
ফরিদপুরে শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাত্র একদিনেই নতুন করে ১০ শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি সামনে এনেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, টিকাদানে ঘাটতি ও সচেতনতার অভাবই এই সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। এদিকে অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, ফলে চিকিৎসাসেবায় দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি।
গত মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে মোট ২৪ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনও বেশ কিছু শিশু জ্বর, লাল ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্টসহ জটিলতায় ভুগছে।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ড ও জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নতুন রোগী আসছে। কিন্তু পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে পাটি বা চাদর বিছিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
গরম আবহাওয়া, অতিরিক্ত ভিড় এবং অপর্যাপ্ত সেবার পরিবেশে শিশুদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অনেক অভিভাবক জানান, জায়গার অভাবে সন্তানের সঠিক যত্ন নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুর মা নাছিমা আক্তার বলেন, তিন দিন জ্বরের পর শরীরে লাল দানা ওঠে। হাসপাতালে এনে দেখি কোনো সিট নেই- খুব কষ্টে থাকতে হচ্ছে।
আরেক অভিভাবক আকবর মুন্সি বলেন, মেয়েকে ভর্তি করেছি, কিন্তু শয্যা পাইনি। মেঝেতেই চিকিৎসা চলছে। প্রতিদিন নতুন রোগী আসছে, পরিস্থিতি ভয়াবহ।
চিকিৎসকদের মতে, সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী হামণ্ডরুবেলা টিকা দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক শিশু এখনও টিকার বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. গণেশ কুমার আগারওয়াল জানান, বর্তমানে তাদের হাসপাতালে ৬ শিশু ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে কয়েকজন কোনো টিকা নেয়নি- এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হিসাবে দেশে প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলা হলেও আন্তর্জাতিক জরিপে এ হার প্রায় ৮৪ শতাংশ। এই ব্যবধানই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান জানান, চলতি বছরে জেলায় এখন পর্যন্ত ৪২ শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, সময়মতো টিকা দিলে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে- উচ্চ জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে লাল ফুসকুড়ি। জটিল ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র চিকিৎসা সেবা বাড়ালেই যথেষ্ট নয়- জনসচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখনও অনেক অভিভাবক টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন, ফলে অনেক শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা, গণমাধ্যমে প্রচার এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। ফরিদপুরে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির এই পরিস্থিতি স্পষ্টতই একটি সতর্কবার্তা।
এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। টিকাদান জোরদার, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই এ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। শিশুদের সুরক্ষায় এখনই দরকার সমন্বিত উদ্যোগ- স্বাস্থ্য বিভাগ ও অভিভাবকদের সম্মিলিত সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।