ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আল মাহমুদ

গ্রামীণ জীবনধারার নির্বিঘ্ন সততার গর্ব

নীহার মোশারফ
গ্রামীণ জীবনধারার নির্বিঘ্ন সততার গর্ব

গ্রাম বাংলার সঙ্গে আল মাহমুদের নিবিড় আত্মীয়তা ছিল। তিনি মানুষ ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন সৃষ্টির রহস্যকে। প্রকৃতির মতোই তিনি ডালপালা বিস্তার করেছিলেন তৃতীয় নয়ন দিয়ে— অপার সৌন্দর্য উপভোগ করবেন বলে। প্রকৃতি ও গ্রাম-বাংলার সঙ্গে কবিতার যে মিল তা তিনি 'লোক লোকান্তর'-এ পাঠকদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। 'সমুদ্র-নিষাদ' নামক কবিতায় তিনি লিখেছেন—

সে তো বলেছিলো, নীল পোশাকটি ছাড়ো/ দু'চোখে তোমার সাগরের ফেনা মাখা,/

আকাশের রং হৃদয়ে কি এতো গাঢ়?/ গাঙচিল-মন ঢেউয়ে ঢেউয়ে মেলে পাখা!

আল মাহমুদ পল্লিপ্রকৃতি, গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন থেকে কবিতার জন্য শব্দ ও লোকজ উপাদান সংগ্রহ করেছেন। একটি আঞ্চলিক ও ভেষজ শব্দকে চমৎকারভাবে আধুনিক করে তুলেছেন। তার প্রতিটি কবিতাই যেন রুচির কারুকাজ। একই সঙ্গে উষ্ণতায়, প্রেম ও দ্রোহে কবিতাগুচ্ছ খলবলিয়ে চলে। কাবিনবিহীন হাত দুটি অর্পণ করেও কবি বয়ন করেন প্রতিশ্রুতির অনহিহ্রস্ব তালিকা। গ্রাম্য কিশোরীর লজ্জা-বিধূর এবং অসংস্কৃতমনের কাছে হাজির করেন ইতিহাস-লোকবিশ্বাস-নৃতত্ত্ব-রাজনীতির তথ্যভারাক্রান্ত এক জটিল বাকবিভূতি। তাই তো তিনি 'সোনালী কাবিন'-এ অকপটে বলে গেছেন—

বৃষ্টির দোহাই বিবি, তিলবর্ণ ধানের দোহাই/ দোহাই মাছ-মাংস দুগ্ধবতী হালাল পশুর,/

লাঙল জোয়াল কাস্তে বায়ুভরা পালের দোহাই/ হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর।

কবি আল মাহমুদের সাফল্য এইখানে— তিনি তথাকথিত গণসাহিত্যের নিদ্রাকর্ষক স্বতঃসিদ্ধ উক্তিগুলো একটি রোমান্টিক খামের মধ্যে পুরে দিয়েছেন। 'সোনালী কাবিন' সেই লৌকিক জীবনের হার্দ্য-করুণ জীবনের ওপর স্থাপিত। কবিতার ভাষায় বাক্যবন্ধে গ্রামীণ জীবনের বিবিধ সৌরভ, নির্বিঘ্ন সততার গর্ব, বিবাহ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন ব্রত পাঠকদের আবহমান বাংলার সবুজ প্রান্তর, লোক সংস্কারের স্মৃতির উষ্ণতা দেয়। কবি লিখেছেন—

খেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ,/ শস্যের সপক্ষে থেকে যতটুকু অনুরাগ পারি/

তারো বেশি ঢেলে দেবো আন্তরিক রতির দরদ,/ সলাজ সাহস নিয়ে ধরে আছি পট্টময় শাড়ি/

সুকন্ঠি কবুল করো, এ অধমই তোমার মরদ।

কবি টিকে গেছেন পাঠকদের মাঝে। এক আড্ডায় কবি বলেছেন, 'আমার কবিতা টিকে থাকলে আমি থাকব। আমি টিকে থাকলে কোনো লাভ নেই, যদি না আমার কবিতা টিকে থাকে।' কবি কখনো অনুপস্থিত থাকেন না। সশরীরে না-থাকলেও মানুষের হৃদয়ে তাঁর উপস্থিতি থাকে। সাহিত্যসভা, আলাপ-আলোচনায় ঘুরেফিরে কবি সবার সামনে চলে আসেন। 'আমার অনুপস্থিতি' কবিতায় দারুণভাবে তার উপস্থিতির জানান দিয়েছেন—

আমার অনুপস্থিতি হাই তোলে মার্চের গুমোট বাতাসে/ কে ভাবত, খৃষ্টাব্দের শেষ রোববারও যাবে নিঃসঙ্গ এমন।/

অথচ ফিরি না আমি, তোমার খোঁপার ফুল ঝরে যায় পিঠে

অসংখ্য কবিতায় অনুপস্থিতির মধ্যেও আমরা কবির উপস্থিতি খুঁজে পাই। মনে হয় বহুদিন চোখ বন্ধ করে থাকলেও প্রেমিকার পিঠে খোঁপা থেকে ফুল ঝরে পড়ে। ফুলের সুবাসে পাগল হয় কোনো এক হলদে বিকেল। কবির কবিতার লাইনগুলো প্রথম দেখাতেই যেমন সহজ মনে হয় অথচ কী গভীর আবেদন। একজন নারীর ভালোবাসা আর লাস্যকে তিনি এনেছেন অপার মমতা ও দরদ দিয়ে।

আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মীর আবদুর রব ও মাতা রওশন আরা মীর। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির শুরু, বাকিটা ইতিহাস। বেঁচে থাকার তাগিদে চাকরি নিয়েছেন পত্রিকা অফিসে। সম্পাদনা করেছেন অনেক বই ও পত্রিকার। শিল্পকলায় চাকরি করেছেন। সেখানকার পরিচালকও হয়েছেন। তার প্রকাশিত বই একবারে কম নয়। পঁয়তাল্লিশের অধিক বই রচনার সময় পেয়েছেন ৩০-৩৫ বছর। প্রথম প্রকাশিত বই 'লোক লোকান্তর' (১৯৬৩), 'কালের কলস' (১৯৬৬), 'আল মাহমুদের কবিতা' (১৯৭১), 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩), ছোটগল্প 'পানকৌড়ির রক্ত' (১৯৭৫), 'মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো' (১৯৭৬), 'অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না' (১৯৮০), ‘Selected Poems Al Mahmud’ (১৯৮১), 'পাখির কাছে ফুলের কাছে' (১৯৮০), 'বখতিয়ারের ঘোড়া' (১৯৮৫), 'আরব্য রজনীর রাজহাঁস' (১৯৮৭), 'প্রহরান্তের পাশ ফেরা' (১৯৮৮), 'এক চক্ষু হরিণ' (১৯৮৯), 'মিথ্যাবাদী রাখাল' (১৯৯৩), 'উপন্যাস কবি ও কোলাহল' (১৯৯৩), 'উপমহাদেশ' (১৯৯৩), 'কাবিলের বোন' (১৯৯৩), 'পুরুষ সুন্দর' (১৯৯৪), 'নিশিন্দা নারী' (১৯৯৫), 'মরু মূষিকের উপত্যকা' (১৯৯৫), 'আগুনের মেয়ে' (১৯৯৫) ইত্যাদি।

আল মাহমুদের কবিতা শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও অনূদিত হয়েছে। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি, ফারসি, জার্মান, রুশ, ভিয়েতনামী, ইরানি, হিন্দি, উর্দু, ওড়িয়া, অসমীয়াসহ অনেক ভাষায়। মূলত কবির লেখালেখি শুরু হয় ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে। কবি শুধু লেখালেখি নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কবির অসহায়তা ও জীবিকার অনিশ্চয়তা অন্যান্য কবির মতো তাকেও দাঁড়াতে দেয়নি। তবে মানবরচিত কোনো নীতিমালা বা সমাজব্যবস্থায় মানুষের কাম্য সুখ, আত্মার শান্তি বা স্বাধীনতা কোনোটাই সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। কবি স্বাভাবিক লেখালেখির ভেতরেও ইসলামি চিন্তাধারার অন্যরকম মানুষ হয়ে ওঠেন। পাল্টে যায় জীবনের সৌন্দর্যচেতন ও জাগতিক স্বভাব। কবিকে কোথাও না কোথাও পৌঁছাতে হয়। কখনো বাস্তব জগতে কখনো-বা কল্পনার জগতে। এই দুটো জগতকে ঘিরেই কবির ঘর-সংসার। চোখ মুদলে দেখতে পায় অনন্তকালের পথ, মায়াবী দৃশ্যপট। কাব্যভাবনার মধ্যে বয়ে যায় জগতের একাল-সেকাল। ঝরে পড়ে অশুভ যা।

'কঠিন সংসারে' নামক কবিতায় কবির উচ্চারণে ধরা দেয়—

যদিও পুরানো দৃশ্য, আঙিনায় অই/ অবাধ্য গাছের মাথা; নীচু ডালে ঘুমন্ত পাখিটা/

একা আমি এই নিয়ে আরেকটু তৃপ্ত হয়ে রই/ লেখার টেবিলে। কার নিত্য নিমকের ছিটা/

হাঁসের ডিমের পোচে। খাটে আলনায়/ হাত দিয়ে ছুঁয়ে যেতে কী যে সুখ তার/

নির্ভয়ে দুল্ছে সংসার।

স্বদেশের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা ছিল তার। তিনি দেশ রক্ষার্থে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারত গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। নতুন প্রজন্মের জন্য উপহার দিয়েছেন একটি বাংলাদেশ। কবিতায় তার প্রভাবও পড়েছে—

