প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২২ আগস্ট, ২০২৬
কবিতা : শিল্পের শ্রেষ্ঠ প্রকাশরীতি
কবিতা সুন্দর সুগন্ধিময় ফুল। একটি গোলাপের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ মনকে মুগ্ধ করে তোলে তেমনি একটি ভালো কবিতা পাঠের মাধ্যমেও মনের ভেতর ভালো লাগা জাগতে থাকে। কবিতা মূলত কল্পনায় নিয়ে ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করার বিষয়। কবি হিসেবে এবং পাঠক হিসেবেও।
কবিতা মূলত ক্ষুদ্র বটবৃক্ষের বীজের মতো। যার ভেতর সম্ভাবনা, বিস্তৃতি এবং অন্যরকম এক জগৎ থাকে। যা এক দেখায় বোঝা অসম্ভব। যে কথা পড়লে মনের ভেতর ভাব আসে, কল্পনা আসে, আবেগ জন্মায়, নিজের মত করে চিত্র আঁকা যায়, অধরাকে ছোঁয়া যায়; তাই কবিতা। কবিতা প্রিয়তমার ঠোঁট, চোখ, বুক, নিতম্ব, নিঃশ্বাস, দীর্ঘশ্বাস। অর্থাৎ যা কিছু সুন্দর এবং আকর্ষণ করে তাই কবিতা। যাকে বারবার দেখা যায়, প্রতিবারই নতুন লাগে, আগের থেকে আরও অর্থবোধক মনে হয়।
সমকালীন কবিতায় ভাঙা বাক্য, বিচ্ছিন্ন চিত্র, অসংলগ্নতা, ভাষার অস্বাভাবিক ব্যবহার- এসবও সচেতন শিল্পকৌশল হতে পারে। এলোমেলো মনে হলেও তার অন্তর্গত শিল্পবোধ ও উদ্দেশ্য থাকতে হয়। সকল নদীর যেমন লক্ষ্য থাকে সাগরের দিকে, তেমনি একটি কবিতার সবগুলো পঙক্তির স্রোত থাকবে একটি অন্তর্গত সত্তার দিকে। হাড়ের ভেতর যেমন একটা মজ্জা থাকে ঠিক কবিতার ভেতরও একটা মজ্জা থাকে। একজন কবিকে তা নির্মাণ করতে হয় এবং একজন পাঠককে কৌতূহলে সে আবরণ ভেঙে ভেতরের স্বাদ নিতে হয়।
কবিতা মূলত শব্দ দিয়ে ভাবের শৈল্পিক ব্যঞ্জনা এবং এযাবতকালেও সর্বোত্তম প্রকাশরীতি। ভাবের জগতে যে যতটা ডুবতে পারে সে তত বেশি সুন্দর কবিতা আবিষ্কার করতে পারে। আজ যা আধুনিক, কাল তা পুরাতন। শিল্পে মূলত আধুনিক বা পুরাতন বলে কিছু আছে বলে, মনে হয় না। যাকে আমরা বলতে পারি, শিল্পের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশরীতি।
ঠোঁট
চোখগুলো খুন করে ফিরে যাই খোলা বারান্দায়।
তখন ভেতরের চোখ হেসে ওঠে।
ভিখারি মনের বারংবার নিষেধ মাথায় নিয়ে,
সে আমাকে জীবনের উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো দেখায়।
সুধাই- নূহের প্লাবনে নিভে গেছে সুখের প্রদীপ!
হাত জোড়া কথা শোনে না, পা জোড়াও না-
আজকাল কানগুলোও বড্ড আনাড়ি।
বয়সের আগে বয়স এসে দাঁড়িয়ে আছে,
মরণের আগে যেমন মরণ আসে।
অকেজো জীবনে মৃত্যু বেচে দিয়েছিলাম-
প্রেমের দামে; তোমার ঠোঁটের কাছে
যদি শেষবার ফিরে আসো...
অন্তত একবার- অমন ঠোঁটে
ছুঁয়ে দিও সেই মৃত্যু।
দুটি আকাশের নিভৃত আলাপ
পাশাপাশি দুটি আকাশ শুয়ে আছে।
একটির বর্ণ নীল এবং অন্যটির গাঢ় লাল।
লাল বলল, ‘তুমি নীল হলে কেন?’
নীল করুণ বিধবার স্বরে, আনত চোখে উত্তর দিলো,
‘আঘাত পেলে মানুষের সাদা চামড়াও নীল হয়ে যায়।’
ফের নীল জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এত গাঢ় লাল হলে কেন?’
উত্তরে লাল তীব্র ক্ষোভে আরো লাল হলো,
লাঙ্গলের জ্বলন্ত ফলার মতো,
এবং বলল, ‘সাদা মানুষের গলা কেটে দিলেও রক্তস্রোত গাঢ় লাল হয়।’
আটক রজনী
আটকে আছি; দুঃস্বপ্নের ধূম্ররাশিতে।
নির্বাক আর্তনাদগুলোর গলা থেকে
পিনকি দিয়ে তাজা রক্তের লহর
উজান বেয়ে কতটুকু সাঁতরাতে পারি!
এক পৃথিবীর ক্লান্তিকে বুকের একপাশে
ঘুম পাড়াতে চেয়েছি কত অজস্র রজনী।
রজনী ফুরায়, ক্লান্তি ফুরায় না...
সংসার জীবনের আয়োজনে আঁতকে উঠি বারবার।
তোমাদের আলো ঝলমলে রঙছটা জানালায়
নির্মম নক্ষত্রের তীর্যক দৃষ্টিতে ভেদ হয়ে যায়
ভেতরের জমে থাকা কোমল রাজহংসগুলো।
বনের সুন্দরী ডাহুক জানে গভীরের চিৎকার।
কতটা ক্ষত হলে নিস্তব্ধ আঁধার কাঁপে...
রাত এতটা নীরব হয় কেন, বলো তো!
পৃথিবীর মৃত্যু হলে কখনো কি মন খারাপ করবে কক্ষপথ!
আমি তো কতবার মৃত্যুর সাথে বসে চা-পান খেলাম,
খুব গল্প করলাম,
কিন্তু সে একবারও ভালোবেসে ছুঁয়ে দেখলো না;
ভয় দেখালো না...
আমি তাকে অনুভব করি জেনে দূরে সরে যায়...