ঢাকা শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়ার কবিতা

সময়ের ক্ষত ও মানবতার স্বর

জাহিদ নয়ন
সময়ের ক্ষত ও মানবতার স্বর

কবিতা যখন শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির আয়না না হয়ে সময়, সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের অন্তর্গত সংকটের এক বহুস্বরিক দলিল হয়ে ওঠে, তখন কবির ব্যক্তিসত্তা ধীরে ধীরে সমষ্টির চেতনার সঙ্গে মিশে যায়। কবি পীযূষ কান্তি বড়ুয়ার কবিতার দিকে তাকালে এ প্রবণতাটিই প্রথমে চোখে পড়ে। তার কবিতায় ব্যক্তিমানুষ যেমন আছে, তেমনি আছে বৃহত্তর মানবসমাজ; আছে প্রেম, স্মৃতি, পিতৃ-মাতৃস্নেহ, প্রকৃতি ও নিঃসঙ্গতা, পাশাপাশি আছে সভ্যতার সংকট, রাজনৈতিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির অন্ধ মোহ, পরিবেশবিপর্যয়, নারী নির্যাতন ও ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া। ফলে তার কবিতাকে একক কোনো বিষয় বা প্রবণতার মধ্যে আবদ্ধ করা কঠিন। বরং বিভিন্ন বিষয় ও অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তার কবিতা একটি কেন্দ্রীয় মানবিক প্রশ্নের দিকে অগ্রসর হয়— এসভ্যতা মানুষকে কতটা মানুষ করে তুলতে পেরেছে?

বহুমাত্রিক লেখক ও কবি পীযূষ কান্তি বড়ুয়ার অন্যতম শক্তি তার সময়বোধ। সময় তার কাছে কেবল ঘড়ির কাঁটায় অতিক্রান্ত কোনো নিরপেক্ষ প্রবাহ নয়; বরং এক সক্রিয়, পরিবর্তনশীল, কখনো প্রতারক, কখনো মুক্তিকামী শক্তি। তাই তার কল্পনায় 'সময় নিজেই এক ধূর্ত গিরগিটি'— এ রূপকটি নিছক অলংকার নয়, তার সময়-দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক। সময় রং বদলায়, মানুষের জীবনকে নতুন অর্থ দেয়, আবার সেই অর্থকে প্রতারণায় পরিণতও করে। 'জীবনের নানা রঙ নিজের নয়, সময়ের আরোপিত'— এ উপলব্ধির মধ্যে ব্যক্তি-অস্তিত্বের ওপর ইতিহাস, সমাজ ও পরিস্থিতির প্রভাব সম্পর্কে একটি গভীর দার্শনিক বোধ কাজ করে। সময় কখনও কারও জন্য রঙিন গোধূলি, কখনও কারও জন্য চৌদ্দ শিকের যাবজ্জীবন। অর্থাৎ একই সময় ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করে। এ বৈপরীত্যই তার সময়চেতনার প্রাণ।

তবে সময় তার কবিতায় শুধু প্রতারণার কারিগর নয়; কোনো কোনো মুহূর্তে সে হয়ে ওঠে মুক্তির অভিযাত্রী। কৃষক, জেলে, কামার, মাঝি, রাখাল, গ্রাম, নদী, মাঠ, ঘাস, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া— বাংলার জনজীবনের এসব উপাদানকে তিনি সময়ের এক বিশাল সমরযাত্রায় যুক্ত করেছেন। 'জনমতের জোয়ারে সময়ের পালে লাগে হাওয়া'— এ পঙ্?ক্তি সেই রূপান্তরের তাৎপর্য বহন করে। ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, বিচ্ছিন্নতা থেকে সংহতি, নীরবতা থেকে উচ্চারণ— এ গতি তার কবিতায় মুক্তির রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। শেষ পর্যন্ত 'আর আমাদের দাবায়া রাখতে পারবা না'— এ ঐতিহাসিক উচ্চারণ যখন কবিতার শরীরে প্রবেশ করে, তখন তা একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক স্মৃতিকে অতিক্রম করে অবদমিত মানুষের চিরন্তন মুক্তিকামিতার ভাষা হয়ে ওঠে। এ সময়বোধের সঙ্গে তার ইতিহাসচেতনারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ইতিহাস তার কবিতায় কোনো জাদুঘরে সংরক্ষিত মৃত অতীত নয়; বরং বর্তমানের শরীরে সক্রিয় এক স্মৃতি। সীতা-রাম, শাক্যমুনি, নূহ, কালিদাস, মেঘদূত—পুরাণ ও ইতিহাসের বহুবিধ অনুষঙ্গ তিনি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। '১৪ বছর বনবাসে যার আশ্রয়ে ছিল সীতা-রাম/গৃহত্যাগী শাক্যমুনি যার বুকে বসে পেলো আর্যসত্য'— এ পঙক্তিগুলো পৃথিবীকে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতির ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই পৃথিবী যখন আধুনিক মানুষের লোভ, প্রযুক্তির উন্মত্ততা ও ধ্বংসাত্মক সভ্যতার চাপে বিপন্ন হয়, তখন পুরাণের স্মৃতি বর্তমানের বিরুদ্ধে নৈতিক সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

প্রকৃতি তার কবিতায় এ নৈতিকতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। তার প্রকৃতি কোনো নির্লিপ্ত সৌন্দর্যের দৃশ্যপট নয়; বরং আহত, অসুস্থ এবং আর্ত এক জীবন্ত সত্তা। পৃথিবী কখনো মায়াবতী নারী, কখনো মা, কখনো নির্যাতিতা হরিণী।