কখনো ভোরের রোদে শিশিরের রেণু মেখে পায়/ সে পুরুষ হেঁটে যায় কুয়াশায় দেহ যায় ঢেকে/

আবার দুপুরে দেখি ঘুমিয়েছে প্রাচীন ছায়ায়/ কী জানি কী স্বপ্ন নিয়ে কঠিন পাথরে মাথা রেখে,—/

সে এক অবাক লোক মুখ তার ধূসর ধূমল,/ কোনো নারী কোনোদিন তার তরে মাখেনি কাজল।

বাংলাদেশের কবিতায় ঘুরেফিরে বারবার মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তম প্রেক্ষাপট নির্মাণে একটি দেশের জাতীয় সংস্কৃতি পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই বাংলা সাহিত্যে পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে। ব্রিটিশ ভারতে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ সাহিত্যিকগণ আমাদের সাহিত্যে স্বাধীনতা-চেতনার ভিত্তি স্থাপন ও তা সুদৃঢ় করে গেছেন। আর পূর্ব বাংলায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণসহ অনেক কবিই কলম ধরেছেন। আল মাহমুদের 'নিশিডাক' কবিতায় আছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের অনুষঙ্গ—

তার আহ্বান ছিলো নিশিডাকের শিস্তোলা তীব্র বঁশির মত।/ প্রতিটি মানুষের রক্তবাহী শিরায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে তা বাজত.../ সে যখন বলল, 'ভাইসব'।/ অমনি অরণ্যের এলোমেলো গাছেরাও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল।

্একটি কবিতা অত্যন্ত শক্তিশালী। শক্তিশালী কবির মন ও কলম। আর বাঙালি মুসলমানরা প্রথমে উপলব্ধি করে কবি কাজী নজরুল ইসলামের বৃটিশ উপনিবেশবাদ বিরোধী দীপ্ত ভূমিকার মধ্য দিয়ে। কবিতা যে মানুষের মনকে এমন উদ্বোধিত করতে পারে তা বাঙালি মুসলমানদের আগে জানা ছিল না। কবি আল মাহমুদ তার ব্যতিক্রম নন। সুখ-দুঃখের তরঙ্গতাড়িত জীবন কবিদের। বিপদসঙ্কুল পৃথিবীর ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে তুলে আনেন জীবনের শাঁস। কবিতায় উঠে আসে অভয় আশ্রয়। প্রকৃতির সহায়-সম্বল। 'স্বপ্নের সানুদেশে' কবি এ কথাই বলেছেন—

স্বপ্নের সানুদেশে আমার শস্যের বীজ ছড়িয়ে দেবো/ বাম দিকে বয়ে যাবে রুপোলি নদীর জল, ডানে/

তীক্ষ্ম তৃষিত পর্বত।

বাংলা সাহিত্যে কাল-রহস্য বা সন-তারিখ হিসাব করেও কবিগণের অবস্থান উল্লেখ করা হয়। কোন কবি কোন দশকের, কোন দশকের সাহিত্য অধিক উতরে গেছে সে হিসাবে কবি আল মাহমুদ অনেক আগেই দশক উতরে গেছেন। তিনি আধুনিক যুগের কবি। দশক মাথায় রেখে তিনি সাহিত্য সাধনা করেননি। তিনি ইসলামিক ভাবধারার সঙ্গে আধুনিক ও লোকজ শব্দের সমন্বয়ে রচনা করেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। তার 'বিষয়ী দর্পণে আমি' কবিতায় তেমনটাই উঠে এসেছে—

ক'বার তাড়িয়ে দিই, কিন্তু ঠিক নির্ভুল রীতিতে/ আবার সে ফিরে আসে ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরে/

তার সেই মুখখানি কুটিল আয়না হয়ে যায়/ নিজেকে বিম্বিত দেখি যেন সেই মুহূর্ত মুকুরে।

কবি আল মাহমুদের অন্যতম সম্পদ লোকজ শব্দ সম্ভার। 'সোনালী কাবিন' তার অন্যতম। তৎসম-তদ্ভব শব্দের সঙ্গে লোকজ এবং মুসলিম জবানের অন্তরঙ্গ শব্দরাজির সহাবস্থান ঘটেছে। ঘটেছে পল্লির জীবনধারার অমোঘ সত্যালাপ। 'সোনালী কাবিন'-এ নাস্তিক্যের জয়গান গাওয়া হলেও উচ্চারণ ভঙিতে, কোথাও কোথাও স্পষ্টত কুরআনের বাগভঙ্গি ব্যবহার করা হয়েছে। সব মিলে একটি কবিতাই কবিকে দিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের আসন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত