প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬
গত কয়েক দশকে আমাদের নগরায়ণ হয়েছে অভাবনীয় গতিতে। কিন্তু এই উন্নয়নের চাকচিক্যের আড়ালে হারিয়ে গেছে নগরের প্রাণ-জলাশয়। এক সময় রাজধানীসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে যে অসংখ্য খাল, ঝিল আর পুকুর ছিল, আজ তার অধিকাংশেরই অস্তিত্ব শুধু মানচিত্রে সীমাবদ্ধ। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে বা প্রভাবশালীদের দখলে একের পর এক জলাশয় ভরাট হওয়ার ফলে আজ নগরজীবন এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন। এর সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও যন্ত্রণাদায়ক ফলাফল হলো- নিষ্কাশন ব্যবস্থার চরম দুর্গতি।
প্রকৃতিগতভাবেই জলাশয় নগরের ‘স্পঞ্জ’ হিসেবে কাজ করে। বর্ষার অতিরিক্ত পানি এই নিচু জমি বা খালগুলোতে জমা হওয়ার সুযোগ পেত। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেও তা দ্রুত সরে যেত। কিন্তু বর্তমানে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে সেই প্রাকৃতিক আধারগুলো ভরাট করে বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। পানি তার স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে এখন লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কগুলোও পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, যা শুধু জনদুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, বরং নগরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও স্থবির করে দিচ্ছে। জলাশয় ভরাটের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ড্রেনেজ ব্যবস্থার বিপর্যয়। ড্রেন বা নর্দমাগুলো তৈরি করা হয়েছিল পানি সরিয়ে পার্শ্ববর্তী খাল বা নদীতে নেওয়ার জন্য। কিন্তু খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি যাওয়ার কোনো গন্তব্য নেই। এছাড়া পলিথিন, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং গৃহস্থালি আবর্জনায় ড্রেনগুলো ভরাট হয়ে আছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং ড্রেনের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থার লাইনের বিশৃঙ্খল বিন্যাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার হলেও তা কোনো কাজে আসছে না, কারণ মূল ‘আউটলেট’ বা নির্গমন পথগুলো অবৈধ দখলে বন্ধ হয়ে আছে। জলাবদ্ধতা শুধু যাতায়াতে সমস্যা করে না, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি। দীর্ঘসময় জমে থাকা নোংরা পানি থেকে মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ে, যা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ময়লা পানির কারণে চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। পরিবেশগত দিক থেকে বিচার করলে, জলাশয় ভরাট হওয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং নগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে (আর্বান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট)। এতে শহরের স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে।
বাংলাদেশে জলাশয় রক্ষায় ‘জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০’ রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী পুকুর, খাল বা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট কোনো জলাশয় ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বা প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জলাশয় ভরাট অব্যাহত রয়েছে। রাজউক বা ওয়াসা কিংবা সিটি কর্পোরেশনের মতো দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও এই সমস্যার অন্যতম কারণ। একে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর সংস্কৃতিতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু ড্রেন পরিষ্কার করে বা পিচ ঢালা রাস্তা উঁচু করে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দখল হওয়া খাল ও জলাশয়গুলো উদ্ধার করতে হবে। সীমানা নির্ধারণ করে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। নগরের ভূ-প্রকৃতি বিবেচনা করে একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। ড্রেনগুলো যেন সরাসরি বড় জলাশয় বা নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ড্রেনে প্লাস্টিক বা কঠিন বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং ডাম্পিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। জলাধার সংরক্ষণ আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রভাবশালী বা সাধারণ নাগরিক- যেই হোক না কেন, জলাশয় ভরাটের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, রাজউক এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। একটি নির্দিষ্ট অথরিটির অধীনে নগরের নিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়িত্ব ন্যস্ত করা যেতে পারে।
একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরী গড়তে জলাশয়ের কোনো বিকল্প নেই। কংক্রিটের জঙ্গল বানিয়ে আমরা সাময়িক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়তো দেখতে পাচ্ছি; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমরা নিজেদের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনছি। ‘উন্নয়ন বনাম পরিবেশ’ এই দ্বন্দ্বে আমাদের পরিবেশকে গুরুত্ব দিতেই হবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের শহরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও জলাবদ্ধতামুক্ত নগরী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।