প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ মার্চ, ২০২৬
আল্লাহর আনুগত্যই সবচেয়ে বড় লাভ ও অর্জন। তার সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড় সাফল্য ও প্রাপ্তি। জান্নাতকে ঘিরে রাখা হয়েছে কষ্ট ও পরীক্ষার মাধ্যমে, আর জাহান্নামকে ঘিরে রাখা হয়েছে প্রবৃত্তি ও কামনার মাধ্যমে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কেয়ামতের দিন তোমাদের তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে। যাকে অগ্নি হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে সেই সফলকাম।’ (সুরা ইমরান : ১৮৫)।
মহান আল্লাহ আমাদের এই বরকতময় মাস পর্যন্ত পৌঁছার তাওফিক দিয়ে সম্মানিত করেছেন। যে সংশোধন হতে চায় তার জন্য এটি বড় একটি সুযোগ। জীবন শেষ হওয়ার আগে ও সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে তাওবার পথে ফিরে আসার এক মহা ক্ষেত্র এটি। তাই রমজানের মর্যাদা রক্ষা করো। একে যথাযথ সম্মান দাও, ঠিকভাবে সিয়াম পালন করো, এমন সব কাজ থেকে বেঁচে থাকো যা সওয়াব কমিয়ে দেয়। এর দিন-রাতকে কাজে লাগাও।
রমজান এক মহিমান্বিত মাস, এক মহান মৌসুম। এতে বরকত ও রহমত বর্ষিত হয়, কল্যাণ ও উদারতা ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ এতে ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করে ও ইবাদতে অগ্রসর হয়। এ মাসে রহমতের দরজা খোলা থাকে এবং আমলের সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। রমজান হলো ইবাদত ও তাওবার মাস, আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও ফিরে আসার মাস। এটি চেষ্টা, পরিশ্রম, ধৈর্য ও নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাস। এটি তওবা, আন্তরিকতা, বিনয়, সিজদা ও রুকুর মাস; রোজা, নামাজ, সৎকাজ, দান-খয়রাত ও কোরআন তেলাওয়াতের মাস।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের রমজানের আগমনের সুসংবাদ দিতেন। তিনি বলতেন, ‘তোমাদের কাছে রমজান এসেছে। এটি এক বরকতময় মাস। আল্লাহ তোমাদের উপর এর রোজা ফরজ করেছেন। এতে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দুষ্ট শয়তানদের শিকলবন্দি করা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে প্রকৃতপক্ষে বঞ্চিতই হলো।’ (নাসায়ি : ২১০৬)।
তোমরা এখন মহামূল্যবান দিন ও ফজিলতপূর্ণ সময়ের মধ্যে রয়েছো। তাই এগুলো নষ্ট করো না; বরং এমন কাজে লাগাও যা তোমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে। ফরজ, সুন্নত ও নফল ইবাদতে মন দাও। নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, তাসবিহ, তাহলিল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামণ্ডএর প্রতি দরুদ পাঠে সময় ব্যয় করো। তাওবা ও ইস্তিগফার করো, দোয়া ও মিনতি করে একমাত্র আল্লাহর কাছে চাও। দান-সদকা করো, গরিবদের খাওয়াও, রোজাদারদের ইফতার করাও। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো এবং সৎকাজে অগ্রসর হও।
কল্যাণের পথ অনেক এবং তার দরজাগুলো খোলা। তাই প্রত্যেক ভালো কাজ থেকে কিছু না কিছু গ্রহণ করো। এই মাসের যথাযথ মর্যাদা বোঝো, যেমন আল্লাহ একে মর্যাদা দিয়েছেন তেমনি সম্মান করো। আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে একে কাজে লাগাও। সাবধান! যেন এ মাসের কোনো সময় এমনভাবে চলে না যায়, যাতে তোমাদের জন্য কোনো সওয়াব লেখা না হয় এবং কোনো সৎকাজের উল্লেখ না ওঠে। গাফিলতি থেকে বেঁচে থাক; কারণ গাফিলতি মানুষকে কল্যাণের মৌসুম থেকে বঞ্চিত করে, জীবন ও সময় নষ্ট করে, শক্তি অপচয় করে, হৃদয়কে মৃত করে দেয় এবং সব ভালো থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। হযরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগপর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ তাআলার নিকট হতে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে ; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মুতাবিক কি কি আমল করেছে।’ (তিরমিজি : ২৪১৬)।
অতএব, তোমরা দ্রুত সৎকাজের দিকে এগিয়ে যাও, ভালো কাজে একে অপরের আগে হওয়ার চেষ্টা করো, এবং আমল করার সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ার আগে নেক আমলে তাড়াতাড়ি লেগে পড়ো। তোমাদের কেউ জানে না, আগামী রমজান আবার পাবে কি না। জীবনে আর সময় অবশিষ্ট আছে কি না, তাও জানা নেই। তাই সৎকাজে এগিয়ে যাও। তোমাদের মনের কথা যেন হয়, ‘হে আমার রব! তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমি তাড়াতাড়ি তোমার দিকে ছুটে এলাম।’ (সুরা তহা : ৮৪) মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আল্লাহ তার দিকে এক হাত এগিয়ে আসেন। আর যে এক হাত এগোয়, আল্লাহ তার দিকে আরও বেশি এগিয়ে আসেন। আর যে আল্লাহর দিকে হেঁটে আসে, আল্লাহ তার দিকে দৌড়ে আসেন।’ মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের প্রয়াসে যা প্রশস্ততায় আকাশ ও পৃথিবীর মতো, যা প্রস্তুত করা হয়েছে তাদের জন্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণে ঈমান আনে। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি এটা দান করেন; আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল।’ (সুরা হাদিদ : ২১)।
সৎকাজ হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। তাই যেমন তোমরা আমল করার ব্যাপারে আগ্রহী, তেমনি তা কবুল হওয়ার ব্যাপারেও চিন্তিত হও। কত আমলই তো বৃথা চলে যায়, কত পরিশ্রমই তো ফলহীন হয়ে পড়ে। আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘যারা দান করে এবং তাদের অন্তর ভীত থাকে যে, তারা তাদের রবের কাছে ফিরে যাবে।’ আমি বললাম, তারা কি সেই লোক যারা মদ পান করে ও চুরি করে? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘না, হে সিদ্দিকের কন্যা! বরং তারা হলো সেই লোক, যারা রোজা রাখে, নামাজ পড়ে, দান করে। তবুও ভয় করে যে, তাদের আমল কবুল হবে কি না।’ (তিরমিজি, : ৩১৭৫)।
আমল কবুল হয় তখনই, যখন তা সুন্দরভাবে আদায় করা হয় এবং সুন্নাহ অনুযায়ী করা হয়। হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করে, যা আমাদের পদ্ধতি অনুযায়ী নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (মুসলিম : ৪৩৮৫)। তাই তোমরা তোমাদের আমলের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তোমাদের চেহারা বা শরীরের দিকে তাকান না; তিনি তাকান তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে। অনেক রোজাদার আছে, যার রোজা থেকে সে শুধু ক্ষুধা, পিপাসা ও কষ্টই পায়। আবার অনেক রাত জাগা ইবাদতকারী আছে, যার ইবাদত থেকে সে শুধু জেগে থাকা ও ক্লান্তিই পায়।
হে আল্লাহর বান্দারা! আমল কবুল হওয়ার একটি লক্ষণ হলো মানুষের অবস্থার ভালো দিকে পরিবর্তন হওয়া, সৎকাজে অটল থাকা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। তাই তোমরা নিজেদের থেকে আল্লাহকে ভালো কিছু দেখাও। আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যে ভালো যা কিছু অগ্রিম প্রেরণ করবে তা তোমরা পাবে আল্লাহর কাছে। তা উৎকৃষ্টতর এবং পুরস্কার হিসেবে মহত্তর। আর তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর আল্লাহর কাছে; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল : ২০)।
(১০-০৯-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ২৭-০২-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)