ঢাকা মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জুলাই শহিদ ফয়েজের বাড়িতে ঈদের আনন্দ নেই

জুলাই শহিদ ফয়েজের বাড়িতে ঈদের আনন্দ নেই

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই প্রিয়জনদের ঘরে ফেরা। কিন্তু লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ঝাউডুগী গ্রামের একটি বাড়িতে ঈদ আসে শুধুই দীর্ঘশ্বাস হয়ে। ঈদের দিনেও বাড়ির উঠানে বসে ছেলের স্মৃতিচারণ করেন বৃদ্ধ বাবা-মা। বারবার চোখ চলে যায় বাড়ির প্রবেশপথের দিকে। যদি একবারের জন্যও ফিরে আসে তাদের আদরের সন্তান। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর কখনো শেষ হওয়ার নয়। কারণ তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান মোঃ ফয়েজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ হয়েছেন।

২০২৪ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর সাইনবোর্ড এলাকায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন রায়পুর উপজেলার ঝাউডুগী গ্রামের আলাউদ্দিন বেপারী ও ছবুরা খাতুন দম্পতির ছেলে মোঃ ফয়েজ। তার মৃত্যুর পর থেকে পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে সীমাহীন কষ্ট ও অনিশ্চয়তা।

ফয়েজ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্য। তার আয়েই চলত বৃদ্ধ মা-বাবাসহ পরিবারের সকল খরচ। প্রতিবছর ঈদুল আজহায় তিনিই পরিবারের পক্ষ থেকে কোরবানি দিতেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আর্থিক সংকটের কারণে গত তিন বছর ধরে সেই কোরবানি বন্ধ রয়েছে। ছেলের শূন্যতার সঙ্গে অর্থকষ্টও এখন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারটির।

ফয়েজের বাবা আলাউদ্দিন বেপারী বলেন, আমার ছেলে ছিল আমার সবকিছু। ও সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। প্রতিবছর নিজের টাকায় কোরবানি দিত। আমি বয়সের ভারে কাজ করতে পারি না। ছেলেটা বেঁচে থাকলে আজ আমাদের এত কষ্ট করতে হতো না। ঈদ এলেই ওর কথা বেশি মনে পড়ে। মানুষের ঘরে আনন্দ, আর আমাদের ঘরে শুধু ছেলের শোক।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, জীবিকার তাগিদে ফয়েজ বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে সেখানে বেশি দিন থাকতে পারেননি। দেশে ফিরে আসার পরও বিদেশ যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণের বোঝা বহন করতে হচ্ছিল তাকে। পরে তার মৃত্যুর পর সরকার থেকে পাওয়া আর্থিক সহায়তার একটি অংশ দিয়ে সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়।

পরিবারের দাবি, শহিদ ফয়েজের মৃত্যুর পর সরকার থেকে ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই অর্থের মধ্যে ফয়েজের স্ত্রী ২০ লাখ টাকা নিয়ে আলাদা হয়ে যান। বাকি ১০ লাখ টাকা বিদেশযাত্রার ঋণ ও অন্যান্য দেনা পরিশোধে ব্যয় করা হয়। বর্তমানে পরিবারটির হাতে কোনো উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় নেই।

এদিকে আদরের সন্তানকে হারিয়ে এখনো পাগলপ্রায় মা ছবুরা খাতুন। ছেলের কথা বলতে গেলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছবুরা খাতুন বলেন, ঈদে সবার সন্তান বাড়িতে আসে। মা-বাবার সঙ্গে খায়, কথা বলে, আনন্দ করে। কিন্তু আমার ফয়েজ আর আসে না। আমি এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি আমার ছেলে এসে ‘মা’ বলে ডাকবে। কিন্তু সে তো আর কখনো ফিরবে না। মানুষের ঘরে ঈদের আনন্দ, আর আমার ঘরে শুধু কান্না। আমার বুকের কষ্ট কেউ বুঝবে না।

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলে আমাদের জন্য কত কষ্ট করেছে। সংসারের জন্য নিজের সুখ-শান্তি সব বিসর্জন দিয়েছে। আজ সে নেই। ঈদ এলেই মনে হয় বুকটা ফেটে যাবে।

শুধু আর্থিক সংকট নয়, শহীদ ফয়েজের কবর নিয়েও রয়েছে পরিবারের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ। নিজস্ব কবরস্থানের জায়গা না থাকায় তাকে অন্যের জমিতে দাফন করা হয়েছে। বর্তমানে কবরটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, চলতি ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন তারা। তবে বিএনপি ও এনসিপির পক্ষ থেকে কোনো খোঁজখবর বা সহযোগিতা পাননি বলে দাবি করেন পরিবারের সদস্যরা।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, ফয়েজ দেশের জন্য, মানুষের অধিকারের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু তার পরিবার আজও কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আমরা চাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হোক। অন্তত শহীদের পরিবার যেন সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ফয়েজের বাবা-মায়ের অবস্থা খুবই করুণ। ছেলেকে হারানোর শোক তারা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ঈদের সময় তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। সমাজের বিত্তবান মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠনের উচিত এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো। ঈদের তৃতীয় দিনেও ঝাউডুগীর সেই ছোট্ট বাড়িতে নেই কোনো উৎসবের আমেজ। নেই কোরবানির ব্যস্ততা, নেই ছেলের হাতে কেনা ঈদের আয়োজন। আছে শুধু এক শহীদ সন্তানের স্মৃতি আর তাকে ঘিরে বাবা-মায়ের অশ্রুসিক্ত অপেক্ষা। বৃদ্ধ মা-বাবার একটাই চাওয়া- তাদের সন্তানের আত্মত্যাগ যেন বিস্মৃত না হয়, তার কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক এবং শহীদ পরিবারের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক জানান এলাকাবাসী।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত