প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬
এক সময়ের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত উত্তরবঙ্গ আজ যেন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত। মাঠের পর মাঠ ফসলের জমি আছে কিন্তু সেই জমিতে প্রাণ দেওয়ার মতো পানি নেই। মাটির গভীর থেকে গভীরতর স্তরে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। সাধারণ নলকূপ তো দূরের কথা, গভীর নলকূপগুলোও এখন পানি তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। নদীর বুকে ধুলো উড়ে, মাটি ফেটে চৌচির। উত্তরের জেলাগুলোতে এখন পানির সংকট শুধু ঋতুভিত্তিক কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবন আর জীবিকা এখানে এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। এই সংকটের মূলে রয়েছে যেমন প্রকৃতির রুদ্ররূপ, তেমনি মানুষের তৈরি নানা ভুল পরিকল্পনা ও অব্যবস্থাপনা।
উত্তরবঙ্গের পানি সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হয়। ঋতুচক্র এখন আর আগের মতো নেই। বর্ষায় পর্যাপ্ত বৃষ্টি হচ্ছে না, আবার অসময়ে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। তিস্তা নদীর দিকে তাকালে এখন বুক কেঁপে ওঠে। যে নদী একসময় প্রমত্তা ছিল, তা এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি থাকে না বললেই চলে। এতে করে সেচ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। শুধু তিস্তা নয়, এই অঞ্চলের ছোট-বড় প্রায় সব নদ-নদী এখন পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে এই জনপদ।
কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে পানির সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো অপরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থা। আমরা ধান চাষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। বিশেষ করে বোরো চাষের জন্য বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়। এক কেজি চাল উৎপাদন করতে প্রায় তিন থেকে পাঁচ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। উত্তরবঙ্গের কৃষকরা বছরের পর বছর ধরে মাটির নিচ থেকে পানি তুলে এই চাহিদা মেটাচ্ছেন। এতে করে পানির স্তর প্রতি বছর কয়েক ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। একসময় ৩০-৪০ ফুটের মধ্যে পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে শত ফুট গভীরেও পানির দেখা মিলছে না। অগভীর নলকূপগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে। কৃষকদের বাধ্য হয়ে গভীর নলকূপ বসাতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
পানির এই অভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বয়ে আনছে সীমাহীন দুর্ভোগ। গ্রামের নারীদের এখন মাইলের পর মাইল হেঁটে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করার মতো বিশুদ্ধ পানি মেলা ভার। এর ফলে চর্মরোগসহ পানিবাহিত নানা অসুখ ছড়িয়ে পড়ছে। গবাদি পশুর জন্য পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। শুধু কৃষি নয়, পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে মারাত্মকভাবে। গাছপালা শুকিয়ে যাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। উত্তরের জেলাগুলোতে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী কয়েক দশকে উত্তরবঙ্গ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি সহায়তার অভাব নেই ঠিকই, কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই সাময়িক সমাধান। সরকার গভীর নলকূপ স্থাপন করে সেচ সুবিধা দিচ্ছে, কিন্তু এটি আসলে সমস্যাকে আরও জটিল করছে। কারণ মাটির নিচের পানি অফুরন্ত নয়। এখন সময় এসেছে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই পরিকল্পনার। সরকারের উচিত হবে কৃষকদের ধান চাষ থেকে সরিয়ে কম পানি লাগে এমন ফসল চাষে উৎসাহিত করা। গম, ভুট্টা, ডাল বা তেলবীজ জাতীয় ফসলে পানির প্রয়োজন অনেক কম। এসব ফসলের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং নিশ্চিত বাজার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য বড় আকারের জলাধার বা পুকুর খনন করা জরুরি। খাল-বিল ও নদী খনন করে সেগুলোর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
টেকসই সমাধানের জন্য আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা আবশ্যক। তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি বছরের পর বছর ঝুলে আছে। এই চুক্তি সম্পন্ন না হলে উত্তরবঙ্গের মুক্তি নেই। নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে ড্রেজিং বা খনন কাজ শুধু লোকদেখানো হলে চলবে না, তা হতে হবে বিজ্ঞানসম্মত। বরেন্দ্র অঞ্চলে বনায়ন কর্মসূচি বাড়াতে হবে। গাছ থাকলে বৃষ্টিপাত বাড়বে এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়ন সম্ভব নয়। মাটির নিচ থেকে পানি তোলার যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা এখনই বন্ধ করতে হবে। তার বদলে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ঘরবাড়িতে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
উত্তরবঙ্গের এই নীরব কান্না থামানোর দায়িত্ব আমাদের সবার। পানির প্রতিটি ফোঁটা অমূল্য। অপচয় রোধ করার পাশাপাশি আমাদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু সেচ নয়, শিল্পকারখানাতেও পানির ব্যবহার সীমিত করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচ পদ্ধতি জনপ্রিয় করা প্রয়োজন। এতে পানির অপচয় অনেক কমে আসে। এই সংকটের সমাধান শুধু সরকারি দপ্তরের ফাইলবন্দি পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। স্থানীয় মানুষকে সচেতন করতে হবে। উত্তরবঙ্গ যদি তৃষ্ণার্ত থাকে, তবে তার প্রভাব সারা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর পড়বে। খাদ্যের বিশাল জোগান আসে এই অঞ্চল থেকে, তাই এখানকার মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়া মানে সারা দেশের খাদ্য সংকটে পড়া। পরিশেষে বলা যায়, উত্তরবঙ্গের পানি খরা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয় বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনই সজাগ না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক টুকরো মরুভূমি রেখে যাব। সদিচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে এই মরুময়তা থেকে উত্তরকে বাঁচাতে। নদী বাঁচলে জীবন বাঁচবে, আর নদী বাঁচাতে হলে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজেদের সম্পদের সুপরিকল্পিত ব্যবহার শিখতে হবে। ধুধু বালুচর আর ফেটে যাওয়া মাটি যেন আমাদের ভাগ্যের লিখন না হয়, সেই লক্ষ্যে এখনই কাজ শুরু করা দরকার। পানির অপর নাম জীবন, কিন্তু উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে আজ পানির অপর নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁচার লড়াই।
ইব্রাহীম খলিল (সবুজ)
শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়