
চাকরির সুবাধে খাগড়াছড়ি আছি প্রায় আট মাস হয়ে গেল। এরমধ্যে একদিন সহকর্মী নুরুজ্জমান ও সাজ্জাদকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রিছাং ঝরনার উদ্দেশ্যে। খাগড়াছড়ির বেশ কটি ঝরনা মধ্যে অন্যতম এটি অন্যতম। 'রিসাং' শব্দটি মারমা ভাষার। 'রি' মানে পানি আর 'সাং' মানে লাফিয়ে পড়া; অর্থাৎ উঁচু স্থান থেকে জলরাশির লাফিয়ে পড়া। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী ঝরনাটিকে 'তেরাং তৈকালাই' নামে চেনে। তাদের ভাষায় 'তেরাং' মানে পানি আর 'তৈকালাই' মানে ওপর থেকে পড়া।
গাড়ি থেকে নেমে ঝরনার কাছে যেতে হলে নামতে হবে পাহাড় বেয়ে। চাইলে সরাসরি বাইক নিয়েও যাওয়া যায়। তবে আমরা গিয়েছিলাম পায়ে হেঁটে। হেঁটে গেলে সবুজ পাহাড় ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা আপনাকে নতুন কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। তারপর বিশাল সিঁড়ি—২৫০ ধাপ। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কানে আসে ঝরনার কলতান। সিঁড়ি শেষ না হতেই চোখের সামনে ধরা দেয় ঝরনা।
প্রায় ১৫০ ফুট উঁচু থেকে নিচে আছড়ে পড়ছে ঝরনার জলরাশি। পাহাড়ের ঢালু গড়িয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ। চারদিকে উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়, জুম ঘর, বুনোঝোঁপ, নামহীন রঙিন বুনোফুলের নয়নাভিরাম অফুরন্ত সৌন্দর্য যে কাউকে এক কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যাবে। আর হিমশীতল জলরাশির কাছে গেলে জলের স্নিগ্ধতায় ভরে উঠবে আপনার দেহমন।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে ১১ কিলোমিটার আর মাটিরাঙা উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে খাগড়াছড়ি-ঢাকা মূল সড়ক ছেড়ে ১ কিলোমিটার দক্ষিণে পাহাড়ি প্রকৃতির মাঝে রিছাং ঝরনার অবস্থান। শুধু এটি নয়, ঝরনা অভিমুখে সমগ্র যাত্রা পথটাই দারুণ রোমাঞ্চকর। কাছাকাছি দুটো ঝরনাকে ঘিরে প্রতিদিন বহু সংখ্যক পর্যটক এসে ভিড় জমান এখানে।
ঝর্ণার পাশাপাশি পাহাড়ি প্রকৃতি মনের মাঝে এক অনুপম অনুভূতির সৃষ্টি করে। ইচ্ছে করবে প্রকৃতির মাঝেই কাটিয়ে দিই সারাক্ষণ। ঝরনা ছেড়ে মন চাইবে না ফিরে আসতে কোলাহল মূখর জনারণ্যে। এখানে পাশাপাশি থাকা দুটি ঝরনার মধ্যে পর্যটকদের সুবিধায় ঝরনায় যাওয়ার জন্য পাকা সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। প্রথম ঝরনাটি থেকে প্রায় ২০০ গজ ভেতরে গেলে দেখা মিলবে দ্বিতীয় ঝরনার। আপনি চাইলে জুম ঘরে বসে রিছাং ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। ঝরনায় সিঁড়ি বেয়ে নামার আগে একটি ওয়াচ টাওয়ারেরমতো ক্যাফে দেখতে পাবেন, চাইলে ঐখান থেকে প্রাকৃতির এ দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। এ টাওয়ারে দাঁড়ালে চারপাশের সবুজ পাহাড় ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা আপনাকে নতুন কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে যেকোনো বাসে সরাসরি খাগড়াছড়ি জেলা শহর বা মাটিরাঙা নামতে পারেন। খাগড়াছড়ি শহরের বাস টার্মিনাল থেকে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস কিংবা জিপে করে যেতে হবে ঝরনার কাছে। মোটরসাইকেল সরাসরি ঝরনার সামনে নিয়ে যায়, অন্য গাড়ি নির্দিষ্ট স্থানে পাকিং করে হেটে যাওয়া লাগে।
যেভানে থাকবেন : আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি শহরের প্রবেশমূখে চেঙ্গী নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত পর্যটন মোটেল ছাড়াও জেলা সদরের মিলনপুরে হোটেল গাইরিঙ, অরণ্য বিলাশ ও হিল টাচস ইত্যাদি হোটেল আছে। এ ছাড়া খাগড়াছড়ি শহরে রয়েছে একাধিক হোটেল।