'হিংসায় উন্মত্ত সভ্যতা তাকে বিক্ষত করে অহর্নিশ'— এ পঙ্?ক্তিতে পরিবেশবিপর্যয় একটি বৃহত্তর নৈতিক বিপর্যয়ের প্রতীকে পরিণত হয়। 'শীতলপাটি পৃথিবী আজ তপ্ত কড়াই'— এ চিত্রকল্পে জলবায়ু সংকটের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা কাব্যিক আতঙ্কে রূপান্তরিত হয়েছে। আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, পৃথিবীর অসুস্থতা তার কাছে মানুষেরই অসুস্থতা। গাছের মৃত্যু, বরফের গলন, অরণ্যের বিলুপ্তি কিংবা উষ্ণতার বৃদ্ধি আসলে মানবসভ্যতার আত্মঘাতী যাত্রার লক্ষণ।

এখানেই পীযূষ কান্তি বড়ুয়া'র কবিতা পরিবেশ-সচেতনতা থেকে সভ্যতা-সমালোচনায় উত্তীর্ণ হয়। তিনি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিরোধী নন; বরং প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের নৈতিক বিকাশের অসামঞ্জস্যকে প্রশ্ন করেন। একদিকে 'মুঠোফোন হাতে আটলান্টিক পেরুনো উড়োজাহাজ', অন্যদিকে দাঁতের ব্যথা সারাতে তাবিজ— এই পাশাপাশি স্থাপন আসলে আধুনিক মানুষের দ্বৈত মানসিকতার চিত্র। মানুষ মহাকাশের রহস্য অনুসন্ধান করছে, অথচ নিজের অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে পারছে না। প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু মানুষের অন্তর্গত দূরত্ব কি কমেছে? কবিতা এ প্রশ্নই উত্থাপন করে। তার আধুনিকতা তাই প্রযুক্তিকেন্দ্রিক নয়, মানবিকতাকেন্দ্রিক।

সামাজিক অবক্ষয়ের প্রসঙ্গে তার কাব্যভাষা আরও তীক্ষ্ণ ও ব্যঙ্গাত্মক। তিনি এমন এক সমাজকে দেখেন যেখানে অপরাধী নৈতিকতার ভাষায় কথা বলে, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সমাজসেবার মুখোশ পরে এবং অর্থলোভী মানুষ ধর্মের পুরোহিত সেজে বসে। 'মদের ব্যবসায়ীর চেয়ে ধার্মিক এ যুগে দ্বিতীয়টি নেই'—এ পঙ?ক্তি সরাসরি আঘাত করে সামাজিক ভণ্ডামির কেন্দ্রে। আবার 'ঘুষে বালিশ কিনে ঘুমোনো মানুষটিও এতিমের ত্রাতা'—এখানে ব্যঙ্গ তার সর্বোচ্চ তীক্ষ্ণতায় পৌঁছে যায়। কবি কেবল দুর্নীতিকে নিন্দা করেন না; বরং দেখান কীভাবে দুর্নীতি ও ভণ্ডামি একসঙ্গে একটি বিকৃত নৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করে।

'অজগরের দেহ টাকার নোটের খোলসে গড়া'—এ চিত্রকল্প তার রাজনৈতিক কাব্যচিন্তার একটি স্মরণযোগ্য উদাহরণ। অর্থ এখানে শুধু বিনিময়ের মাধ্যম নয়; সে হয়ে ওঠে এক সর্বগ্রাসী শক্তি। অজগর যেমন শিকারকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে, তেমনি অর্থ ও ক্ষমতার লোভ মানুষের নৈতিকতা, রাষ্ট্রের চরিত্র এবং সামাজিক সম্পর্ককে গ্রাস করে। 'রক্তার্জিত মানচিত্র' যখন 'পিঁপড়ের আহারের পাহাড়ে' পরিণত হয়, তখন মানচিত্রের ভৌগোলিক অর্থও অতিক্রম করে তা জাতিসত্তা, আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার বিপন্নতার প্রতীকে পরিণত হয়।

সবশেষে বলা যায়, পীযূষ কান্তি বড়ুয়ার কবিতা মূলত মানুষের প্রতি এক গভীর দায়বোধের কবিতা। তার ক্ষোভের কেন্দ্রে যেমন মানুষ, তার প্রেমের কেন্দ্রেও মানুষ; তার প্রকৃতিচিন্তা মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে, তার ইতিহাসচেতনা মানুষের মুক্তি নিয়ে, তার পিতৃ-মাতৃস্মৃতি মানুষের অস্তিত্বের শেকড় নিয়ে। পৃথিবী যখন 'তপ্ত কড়াই', সময় যখন 'ধূর্ত গিরগিটি', মানচিত্র যখন অজগরের গ্রাসে বিপন্ন, আর সমাজ যখন ভণ্ডামির বহুস্তরীয় মুখোশে আবৃত, তখনও তার কবিতা সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়ে না। কারণ তার গভীরে রয়েছে বর্ষার প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, নদীর স্রোত, শৈশবের ঈশ্বর, বাবার অনির্বাণ স্নিগ্ধতা এবং মায়ের মুখ। এই দ্বৈততার মধ্যেই তাঁর কবিতার প্রকৃত সৌন্দর্য—ধ্বংসের ভিতরেও জীবনের সম্ভাবনাকে খুঁজে নেওয়া।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত