ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

অর্থনৈতিক সংকটের অন্তরালের কারণ

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
অর্থনৈতিক সংকটের অন্তরালের কারণ

দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও ভঙ্গুর অবস্থার মূলে রয়েছে স্বেচ্ছাচারী রাজনীতি। স্বৈরাচারী রাজনীতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হচ্ছে আজকের বিকলাঙ্গ অর্থনীতি। এর পেছনে ছিলেন রাজনীতিবিদ, আমলা এবং ব্যবসায়ীদের নেক্সাস। দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রহণ করা বড় বড় মেগা প্রকল্প, যা বাস্তবায়নে মেগা চুরি হয়েছে। বিগত সরকারের ১৬ বছরের ইতিহাসে দেশের চার খাতে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হয়েছে। এগুলো হলো- ব্যাংক, জ্বালানি, ভৌত অবকাঠামো এবং আইসিটি খাত। এসব খাতের প্রকল্পগুলোয় অতিমূল্যায়ন, অনিয়ম, সময়বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প তৈরির ফলে বড় বড় দুর্নীতি ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে লুটপাটের রাজনীতি শুরু হয় ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর।

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় SWIFT কোড হ্যাকিং করে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার রিজার্ভ বিদেশে পাচার করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বিদেশে পাচার এবং আমদানি দায় মেটানোর ফলে রিজার্ভের পরিমাণ হ্রাস পায়। রিজার্ভ হ্রাস এবং ডলার সংকটের কারণে বহু সংখ্যক বাণিজ্যিক ব্যাংকে এলসি বন্ধ হয়ে যায়। বর বড় শিল্পপতি, এমপি-মন্ত্রী, আমলা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা পণ্যদ্রব্য আমদানির আড়ালে প্রতিনিয়ত আন্ডার ইনভয়েস ও ওভার ইনবয়েসের মাধ্যমে বিদেশে মাত্রাতিরিক্ত টাকা ও ডলার পাচার করলে সংকটের মাত্রা আরও তীব্র আকারধারণ করে। যার ফলে ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোতে ডলার সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। ফলশ্রুতিতে ডলারের দাম বৃদ্ধি পায় এবং টাকার মূল্য কমে যায়।

৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে হাসিনা সরকারের পতনের পর সর্বপ্রথম সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণের নামে দুর্নীতি ও লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। তৎকালীন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগশাজসে মালিকপক্ষ অবাধে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে দেয়। গত ২৭-১১-২০২৫ তারিখে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ৬৪৫০০০ হাজার কোটি রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। গত বছরের ডিসেম্বরে এর হার ছিল ২০.২ শতাংশ। মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৯৮৭৫০ কোটি টাকা যা নজিরবিহীন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার যেখানে ২৬ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে এই হার দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশ।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ২২,৪৮২ কোটি টাকা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও গবেষণা সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে খেলাপি ঋণের এই হার বর্তমান বিশ্বে সর্বোচ্চ। অতীতে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে রাখত। অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে প্রভাবশালীদের দেওয়া ঋণখেলাপি দেখানো হত না। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ও চরমে পৌছেছে। অতিরিক্ত খেলাপি ঋণের ফলে ১৫৮টা সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক তারুল্য সংকটে পতিত হয়। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপী ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোকে জনগণের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খেতে হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তারুল্য সংকটে পতিত হলে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান-পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কর্মকর্তাদের পদত্যাগে বাধ্য করে নতুন প্রশাসক নিয়োগ করে। প্রশাসকগণ সর্বপ্রথম ৫টি ব্যাংককে তারুল্য সহায়তা দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। অতিরিক্ত তারুল্য সংকট ও রেকর্ড সংখ্যক খেলাপী ঋণের (কোনো কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৬ ও ৯৭ শতাংশ) ফলে উক্ত ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগকৃত প্রশাসকগণ সর্বপ্রথম ৫টি ব্যাংককে একত্রে একীভূতকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার ১ বছর পর কারসাজির মাধ্যমে শেয়ার বাজারে অভ্যহতভাবে দরপতন শুরু হয়। স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশের শেয়ারবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটে পরস্পরের সঙ্গী ছিলেন সালমান এফ রহমান, লোটাস কামাল, শিবলী রুবাইয়াত ও আবুল খায়ের হিরু। তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০১০ সালের পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজিতে জড়িত ছিলেন লোটাস কামাল। শেয়ার বাজারে কারসাজির সঙ্গে জড়িত মাস্টার মাইন্ডরা শেয়ারের দাম অব্যাহতভাবে কমিয়ে দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। পুঁজিবাজারে অব্যাহত দরপতন, ফোর্সড সেলে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

অন্যদিকে সালমান- লোটাস কামাল, শিবলী রুবাইয়াত-আবুল খায়ের হিরুর মতো মাস্টারমাইন্ডরা দীর্ঘদিন ধরে বহাল তবিয়তে কারসাজি করে গেছেন।

পুঁজিবাজারের দরবেশ খ্যাত সালমান এফ রহমানের কারসাজির অন্যতম হোতা আবুল খায়ের হিরু। তার কালো ছায়া থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজারের ৯০ শতাংশ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন বলে দাবি করেছে বিসিএমআইএ। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজার মূলধন হারিয়েছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। নানা অভিযোগ থাকার পরও শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি সালমান-লোটাস কামাল, শিবলী-হিরু জোটের কাউকে। এতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে এই দুই জুটি। শেয়ারবাজারে সর্বনাশের পেছনে রয়েছে দুই জুটির কারসাজি। সব নিয়মণ্ডকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলে তাদের অবাধ লুটপাট। তারা বাজার কারসাজিতে সহায়তা করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদগুলোতে নিজেদের পছন্দের লোক বসিয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নিঃস্ব হয়েছেন শেয়ারবাজারের লাখ লাখ বিনিয়োগকারী।

বিগত দশকজুড়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে বয়ান তৈরি করা হয়েছে, মেগা প্রকল্প ছিল সেই বয়ান তৈরির প্রধান হাতিয়ার। মেগাপ্রকল্পের আড়ালে বাংলাদেশের যে উন্নয়নের বয়ান তৈরি করা হয়েছে, সেটি না মেটাতে পেরেছে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা, না অর্জন করতে পেরেছে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা। তথাকথিত উন্নয়নের বয়ান কী করে বাংলাদেশের মানুষকে একটি মেকি ও ফাঁপা উন্নয়নের বাবলের মধ্যে রেখে গেছে, সেটি আমরা এখন বুঝতে পারি। এর মধ্য দিয়ে দেশের মানুষকে আরও বেশি অনুন্নয়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কেননা, এর সঙ্গে যুক্ত ছিল দুর্নীতির এক বিশাল বাণিজ্য, যে কারণে মেগা প্রকল্প, রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তি ও তাদের সুবিধাভোগী শ্রেণির কাছে একটি লোভনীয় ও আকর্ষণীয় বিষয়।

বিগত সরকারের আমলে উন্নয়নের মেগা প্রকল্পের বয়ানের প্রতি পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল দুর্নীতি এবং শোষণমূলক প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কত যে দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাধর ব্যক্তি দেশের মুনাফা নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন বিভিন্ন দেশের উন্নত শহরগুলোতে, তার ইয়ত্তা নেই। এভাবে যে উন্নয়নের বয়ান তৈরি করা হয়েছে, তা শুধু একটি সুবিধাভোগী শ্রেণিরই ইচ্ছা পূরণ করত, আর তারাই ছিল সেই উন্নয়নের ভোগী। সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় সেই উন্নয়ন। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে শ্বেতপত্র কমিটি ও টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে আমলে নেওয়া প্রকল্পগুলো হলো-

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু প্রকল্প, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, যমুনা রেল সেতু প্রকল্প, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প, মেট্রোরেল, দোহাজারি-টেকনাফ রেল সড়ক, বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকা এমআরটি লাইন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প এবং বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) লাইন-৩ প্রকল্প। শুরুর দিকে এ আট প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা, ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। কিন্তু নির্মাণ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার বা, ২ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রারম্ভিক ব্যয়ের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বা ৯০ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা বেশি খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দিগন্তে দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি ঋণের কালোছায়া ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। যার প্রমাণ সামষ্টিক অর্থনীতির নানাবিধ সংকটের মধ্যেই গুরুতর বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপের মুখোমুখি হওয়া। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ঋণ করে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। সরকার চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার আমলের পুরোনো ঋণ পরিশোধ করছে। এটা করতে গিয়ে একদিকে সরকারের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আয় কম হওয়ায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টান পড়ছে। সর্বশেষ ঋণ টেকসই বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে পর পর দুই বছর মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী সর্বশেষ হিসাব মতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি ঋণের দায় ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে, যা অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ আবারও নতুন রেকর্ড স্পর্শ করেছে।

চলতি বছরের জুন শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১.৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, এই হিসাবে দেশের প্রতি নাগরিকের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৩৮ ডলার বা ৭৭ হাজার ৪৩৩ টাকা।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক ঋণ ছিল ৪১.১৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ১০ বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ১০০ বিলিয়ন ডলার ঋণের মাইলফলক অতিক্রম করে। এই সময়ে সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পুঞ্জীভূত স্থিতি ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতেই সরকারের ঋণ বেড়েছে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও তফসিলি ব্যাংক থেকে সরকারের নেওয়া সরাসরি ঋণই হলো ব্যাংক খাতের ঋণ। এ খাতে গত জুলাই শেষে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫,৪৮,৫৯৭ কোটি টাকা।

২০০৯ সালের জুনে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৫৮০০০ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,৩৮,০০০ হাজার কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ৮০০০০ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৪৪০০০ হাজার কোটি টাকা। অতীত সরকার গত ১৫ বছরে অনেক অপ্রয়োজনীয় খাতে ঋণ নিয়েছে। আবার অনেক প্রকল্পে ও বিদেশি ঋণ নিয়েছে যেসব প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এসব ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে দেশের অর্থনীতির ওপর। সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারের ঋণগ্রহণের বর্তমান প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য উদ্ব্যেগজনক।

এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক এডিবি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্য বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ সবছেযে দ্রুত হারে বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান ঋণের কারণে সুদের বুঝা ও বাড়ছে গত অর্থবছরে সরকারকে সুদ বাবদ ১,৩২,৪৬০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। গত সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা চেপেছে জনগণের কাঁধে। এগুলো পরিশোধ করতে গিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে চড়া সুদে ধার করতে হচ্ছে। যার ফলে সরকার বাজার থেকে ১২২ টাকা দরে ডলার কিনে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করছে, যা স্থানীয় মুদ্রায় ৬১০০০ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আগের সরকার ছাপানো টাকায় ব্যাপক ঋণ গ্রহণ করেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপানো টাকায় ঋণ নিয়েছিল ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। যে কারণে মূল্যস্ফীতির হারও বেড়ে গিয়েছিল।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০০৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এই সময়ে ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার ও জাল জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। যার বেশির ভাগ সংঘটিত হয় ঋণপত্র বা এলসির মাধ্যমে। পণ্য আমদানির নামে এলসি খুলে কথিত পণ্য দেশে না আনা, ফোর্স লোন সৃষ্টি করে বিদেশি ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করা এবং কম পরিমাণে পণ্য আমদানি করে এর চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করে দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার করা হয়েছে। পাচার করা টাকায় বিদেশে সম্পদ গড়ার ও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি বিআইবিএম এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশ থেকে পাচার হওয়া মোট অর্থের প্রায় ৭৫ শতাংশই বাণিজ্যের মাধ্যমে হয়েছে। আলোচ্য সময়ে প্রতিবছর পাচার হয়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৬ বছরের পাচারের অর্থ দিয়েই ৭৮টি পদ্মা সেতু তৈরি করা সম্ভব।

আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত, অবকাঠামো খাত ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে উন্নয়নের নামে লুটপাট, মেঘা প্রকল্পে দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজার লুট, রিজার্ভ লুট, বিদেশে টাকা পাচার, উন্নয়নের নামে বাজেট খালি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, ব্যবসায়ী-মন্ত্রীদের সিন্ডিকেট কারসাজি, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা, অর্থনৈতিক সংকট, রিজার্ভ ও ডলার সংকট, অতিরিক্ত কর শুল্ক বৃদ্ধি, চোর-বাটপাররা হাজার কোটি টাকার মালিক, সকল এমপি-মন্ত্রীদের দেশে-বিদেশে সম্পদ ক্রয়, প্রশাসনে দলীয় লোক নিয়োগ, বিচার বিভাগ ধ্বংস, সব সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির আঁকড়ায় পরিণত করে দেশটাকে মগেরমুল্লুক বানিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত