ঢাকা সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

প্রকৃত সুখের সন্ধান

শায়খ ড. হুসাইন বিন আবদুল আজিজ আলে শাইখ
প্রকৃত সুখের সন্ধান

মানুষ সব ধরনের উপায় অবলম্বন করে উচ্চলক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে, মনের শান্তি, হৃদয়ের প্রশান্তি ও বক্ষের প্রশস্ততার জন্য। আল্লাহতায়ালা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন এ সবকিছু কীভাবে অর্জিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে; আর পাপাচারীরা তো থাকবে জাহান্নামে।’ (সুরা ইনফিতার: ১৩-১৪)।

অতএব, সবচেয়ে কষ্টের জীবন হলো পাপীদের জীবন, আর সবচেয়ে সুন্দর জীবন হলো আল্লাহর আনুগত্যকারীদের জীবন, যারা পরম করুণাময়ের নৈকট্যে থেকে শান্তি অনুভব করে। মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘তুমি মনে করো না যে, এই সুখ-দুঃখ শুধু আখেরাতের জন্য সীমাবদ্ধ; বরং তারা দুনিয়া, কবরের জীবন ও চিরস্থায়ী জীবনেই এমন। প্রকৃত সুখ হলো হৃদয়ের সুখ, আর প্রকৃত শাস্তি হলো হৃদয়ের শাস্তি।’

আল্লাহর নৈকট্যের আনন্দের সমতুল্য কোনো আনন্দ নেই। একজন বান্দা যখন তার রবের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাঁর আনুগত্য, স্মরণ ও কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় মগ্ন থাকে তখন যে আনন্দ পায়, দুনিয়ার কোনো ভোগবিলাস তার কাছে পৌঁছাতে পারে না। একজন নেককার বলেছেন, ‘যদি জান্নাতবাসীরা এমন অবস্থাতেই থাকে, তবে নিশ্চয়ই তারা খুবই সুন্দর জীবনে আছে!’ কোনো আত্মা শান্তি পায় না, কোনো হৃদয় প্রশান্ত হয় না, যতক্ষণ না তা তার রবের সাথে যুক্ত হয়, একনিষ্ঠভাবে তাঁরই ইবাদত করে এবং প্রকাশ্যে-গোপনে তাঁর আনুগত্য মেনে চলে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মোমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম করবে তাকে আমি নিশ্চয়ই পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদের তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রদান করব।’ (সুরা নাহল : ৯৭)।

চোখ কখনো তৃপ্ত হয় না, হৃদয় কখনও শান্ত হয় না, আত্মা কখনও স্থির হয় না, যতক্ষণ না আল্লাহর সামনে পূর্ণ বিনয়, ভালোবাসা ও তার শরিয়তের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ : ২৮)। তিনি আরও বলেন, ‘আরও যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তঁাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, তিনি তোমাদের এক নির্দিষ্টকালের জন্য উত্তম জীবন উপভোগ করতে দেবেন।’ (সুরা হুদ : ৩)।

আত্মার শান্তি, হৃদয়ের আনন্দ, প্রশস্ততা, আলো ও সুখের সব কিছু শুধু তখনই অর্জিত হয়, যখন মানুষ আল্লাহ প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে, যা তিনি তাঁর কিতাবে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সুন্নাহতে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আর যখন মানুষ এই পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন সেটাই হয় দুঃখ, কষ্ট, মানসিক অশান্তি, দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাগ্যের মূল কারণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে, অবশ্যই তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়।’ (সুরা তহা : ১২৪)।

যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরে যায়, সে সর্বদা দুঃখ-কষ্টে জীবন কাটায়। কারণ সে এমন এক দুনিয়ায় বেঁচে থাকে যা নানা দুশ্চিন্তা ও সমস্যায় পূর্ণ। যদিও তার কাছে প্রচুর সম্পদ থাকুক না কেন, তবুও সে প্রকৃত সুখ পায় না। কারণ দুনিয়ার সুখ স্থায়ী নয়, আর নিরাপত্তাও চিরস্থায়ী নয়। অতএব, কবরের জীবন ও আখেরাতের শাস্তি কত ভয়াবহ হতে পারে! আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই অপমান ও ব্যর্থতা থেকে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এই মহান অর্থগুলো খুব সংক্ষেপে সুন্দরভাবে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘হে বিলাল, নামাজ কায়েম করো, এর মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।’

ইবাদতের মধ্যে নামাজও আছে। এগুলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক, তাঁকে জানা ও ভালোবাসার মাধ্যম। এগুলোর মাধ্যমে মানুষের হৃদয় দুনিয়ার দুশ্চিন্তা ও ব্যস্ততা থেকে শান্তি পায়। তখন বান্দার হৃদয় আল্লাহর সাথে যুক্ত হয় এবং সে তার রবের সান্নিধ্যে প্রশান্তি অনুভব করে। এভাবেই বান্দা এমন এক আনন্দ লাভ করে, যা পৃথিবীর সব আনন্দের চেয়ে বড় ও যার সঙ্গে দুনিয়ার কোনো আনন্দের তুলনাই চলে না। এটা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও ইবাদতের পথ যা আসলে দুনিয়ার জান্নাত, উচ্চ মর্যাদার সুখ, চোখের আরাম, আত্মার স্বস্তি ও হৃদয়ের আনন্দ। এই কারণেই আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আর আমার চোখের প্রশান্তি রাখা হয়েছে নামাজে।’ (মুসনাদ আহমদ)।

তোমরা যদি তোমাদের রবের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করো ও তাঁর নৈকট্যে আনন্দ পাও, তাহলে তোমরা দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হবে এবং সর্বোচ্চ কল্যাণ অর্জন করবে। মানুষের মন থেকে দুশ্চিন্তা দূর করা ও হৃদয় থেকে বিষণ্ণতা সরিয়ে দেওয়া হয় শুধু আল্লাহর দিকে মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ও সব কিছুর ওপর তাঁর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে। এর সবচেয়ে বড় উপায় হলো, আল্লাহর প্রতি তাওহিদকে শক্তিশালী করা, তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা, আল্লাহকে তাঁর নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে জানা, তাঁকে পূর্ণ ভালোবাসা ও মানুষের প্রতি নানা ধরনের ভালো কাজ করা। যে ব্যক্তি এই পথে চলে, সে সুখ, আনন্দ ও শান্তি লাভ করে এবং আল্লাহ তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ করে দেবেন।’ (সুরা তালাক : ২)।

(২৯-১০-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ১৭-০৪-২০২৬ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস - আবদুল কাইয়ুম শেখ)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত