
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা এখন কৃষি বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ। এক সময় যে ফসলের চাষ হতো শুধু পারিবারিক চাহিদা মেটানোর জন্য, আজ সেই কন্দাল জাতীয় ফসলই হয়ে উঠেছে স্থানীয় কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান হাতিয়ার। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এই অমূল্য রতন বা কন্দাল ফসল, বিশেষ করে মিষ্টি আলু, কচু ও ওলকচুর উৎপাদন চান্দিনায় এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে চোখ মেলে তাকালে এখন শুধু ধানের সোনালি রঙ নয়, বরং কন্দাল ফসলের সবুজ সতেজ পাতার সমারোহ চোখে পড়ে। কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যা আর কৃষি বিভাগের সঠিক নির্দেশনায় এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে বইছে এক নতুন হাওয়া।
চান্দিনার মেহার গ্রামসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। বিস্তীর্ণ জমিতে চাষ হয়েছে উন্নত জাতের মিষ্টি আলু। মেহার গ্রামের কৃষকরা এখন আর সনাতন বা দেশি জাতের মিষ্টি আলুর ওপর নির্ভর করছেন না। তাদের ভাষায়, আগেকার দিনে যে মিষ্টি আলু চাষ হতো, তার আকার ছিল ছোট এবং ফলন ছিল অত্যন্ত নগণ্য। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কৃষি অফিসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এবং বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা বিদেশি উন্নত জাতের মিষ্টি আলু চাষ করে কৃষকরা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো সাফল্য পাচ্ছেন। একেকটি আলুর আকার ও ওজন দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতির কোনো জাদুকরী ছোঁয়া লেগেছে। বড় সাইজের এই আলুগুলো একদিকে যেমন দেখতে আকর্ষণীয়, অন্যদিকে স্বাদেও অনন্য।
কন্দাল জাতীয় ফসলের এই জয়যাত্রার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে কৃষকরা দেখছেন এর স্বল্প উৎপাদন খরচ এবং বিশাল মুনাফার সম্ভাবনাকে। ধান বা অন্যান্য রবি শস্যের তুলনায় কন্দাল ফসলে সারের ব্যবহার ও বাড়তি সেচের প্রয়োজন অনেকটাই কম। রোগবালাইয়ের উপদ্রবও তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা অনেক কমে গেছে। মেহার গ্রামের একজন প্রবীণ কৃষক জানান, আগে তারা যে জমিতে ধান চাষ করে সামান্য লাভ করতেন, এখন সেই একই জমিতে মিষ্টি আলু বা কচু চাষ করে দ্বিগুণেরও বেশি মুনাফা ঘরে তুলছেন। বিশেষ করে বিদেশি জাতের মিষ্টি আলুর ফলন এতই বেশি যে, তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার পর দেশের অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
চান্দিনার এই বদলে যাওয়া কৃষি চিত্রের পেছনে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ। উপজেলা কৃষি অফিসের নিরলস প্রচেষ্টা কৃষকদের মধ্যে এক নতুন সচেতনতা তৈরি করেছে। উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ থেকে শুরু করে সঠিক সময়ে রোপণ এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কৃষকদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ‘কন্দাল ফসল উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় পাওয়া প্রদর্শনীগুলো কৃষকদের চোখ খুলে দিয়েছে। বিদেশি জাতের আলুর বড় আকার এবং উচ্চ ফলন দেখে অন্য কৃষকরাও এখন প্রথাগত চাষাবাদ ছেড়ে আধুনিক ও লাভজনক এই কন্দাল ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
বর্তমান বাজারে কন্দাল ফসলের চাহিদাও ব্যাপক। মিষ্টি আলুর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ায় এর চাহিদা শহর ও গ্রাম, উভয় জায়গাতেই তুঙ্গে। এছাড়া মুখী কচু বা লতিরাজ কচুর মতো ফসলগুলো চান্দিনার কৃষকদের জন্য সারা বছর আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেহার গ্রামের আলুর খেতগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ। মাটি খুঁড়লেই বেরিয়ে আসছে বড় বড় লালচে ও সাদা রঙের মিষ্টি আলু। কৃষকরা ব্যস্ত সেই আলু বস্তাবন্দি করতে, আর পাইকাররা মাঠ থেকেই সেগুলো কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
চান্দিনার এই কৃষি বিপ্লব শুধু খাদ্যের চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বড় ভূমিকা রাখছে। নারী ও তরুণরা এখন বাড়ির পাশের পতিত জমিতে বা বাণিজ্যিক খামারে কন্দাল ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। খরচ কম আর লাভ বেশি, কৃষি বিজ্ঞানের এই সহজ সমীকরণটি এখন চান্দিনার কৃষকদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আরও বৃদ্ধি পায়, তবে চান্দিনা হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম প্রধান কন্দাল ফসল উৎপাদনকারী হাব। মাটির নিচের এই সোনালি ফসলগুলোই একদিন চান্দিনার কৃষকদের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দেবে, মেহার গ্রামের বর্তমান চিত্র আজ সেই শুভ বার্তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।