
নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার কালিয়ান বিল এলাকায় বছরের পর বছর ধরে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় একদিকে জমে থাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে ফসল, অন্যদিকে রোদহীন আবহাওয়ায় ঘরে তোলা ধানও নষ্ট হয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক ও কাঠামোগত এই দ্বিমুখী সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকেরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কঞ্চিউড়া ব্রিজ সংলগ্ন স্লুইচগেটটি উদ্বোধনের পর থেকেই অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। পাশাপাশি খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিলে জমে থাকা পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। ফলে সামান্য বৃষ্টি বা উজানের পানিতেই বিস্তীর্ণ ফসলি জমি প্লাবিত হয়ে পড়ে। কৃষক রহমত মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পানি যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে এভাবে ধান ডুবতো না। প্রতি বছরই আমরা একই দুর্ভোগে পড়ি।’ তার মতো অনেক কৃষকই মনে করেন, পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় তাদের ভাগ্য যেন প্রতি মৌসুমেই নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে বাট্টা-ছিলিমপুর গ্রামের বাসিন্দারা সারাদেশে চলমান খাল খনন কর্মসূচির আওতায় কালিয়ান খালকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তারা স্থানীয় সাংসদ ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী এমপির হস্তক্ষেপ কামনা করে ডিও লেটারে কালিয়ান খালের নাম সংযুক্ত করার আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কুররা বিল থেকে কালিয়ান বিল পর্যন্ত সংযোগকারী খাল পুনঃখনন, অকার্যকর স্লুইচগেট সচল করা এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অন্যদিকে, যারা কোনোভাবে ধান কেটে ঘরে তুলতে পেরেছেন, তারাও রেহাই পাচ্ছেন না। টানা মেঘলা আকাশে রোদের দেখা না থাকায় ধান শুকাতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে অনেকের ধানেই অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে, যা বাজারে বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ছিলিমপুর গ্রামের কৃষক স্বপন খান (৫৭) বলেন, ‘ধান কেটে ঘরে আনলাম, কিন্তু শুকাতে পারছি না। এখন দেখি ধানের ভেতরেই অঙ্কুর বের হচ্ছে। এই ধান কেউ কিনতে চায় না, কিনলেও খুব কম দামে।’ আরেক কৃষক আব্দুল মালেক জানান, ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেও এখন লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনি। ‘ধান নষ্ট, দামও নাই- এভাবে চললে আমরা বাঁচবো কীভাবে?’ প্রশ্ন রাখেন তিনি।
স্থানীয়ভাবে দেখা গেছে, কৃষকেরা বাড়ির উঠান, রাস্তার পাশে পলিথিন বিছিয়ে ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সূর্যের অভাবে কোনো উপায়েই ধান রক্ষা করা যাচ্ছে না। আড়তগুলোতেও ভেজা বা অঙ্কুরিত ধানের চাহিদা কম থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। কালিয়ান বিলের পাড়ে শেষ বিকালের ম্লান আলোয় ডুবে থাকা ধানখেতের দিকে তাকিয়ে কৃষক আনিস মিয়ার দীর্ঘশ্বাস যেন পুরো এলাকার চিত্র ফুটিয়ে তোলে- ‘এই পানি শুধু জমি ডুবায় নাই, আমাদের স্বপ্নও ডুবাইছে তবে আজকের রোদের ঝিলিকই এখন আমাদের একমাত্র আশা।’
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা মিলিয়ে কেন্দুয়ার কৃষকের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ঘনঘটা। এখন তাদের একটাই দাবি- টেকসই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল পুনঃখনন, এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে তাদের বাঁচিয়ে রাখা হোক।