
দীর্ঘ ৩৩ বছর পর চট্টগ্রাম নগরীতে যুক্ত হতে যাচ্ছে একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল। নগরীর জালালাবাদ ওয়ার্ডের কুলগাঁও-বালুচরা এলাকায় প্রায় ৮ দশমিক ১০ একর জায়গার ওপর নির্মিত কুলগাঁও বাস-ট্রাক টার্মিনালটি চলতি সেপ্টেম্বরেই উদ্বোধনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
টার্মিনালটি চালু হলে উত্তর চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িমুখী দূরপাল্লার এবং আন্তঃনগর বাসগুলো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীতে কদমতলী (১৯৬৬ সালে নির্মিত) ও বহদ্দারহাটে (১৯৯৩ সালে নির্মিত) দুটি বাস টার্মিনাল রয়েছে। সেই হিসেবে কুলগাঁওয়ের এই প্রকল্পটি নগরীর তৃতীয় বাস টার্মিনাল হিসেবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক) ২০১৮ সালে এই টার্মিনাল প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের জন্য ২৬০ কোটি টাকা, ভূমি উন্নয়নে ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, অবকাঠামো উন্নয়নে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ ইয়ার্ড নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়।
৮ দশমিক ১০ একর জমিতে নির্মিতব্য এই টার্মিনালে একসঙ্গে ২০০টি বাস ও ট্রাক পার্কিংয়ের সুযোগ থাকবে। নির্মাণ কাজ শেষে চসিক টার্মিনালটি ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে রাজস্ব আয় করবে। যানজট নিরসনে বড় ভূমিকার আশা: চট্টগ্রাম নগরীর উত্তরমুখী বাস চলাচলের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ অক্সিজেন মোড়।
প্রতিদিন রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, হাটহাজারী, নাজিরহাট ও রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন রুটে ১ হাজারের বেশি বাস চলাচল করে। নির্দিষ্ট কোনো টার্মিনাল না থাকায় এতদিন মুরাদপুর ও অক্সিজেন এলাকায় সড়কের ওপর বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হতো, যা তীব্র যানজট তৈরি করত। নতুন টার্মিনাল চালু হলে প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। যাত্রীসেবায় তিনতলা বিশিষ্ট মূল ভবনের পাশাপাশি থাকছে ২৫টি বোর্ডিং লেন ও ১৪টি ওয়েটিং লেন।
এ ছাড়া ২২টি টিকিট কাউন্টার, বড় হলরুম, তথ্যকেন্দ্র, নারী-পুরুষের পৃথক শৌচাগার, এসি বাসের যাত্রীদের জন্য আলাদা বসার জায়গা, ওয়াই-ফাই, রেস্তোরাঁ, ফার্স্ট এইড স্টেশন ও লাগেজ রাখার কক্ষসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল জানান, প্রকল্পের মূল কাজ শেষ। মেয়র দেশে ফিরলেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।
তবে টার্মিনালে সুশাসন বজায় রেখে কঠোরভাবে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে নগরবাসী এর সুফল পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে নগরীর কুলগাঁও বালুচরা এলাকায় নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং জানুয়ারির মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করে টার্মিনালটি চালুর প্রস্তুতি চলছে।
বর্তমানে কদমতলী ও বহদ্দারহাট টার্মিনাল ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি গাড়ির চাপ সামলাচ্ছে, ফলে যাত্রী ও চালকরা প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বিশেষ করে উত্তর চট্টগ্রামের রুটে চলাচলকারী যাত্রীদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয়। বাসমালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়ক দিয়ে অক্সিজেন হয়ে প্রতিদিন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ও পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি বাস চলাচল করে। চট্টগ্রাম-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহাজাহান জানান, উত্তর চট্টগ্রামের রুটে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শতাধিক বাস চলাচল করে। কিন্তু স্থায়ী টার্মিনাল না থাকায় অনেক বাস রাস্তার পাশে দাঁড় করাতে হয়, এতে যানজট, জ্বালানি চুরি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে এসব সমস্যা অনেকটাই দূর হবে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক এই টার্মিনালে যাত্রীদের নিরাপদ ও আরামদায়ক সেবা নিশ্চিত হলে পরিবহন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বালুচরায় নতুন বাস টার্মিনাল চালু হলে নগরীর বহদ্দারহাট ও কদমতলী টার্মিনালের ওপর চাপ কমবে। রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি উপজেলা এবং পার্বত্য অঞ্চলের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ির যাত্রীরা সরাসরি বালুচরা থেকে বাসে ওঠানামা করতে পারবেন।
এর ফলে প্রতিদিন শহরে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে না। যাত্রীবাহী বড় বাস নগরে প্রবেশ না করায় অক্সিজেন, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট মোড়, কদমতলী, জিইসি, দুই নম্বর গেইটসহ নগরের প্রধান সড়কগুলোতে যানজট অনেকটাই হ্রাস পাবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের টার্মিনাল সংকট নিরসন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বর্তমানে পার্কিং সংকটের কারণে অনেক গাড়ি রাস্তায় দাঁড় করাতে হয়, এতে চুরি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এই নতুন টার্মিনাল পরিবহন মালিক ও চালকদের জন্যও স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে পরিবহন খাতের সুশৃঙ্খলতা ফিরবে এবং নগরের সার্বিক যাতায়াত ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এই টার্মিনালে যাত্রীদের জন্য প্রবেশপথে তিনতলা ভবন থাকবে, যেখানে বোর্ডিং লেন, ওয়েটিং লেন, টিকিট কাউন্টার, বড় আকারের হলরুম ও লাগেজ রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি থাকছে তথ্যকেন্দ্র, ট্যাক্সি বুকিং রুম, রেস্তোরাঁ এবং নারী-পুরুষের জন্য পৃথক টয়লেট। এসি যাত্রী কক্ষ ও ওয়াই-ফাই সুবিধাও রাখা হচ্ছে। পরিবহন মালিক ও কর্মচারীদের জন্য অফিস ও আবাসন ব্যবস্থাও টার্মিনালের নকশার অন্তর্ভুক্ত।