
সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতি, আন্দোলন সংগ্রামের দীর্ঘপথ এবং নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে মন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথবাক্য পাঠ করেন। সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন ও আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
বিএনপি ও সালাহউদ্দিন আহমেদ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন। এর আগে সকালে কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ সালাহউদ্দিন আহমেদ। ১৯৯৬ সালে (ষষ্ঠ) প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সালাহউদ্দিন আহমেদ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াত ইসলামীর আব্দুল্লাহ আল ফারুখকে ৯৫ হাজার ৮৩০ ভোটের বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। দেশের পর্যটন সমৃদ্ধ জেলা কক্সবাজারের দুই উপজেলা চকরিয়া ও পেকুয়া নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-১ থেকে তিনি এর আগে ১৯৯৬ (সপ্তম) ও ২০০১ সালেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার গঠন হলে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং সেই সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনিই প্রথম কক্সবাজার জেলা থেকে প্রতিমন্ত্রীত্ব পান। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের তৎকালীন চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সিকদার পাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক ও মাতা বেগম আয়েশা হকের পরিবারে সালাহউদ্দিন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। আনুষ্ঠানিক শপথের মাধ্যমে তিনিই হবেন মুক্তিযুদ্ধের পর কক্সবাজার থেকে দায়িত্ব পাওয়া প্রথম পূর্ণমন্ত্রী। প্রসঙ্গত,স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী ছিলেন কক্সবাজারের সন্তান ফরিদ আহমদ, তিনি বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাবেক দুই সংসদ সদস্য খালেকুজ্জামান ও সহীদুজ্জামানের পিতা।
১৯৭৭ সালে পেকুয়ার শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হওয়া সালাহউদ্দিন আহমেদ। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালের এইচএসসিতেও দারুণ ফলাফল করেন। ১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) ও ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এবং কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতিও ছিলেন। ১৯৮৫ সালের ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় (প্রশাসন) উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বগুড়া জেলা প্রশাসনের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব পদ থেকে বদলি হয়ে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসাবে তিনি নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে আপোষহীন নেত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার সান্নিধ্য পাওয়া সালাহউদ্দিন আহমেদ ১৯৯৬ সালে চাকরি ছেড়ে আহ্বায়ক হিসেবে কক্সবাজার জেলা বিএনপির হাল ধরেন এবং একই বছরে পরপর দুটি সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
কাউন্সিলে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে পরপর দুইবার কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি দায়িত্ব পালন করা সালাহউদ্দিন আহমেদ ২০১০ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব মনোনীত হয়েছিলেন। ২০১৫ সালে দেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্বপালনকালে ঐ বছরের ১০ মার্চ গুমের শিকার হন সালাহউদ্দিন আহমেদ, দীর্ঘ ৬২ দিন পর ১১ মে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় ভারতের শিলংয়ে তার খোঁজ পাওয়া যায়। ভারতের শিলং থাকা অবস্থায় তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন। শিলংয়ের কারাগারে বন্দিজীবন, নির্বাসনে থেকে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে প্রায় ১০ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট নিজ মাতৃভূমিতে সালাহউদ্দিন আহমদের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটে।