প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬
আবদুল বাসেত আবদুস সামাদ (মিসর) : কারি আবদুল বাসেত আবদুস সামাদ কোরআন তেলাওয়াতের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় নাম। তার কণ্ঠ শুধু সুমধুর ছিল না, ছিল প্রভাবশালী, হৃদয়বিদারক ও ঈমানজাগানিয়া। মুসলিম বিশ্বে তিনি আজও ‘কোরআনের স্বর্ণকণ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত। তার জন্ম ১৯২৭ সালে মিসরের কি না প্রদেশের আরমান্ট গ্রামে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন একটি ধার্মিক পরিবারে। তার বাবা নিজেও কোরআনের হাফেজ ছিলেন। শৈশবেই আবদুল বাসেত পুরো কোরআন মুখস্থ করেন। খুব অল্প বয়সেই তার কণ্ঠের বিস্ময়কর শক্তি আশপাশের মানুষের নজরে আসে। তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কেরাত ও তাজবিদের শিক্ষাগ্রহণ করেন।
আল-আজহার ঘরানার আলেমদের কাছে তিনি কোরআনের উচ্চারণ, স্তর ও সুরের সূক্ষ্মতা আয়ত্ত করেন। তার কণ্ঠের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দীর্ঘশ্বাস। একই সঙ্গে ছিল শব্দের নিখুঁত স্পষ্টতা। তার তেলাওয়াতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। ১৯৫১ সালে কায়রোতে এক ঐতিহাসিক তেলাওয়াত তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এ তেলাওয়াতের পর তিনি মিসরের কোরআন রেডিওতে প্রধান কারি হিসেবে নিযুক্ত হন। রেডিওর মাধ্যমে তার কণ্ঠ দ্রুত আরব বিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। এরপর দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় তার তেলাওয়াত শোনা যেতে থাকে। তিনি বহু বছর মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববিতে তেলাওয়াত করেন। হজ-ওমরার মৌসুমে তার কণ্ঠ লাখো মানুষের কান্না ও খুশির কারণ হয়ে উঠত। তিনি সৌদি আরব, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে সফর করেন। তার তেলাওয়াতে প্রভাবিত হয়ে অনেক অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন। মিসর সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মানিত করে। আন্তর্জাতিক ইসলামি সংগঠনগুলো তাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে। পশ্চিমা গণমাধ্যমেও তার কণ্ঠ প্রশংসিত হয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। তিনি কখনও নিজেকে শিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতেন না। বলতেন, ‘আমি কোরআনের খাদেম।’ তিনি কোরআনকে উপার্জনের মাধ্যম বানানো অপছন্দ করতেন। নতুন প্রজন্মের কারিদের উৎসাহ দিতেন। তার মৃত্যু হয় ৩০ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে; কিন্তু তার কণ্ঠ আজও জীবিত। ক্যাসেট, রেকর্ডিং ও ডিজিটাল মাধ্যমে তার তেলাওয়াত আজও শোনা হয়। তিনি শুধু একজন কারি ছিলেন না; ছিলেন একটি যুগ। কারি আবদুল বাসেত প্রমাণ করেছেন, কোরআন তেলাওয়াত শুধু পাঠ নয়; এটি একটি দায়িত্ব, একটি আমানত।
মাহমুদ খলিল আল-হুসারি (মিসর) : কারি মাহমুদ খলিল আল-হুসারি কোরআন তেলাওয়াতের জগতে একটি মৌলিক নাম। তিনি শুধু একজন বিখ্যাত কারি ছিলেন না; ছিলেন শুদ্ধ তাজবিদ ও প্রাতিষ্ঠানিক কেরাতের মানদ- নির্ধারণকারী ব্যক্তিত্ব। তার তেলাওয়াত আজও শিক্ষার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তার জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯১৭ সালে। জন্মস্থান মিসরের গারবিয়া প্রদেশের তান্তা। তিনি একটি দরিদ্র কিন্তু ধর্মপরায়ণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি কোরআন মুখস্থ করেন। অল্প বয়সেই তার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু তার স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। তিনি আজহারি আলেমদের কাছে কোরআনের শিক্ষাগ্রহণ করেন। তাজবিদের প্রতিটি নিয়ম তিনি গভীরভাবে আয়ত্ত করেন। তার তেলাওয়াতে আবেগের চেয়ে শুদ্ধতা বেশি গুরুত্ব পেত। তিনি বিশ্বাস করতেন, কোরআনের সৌন্দর্য তার সঠিক উচ্চারণেই নিহিত। ১৯৪৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কারি হিসেবে স্বীকৃতি পান। ধীরে ধীরে তিনি মিসরের কেরাত অঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৬১ সালে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
তিনি ছিলেন, বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি, যিনি সম্পূর্ণ কোরআন তাজবিদসহ রেকর্ড করেন। এ রেকর্ডিং কোরআন শিক্ষায় একটি বিপ্লব ঘটায়। এরপর তিনি মিসরের কোরআন রেডিওর প্রধান কারি নিযুক্ত হন। রেডিওর মাধ্যমে তার তেলাওয়াত আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। মাদ্রাসা ও ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রে তার রেকর্ড বাধ্যতামূলক পাঠ্য হয়ে ওঠে। তিনি শুধু তেলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; ছিলেন একজন শিক্ষক। তিনি বহু কারি তৈরি করেন। তার ছাত্রদের মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মের বহু বিখ্যাত কারি রয়েছেন। তিনি কেরাতের বিভিন্ন রেওয়ায়াতেও দক্ষ ছিলেন। বিশেষ করে, হাফস আন আসিম রেওয়ায়াতে তার দক্ষতা অতুলনীয় ছিল। তিনি সৌদি আরব, কুয়েত, সিরিয়া ও অন্যান্য আরব দেশে সফর করেন। আন্তর্জাতিক কোরআন সম্মেলনে অংশ নেন। তার তেলাওয়াতকে শিক্ষামূলক আদর্শ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ। তিনি কখনও তেলাওয়াতে অতিরঞ্জন করতেন না। বলতেন, ‘কোরআনের সৌন্দর্য তার নিয়মে।’ তিনি কোরআনের প্রতি গভীর সম্মান ও ভক্তি রাখতেন। তার মৃত্যু হয় ২৪ নভেম্বর ১৯৮০ সালে। কিন্তু তার রেখে যাওয়া রেকর্ডিং আজও জীবিত। কোরআন শিক্ষার ইতিহাসে তার অবদান অনস্বীকার্য। কারি মাহমুদ খলিল আল-হুসারি প্রমাণ করেছেন, শুদ্ধতা নিজেই সৌন্দর্য। কোরআন তেলাওয়াতে তিনি একটি স্থায়ী মানদ- স্থাপন করে গেছেন।
আবদুর রহমান আস-সুদাইস (সৌদি আরব) : শায়খ আবদুর রহমান আস-সুদাইস কেবল একজন কারি নন; তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। তার কণ্ঠ কোরআন তেলাওয়াতের সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আধুনিক মুসলিম বিশ্বে কোরআনের যে কণ্ঠ সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তার একটি নিশ্চিত নাম আস-সুদাইস।
১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৬০ সালে সৌদি আরবের আনাইজাহ কাসিম অঞ্চলে তার জন্ম। তিনি একটি ধার্মিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই কোরআনের প্রতি তার গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। খুব অল্প বয়সেই তিনি পুরো কোরআন মুখস্থ করেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশ পোক্ত। রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরিয়া বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ইসলামি আইন (শরিয়া)-এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষা তাকে শুধু কারি নয়, একজন আলেম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৮৪ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি মসজিদুল হারামে ইমাম হিসেবে নিযুক্ত হন। এটি ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। এত অল্প বয়সে এমন দায়িত্ব সৌদি আরবের ধর্মীয় ইতিহাসে বিরল। এরপর থেকে কয়েক দশক ধরে তিনি মসজিদুল হারামের প্রধান কণ্ঠে পরিণত হন। তার তেলাওয়াতের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। তিনি সুরের জটিলতায় যান না। আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তার কণ্ঠ দৃঢ়, স্পষ্ট এবং নেতৃত্বমূলক। বিশেষ করে, তার তারাবির নামাজের তেলাওয়াত কোটি মানুষের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে। তিনি শুধু তেলাওয়াত করেননি; প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববির প্রেসিডেন্সির প্রধান হিসেবে কাজ করেন। এ পদে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।
এখানে তিনি ব্যবস্থাপনা, সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কাজ করেছেন। তিনি বহু আন্তর্জাতিক সফর করেছেন। জাতিসংঘ, ইসলামি সম্মেলন সংস্থা ও বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে তিনি সৌদি আরবের ধর্মীয় প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি কোরআনের দাওয়াতকে শুধু মসজিদে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তবে সমালোচনার বাইরেও নন। সৌদি রাষ্ট্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু মুসলিম চিন্তাবিদ তাকে রাষ্ট্রঘেঁষা আলেম বলে সমালোচনা করেছেন। তবুও তার কণ্ঠ ও তেলাওয়াতের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংযত। তিনি শিক্ষাদানেও যুক্ত ছিলেন। বহু ছাত্র তার কাছে কোরআন ও শরিয়া বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। আস-সুদাইস প্রমাণ করেছেন, আধুনিক যুগে কোরআনের কারি শুধু আবেগের বাহক নন; তিনি নেতৃত্বের অংশ, ধর্মীয় কাঠামোর স্তম্ভ।
শাহরিয়ার পারহিজগার (ইরান) : ইরানকে বলা হয় মিষ্টি সুরের দেশ। ইরানিদের কণ্ঠে আল্লাহ ভিন্নতর একটি আকর্ষণ দিয়েছেন, যা অন্য কোনো দেশের কারিদের দেননি। সেই ইরানের বিখ্যাত কারিদের অন্যতম শাহরিয়ার পারহিজগার। ইরানের কোরআন তেলাওয়াতের ধারায় শাহরিয়ার পারহিজগার স্বনামে ভাস্মর। তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় কারি নন; তিনি ইরানি কেরাতধারার একজন শক্তিমান প্রতিনিধিত্বশীল কণ্ঠ। তার তেলাওয়াতে আবেগ আছে; কিন্তু সেই আবেগ নিয়ন্ত্রিত। সেখানে সুরের চেয়ে বোধ বেশি কাজ করে। তার জন্ম ১৯৭০-এর দশকে ইরানে। নির্দিষ্ট সাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা আছে। তবে জন্মস্থান হিসেবে তেহরান ও আশপাশের অঞ্চলকে উল্লেখ করা হয়।
তিনি একটি ধর্মপরায়ণ পরিবারে বেড়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই কোরআনের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়। তিনি অল্প বয়সেই কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক কোরআন শিক্ষাগ্রহণ করেন। তিনি তাজবিদ, কেরাত ও মাকামের শিক্ষাগ্রহণ করেন অভিজ্ঞ উস্তাদদের কাছে। একই সঙ্গে তিনি আরবি ভাষা ও কোরআনের অর্থগত দিকেও মনোযোগ দেন। ইরানের কেরাতধারার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তেলাওয়াতকে শুধু কণ্ঠনির্ভর না রেখে বিশ্লেষণধর্মী করা। শাহরিয়ার পারহিজগার এ ধারারই একজন সফল উদাহরণ। তিনি আয়াতের অর্থ অনুযায়ী সুর ও গতি নির্ধারণ করেন। তার তেলাওয়াতে হঠাৎ আবেগের বিস্ফোরণ দেখা যায় না; বরং ধীরে ধীরে শ্রোতাকে আয়াতের গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পরিচিতি লাভ করেন। ইরান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি কোরআন প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এতে তার অবস্থান আরও দৃঢ় হয়।
শাহরিয়ার পারহিজগার বহু দেশে তেলাওয়াত করেছেন। তিনি মিসর, ইরাক, লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সফর করেন। তার তেলাওয়াত আরব শ্রোতাদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পায়। এটি ইরানি কারিদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তিনি শিক্ষক হিসেবেও বেশ পরিচিত। ইরানের বিভিন্ন কোরআন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তিনি পাঠদান করেছেন। তার ছাত্রদের মধ্যে নতুন প্রজন্মের বহু কারি রয়েছেন। তিনি তেলাওয়াতে নিয়ন্ত্রণ ও শালীনতাকে গুরুত্ব দেন। অতিরিক্ত সুরচর্চাকে নিরুৎসাহিত করেন। তার ব্যক্তিত্ব শান্ত ও সংযত। তিনি মিডিয়ায় খুব বেশি উপস্থিত নন। বিশ্বাস করেন, কারির আসল পরিচয় তার কণ্ঠে নয়, তার আদবে। এ মনোভাব তাকে অনেক কারির থেকে আলাদা করেছে। শাহরিয়ার পারহিজগার প্রমাণ করেছেন, কোরআন তেলাওয়াত কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি চিন্তা, শৃঙ্খলা ও জ্ঞাননির্ভর এক ইবাদত। ইরানি কেরাতধারায় তিনি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
মুহাম্মদ সিদ্দিক আল-মিনশাবি (মিসর) : শায়খ মুহাম্মদ সিদ্দিক আল-মিনশাবি ছিলেন মিসরের একজন প্রখ্যাত কোরআন গবেষক ও বিশ্ববিখ্যাত কারি। তার তেলাওয়াত কেবল কণ্ঠের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সেখানে ছিল গভীর বিনয় ও আত্মসমর্পণ। এ কারণেই তিনি অসংখ্য কোরআনপ্রেমীর হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। ১৯১৯ মতান্তরে ১৯২০ সালের ২০ জানুয়ারি মিসরের রাজধানী কায়রোর দক্ষিণাঞ্চলীয় সাওহাজ জেলার অন্তর্গত মিনশাহ এলাকার বাওয়ারেক গ্রামে তার জন্ম। মাত্র আট বছর বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সেখানে কোরআন, তাজবিদ ও উলুমুল কোরআনের উচ্চতর শিক্ষালাভ করেন। তার বিখ্যাত শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম হলেন- শায়খ মুহাম্মদ আবুল আলা ও শায়খ মুহাম্মদ সায়ুদি। পড়াশোনা শেষ করে অল্প সময়ের মধ্যেই তার তেলাওয়াতের সুখ্যাতি মিসরের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু নামণ্ডযশের প্রতি তার কোনো আকর্ষণ ছিল না। নিভৃতে কোরআনের খেদমত করাই ছিল তার আজীবন সাধনা। তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। আত্মমর্যাদার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। তার জীবনের মূল দর্শন ছিল- ‘কারিয়ুল কোরআন লা ইয়ুহান’। অর্থাৎ কোরআনের কারি কখনও অবনত হবেন না। এ দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় তার জীবনের নানা ঘটনায়। মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসের একবার রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাকে দিয়ে তেলাওয়াত করাতে চাইলে তিনি তাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। একইভাবে মিসরের রাষ্ট্রীয় বেতার তাকে সাক্ষাৎকারের জন্য স্টুডিওতে আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যশ-খ্যাতির কোনো লোভ তার নেই এবং নিজের নামকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো আয়োজন তিনি চান না। বিশেষজ্ঞদের মতে, তার তেলাওয়াতের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মাখরাজের নিখুঁত অনুসরণ, স্পষ্ট উচ্চারণ এবং খোলা অথচ সংযত কণ্ঠ। বিশিষ্ট আলেম মুহাম্মদ মুতাওয়াল্লি বলতেন, কেউ যদি খুশু ও হৃদয়ছোঁয়া কোরআন তেলাওয়াত শুনতে চায়, সে যেন সিদ্দিক আল-মিনশাবির তেলাওয়াত শোনে। তিনি আল-আকসা মসজিদ, কুয়েত, লিবিয়া, আলজেরিয়া, ইরাক, সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে কোরআন তেলাওয়াত করেছেন। সিরিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তাকে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করে। তার দুই স্ত্রী, আট পুত্র ও চার কন্যাসন্তান ছিল। ১৯৬৬ সালে তার কণ্ঠনালীতে টিউমার ধরা পড়ে। অসুস্থতার মাঝেও তিনি কোরআন তেলাওয়াত ছাড়েননি। অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২০ এপ্রিল তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পর মিসর সরকার তাকে প্রথমশ্রেণির জাতীয় পণ্ডিত ঘোষণা করে। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তার তেলাওয়াত আজও বিশ্বময় ধ্বনিত হয়। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে তার কণ্ঠ সমানভাবে সমাদৃত। মুহাম্মাদ সিদ্দিক আল-মিনশাবি প্রমাণ করে গেছেন, কোরআনের সৌন্দর্য কণ্ঠের জাঁকজমকে নয়, হৃদয়ের বিনয় ও খুশুতেই নিহিত।
আবু বকর আশ-শাতরি আস-সুদানি (সুদান) : শায়খ আবু বকর আশ-শাতরি আস-সুদানি সুদানের কোরআন তেলাওয়াত ঐতিহ্যের একটি পরিচিত নাম। তিনি উচ্চস্বরে আলোড়ন তোলেন না; বরং ধীরে ধীরে সুর তোলেন। তার কণ্ঠে উত্তেজনা কম, স্থিরতা বেশি।
এ বৈশিষ্ট্যই তাকে আলাদা করেছে। দুনিয়াব্যাপী খ্যাতি দিয়েছে। তার জন্ম সুদানে। সুদানকে বলা হয় আফ্রিকান কারিদের উৎপাদন ক্ষেত্র। তিনি সুদানের প্রাচীন কোরআনি শিক্ষা পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই কোরআনের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তিনি অল্প বয়সেই কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি তাজবিদ ও কেরাতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। সুদানি কেরাতের বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘশ্বাস, স্পষ্ট উচ্চারণ, নিয়ন্ত্রিত গতি। আশ-শাতরি এ ধারারই একজন বিশুদ্ধ প্রতিনিধি। তার তেলাওয়াতে সুর আছে; কিন্তু তা প্রাধান্য পায় না। অর্থ ও উচ্চারণই সামনে থাকে। এজন্য তার তেলাওয়াত শিক্ষামূলক হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক হাফেজ ও ছাত্র তার রেকর্ড ব্যবহার করে অনুশীলন করেন। তিনি প্রথমে সুদানের অভ্যন্তরে পরিচিতি পান।
পরে উপসাগরীয় অঞ্চলে তার কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তিনি কুয়েত, সৌদি আরব, ইয়েমেন, মিসর ও কাতারে অন্যতম কারি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। সেই খ্যাতির সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর পাড়ায় পাড়ায়। আন্তর্জাতিক কোরআন মাহফিলে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিশেষ করে, শিক্ষামূলক মজলিসে তার উপস্থিতি মূল্যায়িত হয়। তিনি কোনো রাজদরবারি কারি ছিলেন না; তার কণ্ঠকে ইবাদতের সীমার মধ্যেই রাখেন। তিনি প্রচারবিমুখ। মিডিয়ায় তার উপস্থিতি সীমিত। এ সংযমই তাকে আলাদা মর্যাদা দেয়। তিনি শিক্ষক হিসেবেও ভূমিকা রেখেছেন।
সুদান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কোরআন শিক্ষাকেন্দ্রে তিনি দরস দেন। তাজবিদের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো তিনি ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেন। তার ছাত্ররা বলেন, তিনি তেলাওয়াতের আগে আদব শেখান। ব্যক্তিত্বে তিনি শান্ত। পোশাকে সাধারণ। কথায় সংযত। তিনি বিশ্বাস করেন, কোরআন তেলাওয়াতে শ্রোতাকে নয়, নিজেকে সংশোধন করতে হয়। এ দর্শন তার কণ্ঠে প্রতিফলিত হয়। তিনি আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য পরিচিত নন। কিন্তু কোরআনের ছাত্রদের কাছে তিনি একটি মানদ-। সুদানি কেরাতের ধারাবাহিকতায় তার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। শায়খ আবু বকর আশ-শাতরি আস-সুদানি প্রমাণ করেছেন, কোরআন তেলাওয়াত সবসময় জাঁকজমকপূর্ণ হতে হয় না; কখনও কখনও স্থিরতা সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলে।
