প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬
ভোর হওয়ার আগেই রান্নার তোড়জোড় শুরু করা ছিল এ দেশের গৃহিণীদের দীর্ঘদিনের সহজাত অভ্যাস। কিন্তু সেই অভ্যাসে এখন চরম ছেদ পড়েছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের হেঁশেলে এখন আর হাড়ি চড়ছে না। পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ এখন রূপকথার গল্পের মতো শুনি আমরা, যা পাওয়া না যাওয়ার হাহাকার নগরে নগরে। কিন্তু এর বিকল্প হিসেবে যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর দেশের কোটি মানুষ বুক বেঁধেছিল, সেখানেও এখন বিরাজ করছে এক চরম অরাজকতা ও অস্থিরতা। দেশের গ্যাস সংকট এখন আর শুধু রান্নার ঘরের সীমিত সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নিয়ে যে নৈরাজ্য চলছে, তাতে এক ভয়াবহ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন পার করছে সাধারণ মানুষ। মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী- সবাই আজ দিশেহারা।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন এক বড়সড় অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। একসময় প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া গ্যাসের প্রাচুর্যের ওপর ভিত্তি করে এ দেশে শিল্পায়ন ও নগরায়ন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই গ্যাস উত্তোলনে স্থবিরতা এবং মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসায় আমরা এখন আমদানিনির্ভর এলপিজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। রাজধানীর আধুনিক আবাসন থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড় বা চর পর্যন্ত সিলিন্ডার গ্যাস এখন এক অপরিহার্য নিত্যপণ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, বাজারে এই সিলিন্ডারের সরবরাহ এবং মূল্যের যে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে, তা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে ঢাকঢোল পিটিয়ে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয়। ২০২৬ সালের শুরুতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের কথা বলে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক উচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যায় সাধারণ মানুষের বুকফাটা হাহাকার। কোথাও বৃদ্ধ বাবা সিলিন্ডারের খোঁজে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটছেন, কোথাও মা চুলা জ্বালাতে না পেরে সন্তানদের নিয়ে অনাহারে থাকছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বিক্রেতারা সোজাসুজি জানিয়ে দিচ্ছেন- গ্যাস নেই, আর থাকলেও তা আকাশচুম্বী দামে কিনতে হবে। ১৩০০ টাকার পণ্য যখন ১৮০০-২০০০ টাকায় কিনতে হয়, তখন তা শুধু পকেট কাটে না, বরং একটি পরিবারের পুরো মাসের জীবনযাত্রাকে পঙ্গু করে দেয়। সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি, অথচ জ্বালানি বাবদ ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এই নীরব দুর্ভিক্ষ যেন রান্নার ঘরে হানা দিয়েছে। ভোক্তারা বলছেন, সরকার দাম নির্ধারণ করে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই মূল্যের বাস্তবায়ন আছে কি না, তা দেখার যেন কেউ নেই। এই তদারকিহীনতাই অসাধু সিন্ডিকেটের জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করেছে।
একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে মৌলিক প্রয়োজন হলো খাবার তৈরি করা। আর সেই রান্নার জ্বালানি যখন দুষ্প্রাপ্য বা সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়, তখন মানুষের জীবনযাত্রা আক্ষরিক অর্থেই স্থবির হয়ে পড়ে। দেশের অনেক জায়গায় পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ এতটাই সীমিত যে, রাত দুইটা বা তিনটার পর যখন সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন সামান্য সময়ের জন্য গ্যাসের দেখা মেলে। ফলে কর্মজীবী মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। ঘুমের সময় বিসর্জন দিয়ে গভীর রাতে সারা দিনের রান্না করা কিংবা দিনের বেলা হোটেল থেকে চড়া দামে মানহীন খাবার কিনে খাওয়া- কোনোটাই কোনো সুস্থ সমাজের চিত্র হতে পারে না। এই নিরুপায় অবস্থা থেকে বাঁচতে মানুষ যখন শেষ সম্বল হিসেবে সিলিন্ডারের দিকে ঝুঁকছে, সেখানেও সিন্ডিকেটের থাবায় তারা রক্তাক্ত হচ্ছে। এলসি জটিলতা, জাহাজ সংকট কিংবা ডলারের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে আমদানিকারক ও ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, যার চূড়ান্ত মূল্য চুকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
