের এ মিহরাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ পড়তেন। সম্ভব হলে অন্যকে কষ্ট না দিয়ে এখানে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়া ভালো। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা জেয়ারত করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে মনভরে সালাম দেওয়া সওয়াব ও বরকতময় কাজ। এটি মসজিদে নববির ঠিক সামনের বাঁ-দিকে অবস্থিত। বাইরে থেকে যে সবুজ গম্বুজ দেখা যায়, তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা। এখানে শুয়ে আছেন তার প্রিয় দুই সাহাবি আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)। তাদের কবরও জেয়ারত করা চাই।
হজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান : যেসব পবিত্র স্থানে হজের আমল করা হয়, তা খুবই সম্মানের। প্রকৃতপক্ষে এগুলো আল্লাহর নিদর্শন। ইসলামি ইতিহাসের সঙ্গে রয়েছে এগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেসব স্থানের কয়েকটি হলো-
মসজিদুল হারাম : পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান মসজিদুল হারাম। এটি পবিত্র কাবাঘর ঘিরে অবস্থিত। কাবার দিকে মুখ করে মুসলমানরা নামাজে দাঁড়ান। কাবাঘরের চারদিকে অবস্থিত তাওয়াফের স্থানকে ‘মাতাফ’ বা চত্বর বলা হয়। কাবার দক্ষিণ-পূর্বকোণে মাতাফ থেকে দেড় মিটার ওপরে হাজরে আসওয়াদ। হাজরে আসওয়াদ তাওয়াফ শুরুর স্থান। প্রতিবার ঘোরার সময় হাজরে আসওয়াদে চুমু দিতে হয়। ভিড়ের কারণে না পারলে চুমুর ইশারা করলেও চলে। কাবা শরিফের পাশে আছে ক্রিস্টালের বক্স। চারদিকে যার লোহার বেষ্টনী। ভেতরে বর্গাকৃতির একটি পাথর। পাথরটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান। প্রায় এক হাত। এ পাথরটিই মাকামে ইবরাহিম বা ইবরাহিম (আ.)-এর দাঁড়ানোর স্থান। তিনি এর ওপর দাঁড়িয়ে কাবাঘর নির্মাণ করেছেন। ইবরাহিম (আ.)-এর অলৌকিকতার কারণে শক্ত পাথরটি ভিজে তাতে তার পায়ের দাগ বসে যায়। আজও সেই ছাপ রয়েছে। বাইতুল্লাহর উত্তর দিকের ছাদে (হাতিমের মাঝ বরাবর) যে নালা বসানো, তাকে ‘মিজাবে রহমত’ বলা হয়। এ নালা দিয়ে ছাদের বৃষ্টির পানি পড়ে। কাবাঘরের উত্তরে অর্ধবৃত্তাকার উঁচু প্রাচীরে ঘেরা একটি স্থান আছে। যাকে বলা হয় ‘হাতিম’। দুনিয়াতে আল্লাহর যত অনুপম নিদর্শন আছে, এর মধ্যে ‘জমজম কূপ’ অন্যতম। এ কূপের পানি সর্বাধিক স্বচ্ছ, উৎকৃষ্ট, পবিত্র ও বরকতময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জমজমের পানি হলো পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ পানি। এতে রয়েছে তৃপ্তির খাদ্য ও ব্যাধির আরোগ্য।’ (জামে কাবির, হাদিস : ১১০০৪)।
মসজিদে নববি : রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন, তখন সেখানে কোনো মসজিদ ছিল না। ফলে নতুন হিজরতকারীদের মধ্যে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদের শূন্যতা দেখা দিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন; যা মসজিদে নববি হিসেবে পরিচিত। মসজিদে নববি মুসলমান শাসকদের দ্বারা বহুবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে নববির গম্বুজে রঙের আস্তরণ দিয়ে সবুজ বানান ওসমানি সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আলোকিত এ সবুজ গম্বুজটি কোটি কোটি ইমানদারের মাঝে আলোকবর্তিকা ও প্রাণস্পন্দন; যা কেয়ামত পর্যন্ত নবিপ্রেমিকদের অন্তরে ইমানি চেতনা জাগাবে।
সাফা-মারওয়া : সাফা-মারওয়া মক্কায় অবস্থিত প্রসিদ্ধ দুটি পাহাড়। সাফা-মারওয়া, হাজেরা, ইবরাহিম ও শিশু ইসমাইল (আ.)- এ নামগুলো একই সুতোয় গাঁথা। হজ ও ওমরার সঙ্গে পাহাড় দুটির নিবিড় সম্পর্ক। হজ ও ওমরার অংশ হিসেবে দুই পাহাড়ের মাঝে সাতবার আসা-যাওয়া করতে হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন। সুতরাং যারা কাবাঘরে হজ ও ওমরা পালন করে, তাদের এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করায় অসুবিধা নেই। কেউ যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকির কাজ করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তা জানবেন। তার সে আমলের সঠিক মূল্য দেবেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২৮)। একসময় মক্কায় কোনো বসতি ছিল না। চারপাশ ছিল ধূ-ধূ মরু। বালুর এ বিশাল সাগরে কোথাও মানুষের আনাগোনা ছিল না। আল্লাহর নির্দেশে তখন ইবরাহিম (আ.) স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইলকে সেখানে রেখে আসেন।
হাজেরা ইবরাহিম (আ.)-কে বললেন, ‘আপনি আমাদের কার কাছে রেখে যাচ্ছেন?’ ইবরাহিম (আ.) বললেন, ‘আল্লাহর কাছে।’ হাজেরা বললেন, ‘আমি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।’ হাজেরার কাছে অল্প কিছু খাবার ও পানি ছিল। দেখতে দেখতে একসময় তা ফুরিয়ে গেল। চারদিকে ছিল কাঠফাটা রোদ। উত্তপ্ত বালুকণা। এদিকে তৃষ্ণার্ত শিশু ইসমাইল। ব্যাকুল হয়ে পড়েন হাজেরা। ছেলের তেষ্টা মেটাতে দিগি¦দিক ছুটে বেড়ান। একবার সাফা পাহাড়ে চড়েন, আবার সেখান থেকে নেমে আসেন। ফিরে দেখেন কলিজার টুকরো শিশুকে। ঢালুতে এসে ইসমাইল চোখের আড়াল হয়ে যেত। তাই দৌড়ে পর্বত পেরোতেন। চড়তেন মারওয়ায়। এভাবে সাতবার দৌড়ান। আল্লাহর কাছে হাজেরার এ কাজ খুবই পছন্দ হলো। শেষ নবীর উম্মতের জন্য তা অবধারিত করলেন।
আরাফা : মক্কা থেকে ১৫ মাইল পূর্বে তায়েফের পথে অবস্থিত এক মরু ময়দান আরাফা। ময়দানের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত জাবালে রহমত। আরাফা শব্দের অর্থ পরিচিতি। আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) আল্লাহর নির্দেশে জান্নাত থেকে বেরোনোর পর পৃথিবীতে পরস্পরকে খুঁজতে খুঁজতে আরাফায় এসে মিলিত হন। এ কারণে এর নাম আরাফা। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের গোনাহমুক্ত হওয়ার জন্য যেসব মুহূর্ত দিয়েছেন, আরাফার দিন তার অন্যতম। জিলহজ মাসের ৯ তারিখকে আরাফার দিন বলা হয়। আরাফার দিন অত্যন্ত মহিমান্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ। আরাফার ময়দান ক্ষমা পাওয়ার ময়দান হিসেবেও পরিচিত। শূন্য মাথায় সেলাইহীন কাপড় পরা লাখো আল্লাহপ্রেমীর কান্নার শব্দে এ দিন আকাশ-বাতাস প্রতিধ্বনিত হয়। চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে আল্লাহর কাছে কাতর হয়ে দোয়া করেন তারা। দশম হিজরিতে এ ময়দানে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজ উপলক্ষে তার শেষ ভাষণ দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে যা বিদায় হজের ভাষণ হিসেবে পরিচিত। আরাফার ময়দানে অবস্থান করাই হলো হজ। আরাফার দিনটি মূলত হজের দিন। আরাফার দিনে বান্দার দিকে আল্লাহর রহমতের জোয়ার প্রবলবেগে উৎসারিত হয়। এ দিনে অসংখ্য বান্দাকে তিনি ক্ষমা করেন।
মিনা : মক্কা থেকে মিনার দূরত্ব ৮ কিলোমিটার; আর আরাফার ময়দান থেকে মিনা ১৬ কিলোমিটার। হজ সম্পন্ন করতে হাজিদের প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়। ৮ জিলহজ জোহর থেকে আরাফার দিন ফজর পর্যন্ত প্রায় লক্ষাধিক তাঁবুতে মিনায় অবস্থান করেন হাজিরা। মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। এ কাজটি যথাযথভাবে না করতে পারলে বা কোনো কারণে ছুটে গেলে হজ পালনকারীকে কাফফারা হিসেবে কোরবানি দিতে হয়। শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের কাজটি মূলত ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসরণে প্রতীকী আমল হিসেবে করা হয়। ইবরাহিম (আ.) যখন স্বপ্নযোগে তার প্রিয় বস্তু আল্লাহর জন্য কোরবানি করতে আদেশ পান, তখন তিনি কয়েকবার উট কোরবানি করেন। এরপরও তাকে স্বপ্নে কোরবানির আদেশ দেওয়া হয়। তিনি বুঝলেন, তার সন্তান ইসমাইলের কথা বলা হচ্ছে। কারণ, তখন তার কাছে ইসমাইলের চেয়ে প্রিয় অন্য কিছু ছিল না। তিনি ছেলেকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করতে মিনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন।
এ সময় শয়তান তাকে বিপথে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত হয়। সে মিনার তিনটি স্থানে ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-কে কুমন্ত্রণা দিল। তাদের আল্লাহর আদেশ পালন থেকে বিরত রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করল। কুমন্ত্রণার বিপরীতে তিনি সেই তিন স্থান থেকে পাথর নিক্ষেপ করে শয়তানকে বিতাড়িত করেন। এ মিনাপ্রান্তরেই তিনি ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানির জন্য শুইয়েছিলেন। ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত সেই ঘটনাকে চির জাগ্রত রাখার জন্য কঙ্কর নিক্ষেপকে হজের বিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।