প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ভিক্টর হুগো ফরাসি সাহিত্যক, রাজনীতিবিদ এবং মানবাধিকার কর্মী। তাকে ১৯ শতকের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী রোমান্টিক লেখক বলা হয়ে থাকে। কবিতা দিয়ে সাহিত্য রচনা শুরু। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফ্রান্সের সেরা কবি হিসেবেও গণ্য করা হয়। তার অমর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য লা মিজারেবলস এবং দ্য হাঞ্চব্যাক অব নটর ডেম।
অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফরাসি কবি ভিক্টর হুগো ১৮০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের বেসানকনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রনায়ক, মানবাধিকার কর্মী। ফ্রান্সে রোমান্টিক ধারার সাহিত্যের প্রবক্তাও তিনি। কবিতা তার প্রাথমিক খ্যাতি আনলেও তার উপন্যাস এবং নাটক তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে আসে।
মুক্তিকামী এ লেখক দরিদ্র ও বঞ্চিতদের জন্য সামাজিক সংস্কারের পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি ২৫ বছর বয়সে ফরাসি একাডেমির সদস্য হয়েছিলেন এবং একই সময়ে ফরাসি সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তৃতীয় নেপোলিয়নের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদ করায় তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয় এবং নির্বাসনে কাটাতে হয় জীবনের ২০টি মূল্যবান বছর।
অবশ্য নির্বাসিত জীবনে ভিক্টর হুগো রচনা করেন মূল্যবান সাহিত্য-সম্ভার।
তাকে সাহিত্যে রোমান্টিসিজমের অগ্রপথিক মনে করা হয়। ভিক্টর হুগোর উপন্যাসের মধ্যে লা মিজারেবলস, গুজকস্ট নটরডেম, দ্য টয়েলার্স অব দ্য সি, দ্য ম্যান হু লাফ লোকটি শীর্ষক উপন্যাসগুলো উল্লেখযোগ্য। নির্বাসিত অবস্থায় তিনি নেপোলিয়ন ডি পেটিট এবং হিস্টোরি ডান ক্রাইম বই লিখে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিলেন। তখনকার অন্য তরুণ লেখকদের মত হুগোও রোমান্টিক ধারার লেখক ফ্রান্নকিন রেনে ডি চ্যাটুব্রায়ান্ডের লেখায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৮৭০ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে এলে জাতি তাকে বীরের সম্মানে ভূষিত করে। শুধু একজন সাহিত্যিক হিসেবেই নয়, ফ্রান্সে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় হুগোর ভূমিকা একজন সত্যিকার স্টেটসম্যানের স্বীকৃতি প্রদান করে আন্তর্জাতিকভাবে।
তার কাব্য সঙ্কলন লা-কনটেম্পেশন্স এবং লা লিজেন্ডে ডেস সাইফলস তাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফরাসি কবির স্বীকৃতি পেতে সাহায্য করেছে। যৌবনে রাজতন্ত্রে বিশ্বাস হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি প্রজাতন্ত্রের একজন কট্টর সমর্থকে পরিণত হন। তৎকালীন হালের রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিষয়বস্তু নিখুঁতভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে তার লেখনিতে।
১৯ শতকের সব চাইতে প্রভাবশালী রোমান্টিক লেখক বলা হয় ভিক্টর হুগোকে। ফ্রান্সে হুগোর সাহিত্যিক মূল্যায়ন কবিতা এবং নাটককেন্দ্রিক। অনেক ফ্রান্সবাসীর মতে তিনিই ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ কবি। লা মিজারেবল এবং নটর ডেম ডি প্যারিস তার রচিত দুটি বিখ্যাত উপন্যাস। যৌবনে হুগো উদার রক্ষণশীল থাকলেও কয়েক দশকের ব্যবধানে প্রচণ্ড রকমের বাম ঘারানার রাজনীতিতে প্রভাবিত হন। তিনি প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের সমর্থক ছিলেন। রাজা তৃতীয় নেপোলিয়নের সময় হুগো বিভিন্ন সময় ব্রাসেলস, জার্সি এবং গুয়ের্নসিতে নির্বাসিত হয়েছিলেন।
হুগো শৈশবেই একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। তার জন্মগ্রহণের ২ মাস পর নেপোলিয়ন ফরাসি সম্রাট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার ১৩তম জন্মদিনে বরবন রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
তাকে নিয়ে বেশ কিছু হাস্য-রসাত্মক গল্পও প্রচলিত আছে। এর মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাতটি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট প্রশ্ন ও ছোট উত্তরকে নিয়ে!
প্রশ্ন : ‘?’ উত্তর : ‘!’ প্রশ্নকর্তা ছিলেন ভিক্টর হুগো এবং প্রশ্নের উত্তরদাতা ছিলেন ভিক্টর হুগোর বইয়ের প্রকাশক। ‘লা মিজারেবল’ উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়ার পর ভিক্টর হুগো বেড়াতে চলে যান। অবকাশ যাপনের মধ্যেই তার ইচ্ছা হলো বইয়ের বিক্রি কেমন হচ্ছে তার খবর নেওয়ার। তাই তিনি মজা করে প্রকাশককে লিখলেন ‘?’ মানে বইয়ের কাটতি কেম যাচ্ছে। প্রকাশকও মজা করে উত্তর দিলেন ‘!’ মানে আশ্চর্য রকমের ভালো।
এছাড়া তাকে নিয়ে প্রচলিত আরেকটি বিখ্যাত গল্প হলো, একবার ট্রেনে করে এক শহরে যাচ্ছিলেন ভিক্টর হুগো। সেখানে এক জায়গায় তার বক্তৃতা দেওয়ার কথা। নির্দিষ্ট স্টেশনে ট্রেন থামলে দেখা গেল মহাহুলুস্থূল অবস্থা। লালগালিচা পাতা।
লোকজনের হাতে ফুলের তোড়া। হুগো বুঝতে পারলেন- এখানে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি আসছেন। তাই তিনি ঝামেলা এড়িয়ে ট্রেনের পেছন দিক দিয়ে নেমে চলে গেলেন স্টেশনের বাইরে। ঠিক সেই সময় দুই-তিনজন ভক্ত তাকে ঘিরে ধরে বলল, ‘আরে আপনি এখানে! আপনার জন্য তো সবাই স্টেশনে অপেক্ষা করছে।’
বিখ্যাত ফরাসি কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, কূটনীতিক, মানবাধিকার কর্মী এবং ফ্রান্সের রোমান্টিক আন্দোলনের প্রবক্তা ভিক্টর হুগো ১৮৮৫ সালের এই দিনে প্যারিসে পরলোকগমন করেন।