মিশারি রাশিদ আল-আফাসি (কুয়েত) : শায়খ মিশারি রাশিদ আল-আফাসি কুয়েতের সমকালীন কোরআনি জগতের এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে কোরআনের কারি, খতিব, গবেষক, প্রশিক্ষক এবং গণমাধ্যমে পরিচিত একটি নাম। কুয়েত রাষ্ট্রে তিনি মসজিদুল কাবিরের ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে ওয়াকফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার পূর্ণ নাম মিশারি বিন রাশিদ বিন গরিব বিন মুহাম্মদ বিন রাশিদ আল-আফাসি আল-মুতাইরি। তিনি আরব গোত্র মুতাইরের আল-আফাসি শাখার অন্তর্ভুক্ত।
কুয়েত সিটিতে ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে তার জন্ম। পারিবারিক জীবনে তিনি বিবাহিত। তিনি দুই পুত্র ও তিন কন্যার জনক। তার উপনাম আবু রাশিদ। শৈশব থেকেই কোরআনের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে তিনি আরবি সুর ও নাশিদশিল্পী। শিক্ষাজীবনে তিনি সৌদি আরবে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোরআন ও ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদে অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি কেরাতে আশারা (দশ কেরাত) ও তাফসিরে পাণ্ডিত্য লাভ করেন। সেখানেই নিয়মিত অধ্যয়ন করেন। মদিনার শীর্ষস্থানীয় কারি ও আলেমদের কাছে তালিম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি মিসরে সফর করে কোরআনের বিভিন্ন কারি ও রেওয়াতের অনুমতি লাভ করেন। তন্মধ্যে শায়খ আবদুর রাফে রিদওয়ান আশ-শারকাওয়ি, শায়খ ইবরাহিম আস-সামানুদি, শায়খ আহমদ আবদুল আজিজ আজ-জিয়্যাত এবং শায়খ ড. আহমদ ঈসা আল-মাসারাওয়ি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া শায়খ ইবরাহিম আল-আখদার ও শায়খ খলিলুর রহমান আল-কারির কাছেও পাঠগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে কেরাতের পথে এগিয়ে যান। তার প্রথম কোরআনি রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৪১৬ হিজরিতে; যেখানে সুরা মোমিন, ফুসসিলাত ও শুরা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৪২০ হিজরির রমজানের শেষ দশকে তিনি প্রথমবার কুয়েতের মসজিদুল কাবিরে ইমামতি করেন। কোরআনের খেদমতে তিনি বহুমুখী ভূমিকা রাখেন। তিনি আল-আফাসি কোরআন একাডেমি (মালয়েশিয়া) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আল-আফাসি স্যাটেলাইট চ্যানেল চালু করেন; যা কুয়েতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামি চ্যানেল। তিনি আমেরিকা, ফ্রান্স, চেচনিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ‘আতরুল কালাম’ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিচারকম-লীতেও তিনি যুক্ত। তিনি কোরআন শিক্ষার জন্য একাধিক টেলিভিশন প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন। যেমন- খাল্লুনা মাআহ, রত্তিল মাআল আফাসি। তিনি কেরাত বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ লেকচারও প্রদান করেন পৃথিবীর বহু দেশে। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন ওয়াকফ ও শিক্ষামূলক প্রকল্পের তত্ত্বাবধান করেন। আরবি নাশিদের ক্ষেত্রে তার যাত্রা শুরু হয় ২০০৩ সালে ‘আয়া মান ইয়াদ্দাঈ আল-ফাহম’ শীর্ষক কবিতার মাধ্যমে। এ প্রথম নাশিদই ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর তিনি ‘উয়ুনুল আফাই’ নামের প্রথম নাশিদ অ্যালবাম প্রকাশ করেন। এর আগেই তিনি শাতিবিয়া, দুররা ও সামানুদিয়ার মতো কোরআনি মুতুন রেকর্ড করেন। শায়খ মিশারি রাশিদ আল-আফাসি আজ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি কোরআন তেলাওয়াত, কেরাতের শিক্ষা, ইনশাদ ও গণমাধ্যম- সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রভাব রেখেছেন। তার কণ্ঠ যেমন হৃদয়ে পৌঁছায়, তেমনি তার কাজ কোরআনের প্রাতিষ্ঠানিক খেদমতকে একটি নতুন যুগে নিয়ে গেছে।