দেশের শিল্প উৎপাদনও এই গ্যাস সংকটের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সিএনজি স্টেশনগুলোতে মাইলের পর মাইল লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত গ্যাস পাচ্ছে না পরিবহনগুলো। এর ফলে যাতায়াত ভাড়া বাড়ছে লাগামহীনভাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামের ওপর। অর্থাৎ, গ্যাসের এই সংকট শুধু রান্নার ঘরে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বাজারের থলেতে গিয়েও বড় আঘাত করছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সবজি- সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পেছনে জ্বালানি সংকটের একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে। সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং এর ডিস্ট্রিবিউশন চেইনে তদারকির অভাব এখন এতটাই প্রকট যে, খুচরা বিক্রেতারা বুক ফুলিয়ে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। তারা বলছেন, তারা ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনছেন। ডিলাররা দুষছেন কোম্পানিগুলোকে। আর কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক সংকটের ধুয়া তুলছে। এই দায় মেটানোর খেলায় বলি হচ্ছে শুধু অসহায় সাধারণ ভোক্তা।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের দেশে এই খাতে আমদানিনির্ভরতা এতটাই বেড়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলেই দেশের বাজারে তার ভূমিকম্প শুরু হয়। নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যে দূরদর্শী দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকার দরকার ছিল, তার অভাব আজ আমাদের এই খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। সিলিন্ডার গ্যাস এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অবলম্বন। অথচ এই খাতের অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাটা প্রশাসনের বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবেই গণ্য হচ্ছে। অনেক নিম্নবিত্ত পরিবার এখন সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য হারিয়ে আদিম যুগের মতো মাটির চুলা বা কাঠের খড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে, যা পরিবেশের ওপরও দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এই জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এখন শুধু ফাঁকা বুলি বা কাগুজে দাম নির্ধারণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মাঠপর্যায়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ। সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নির্ধারণ শুধু খাতাণ্ডকলমে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি খুচরা দোকানে তা নিশ্চিত করতে হবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করতে হবে। যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ১৩০০ টাকার গ্যাস ২০০০ টাকায় বিক্রি করছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। পাশাপাশি, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস সম্পদ আহরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেকোনো সময় বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। ঘরে ঘরে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং রান্নার চুলার অনিশ্চয়তা দূর করাই এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে জরুরি কাজ। হাহাকারমুক্ত একটি রান্নাঘর নিশ্চিত করা দয়া নয়, বরং নাগরিকের অধিকার।
পরিশেষে বলা যায়, গ্যাসের এই সংকট শুধু একটি জ্বালানি সমস্যা নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি এক চরম আঘাত। একটি উন্নয়নশীল দেশে যেখানে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন দেখানো হয়, সেখানে রান্নার গ্যাসের মতো মৌলিক একটি বিষয়ের জন্য সাধারণ মানুষকে ১৮০০-২০০০ টাকা গুনতে হওয়া কিংবা চুলা জ্বালানোর নিশ্চয়তা না থাকাটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনই সফল হবে, যখন মানুষের নূন্যতম মৌলিক চাহিদাগুলো হাতের নাগালে থাকবে। সিলিন্ডার গ্যাসের বাজারে যে অরাজকতা চলছে, তা দমনে শুধু প্রশাসনিক হুঁশিয়ারি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সিন্ডিকেট চক্রের মূলে আঘাত করা এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা। একই সাথে নিজস্ব গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের ধৈর্যের সীমা অসীম নয়। ঘরে ঘরে ক্ষুধার্ত হাহাকার আর পকেট কাটার এই উৎসব বন্ধ না হলে জনজীবনে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তাই অনতিবিলম্বে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং রান্নার চুলার এই অনিশ্চয়তা দূর করাই হোক এই মুহূর্তের প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার।
ওসমান গনি
সাংবাদিক ও কলামিস্ট